প্রশ্ন :যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের কোনদিকগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী মনে হয় আপনার কাছে?
উত্তর :শত শত সমস্যাজর্জরিত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে শূূন্য থেকে দেশ গড়ার কাজে হাত দেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল এক কথায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন। বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত চারটি মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা) এবং জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসাই ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রধান প্রেরণাদায়ী স্তম্ভ।
ভঙ্গুর ভৌত অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য বঙ্গবন্ধু যে সমস্ত নীতি গ্রহণ করলেন, মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০৭ কোটি টাকার একটি স্বল্পমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় ১৯৭২ সালের জুন পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য। এতে দুই কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন ও অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম পর্যায়ে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সরকার এ ব্যাপারে পূর্ণতা দিতে পেরেছিল। লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় এ সময় মন্তব্য করা হয়-যে পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন, সে পরিস্থিতিতে তা তিনি যেভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
প্রথম পর্যায়ের পর সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে এবং ১৯৭২ সালের জুন মাস থেকে পুনর্বাসন কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে হাত দেয়। ১৯৭২-৭৩ সালের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের জন্য ৬৬ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হওয়ার আগে পুনর্গঠনের অনেক কাজই বঙ্গবন্ধুর সরকার সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।

প্রশ্ন :সরকার কাঠামো ও সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনে বঙ্গবন্ধুর কোন চিন্তা সক্রিয় ছিল বলে মনে করেন? স্বাধীন দেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় এগুলো কীভাবে সম্পন্ন হলো?
উত্তর :বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক ও শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়সংকল্প ছিলেন। এ জন্য সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পরিচালনায় তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন। আওয়ামী লীগের ৬ দফা এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফায় সংসদীয় গণতন্ত্রের কথাই বলা হয়েছিল।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিন অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হেয়ার রোডে মন্ত্রিসভার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে দু'দফা বৈঠক করেন। এই বৈঠকে শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতি তথা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সাময়িক সংবিধান আদেশ ১৯৭২ (Provisional Constitutional Order ১৯৭২) জারির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সংসদীয় ব্যবস্থার প্রচলন করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সাময়িক সংবিধান আদেশের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করেন এবং ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি সকালে মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ ঘোষণার পর সাময়িক আদেশের ৮-সংখ্যক ধারা বলে মন্ত্রিসভা বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর শপথবাক্য পাঠ করান প্রধান বিচারপতি। পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ পদত্যাগ করেন। এ সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সাময়িক সংবিধান আদেশের ৭ ধারাবলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু ১২ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালের অপরাহেপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু তাঁর ১১ সদস্যবিশিষ্ট নতুন মন্ত্রিসভার নাম রাষ্ট্রপতিকে দেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি নতুন মন্ত্রী নিযুক্ত করেন। রাষ্ট্রপতির আদেশের ১০ বিধি বলে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীর শপথবাক্য পাঠ করান। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি অপরাহেপ্ত মন্ত্রিসভার সদস্যগণ কার্যভার গ্রহণ করেন। এভাবে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার-ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে সংসদীয় শাসন-ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটে।
প্রশ্ন :সংবিধান প্রণয়ন ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীকে সে দেশে ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বলুন।
উত্তর :সংবিধান প্রণয়ন :আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনায় সংবিধান প্রণয়ন ছিল এক অতীব জরুরি কাজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান প্রণয়নের গুরুত্ব পাকিস্তানি শাসনামলেই উপলব্ধি করেন। পাকিস্তানের শাসকবৃন্দের শাসনতন্ত্র রচনা নিয়ে নানা টালবাহানা বঙ্গবন্ধুর মনকে পীড়িত করে রেখেছিল। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান দ্রুত প্রণয়ন করতে বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছিল। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে এসে প্রথম লগ্নেই তিনি সংবিধান প্রণয়নে মন দেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন বঙ্গবন্ধুর জীবনের আরও একটি শ্রেষ্ঠ কাজ। বঙ্গবন্ধু স্যার আইভর জেনিংসের বিখ্যাত উক্তি- The voice of the people is supreme- জনমতই সব কিছুর ঊর্ধ্বে- নিজের মধ্যে আত্মস্থ করেন। তাই তিনি মানুষের আনুগত্য ও শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসন অর্থাৎ সংবিধানকে প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করতেন।
এ সংবিধানে বাংলাদেশ সরকারের ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অনুসৃত নীতিমালা এবং আওয়ামী লীগের ৬ দফা ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার আলোকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ, উপঅনুচ্ছেদ ও লক্ষ্য প্রতিফলিত হয়েছে। জাতীয় নীতি চতুষ্টয়- বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ ওপর ভিত্তি করে শাসনতন্ত্র রচনার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন।
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদের স্পিকারের উদ্দেশে সুদীর্ঘ বক্তব্য প্রদান করে এই মর্মে মূল্যবান কথা বলেন যে, 'যদি এই অ্যাসেমব্লি ভবনও না থাকত, তবে গাছতলায় বসে আমার মেম্বাররা সংবিধান রচনা করতেন-এই সুনিশ্চিত আশ্বাসটুকু দিতে পারি।.... এই সংবিধানে মানবিক অধিকার থাকবে, যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারে।... আমরা একটি গণমুখী সংবিধান তৈরি করতে চাই এবং সেই সঙ্গে এই আশ্বাস দিতে চাই যে, আপনি যতক্ষণ নিরপেক্ষ থাকবেন, আমাদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন। ... আপনি কোন্‌ দল বড়, কোন্‌ দল ছোট তা দেখবেন না; কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিচার ও ইনসাফ করবেন।'
গণপরিষদে পূর্ণ বিতর্কের পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সংবিধান গৃহীত হয়। গণপরিষদ সদস্যগণ ১৪ ডিসেম্বর সংবিধানে স্বাক্ষর প্রদান করেন। ওই দিনই স্পিকার সংবিধান প্রমাণীকরণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর গণপরিষদ বাতিল করে ১৬ ডিসেম্বর থেকে সংবিধান কার্যকর করা হয়।
ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রত্যাবর্তন :বন্ধুরাষ্ট্র ভারত সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে। হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই বিশাল বাস্তুহারা মানুষকে ভারত সরকার, সশস্ত্র বাহিনী এবং ভারতের মহান জনগণ শুধু আশ্রয় দেয়নি, অন্য সব ধরনের মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করে। শত অসুবিধার বোঝা মাথায় নিয়ে ভারত সরকারের অতুলনীয় উপকারের কথা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ চিরদিন স্মরণে রাখবে।
বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট এবং দৃঢ়। বঙ্গবন্ধু অবশ্য ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা সফরে যান এবং তা খুবই ফলপ্রসূ ছিল। এই সফরের সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সৌহার্দপূর্ণ ও আন্তরিক আলোচনা হয়। আলোচনার সূত্র ধরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চের আগে বাংলাদেশ ত্যাগ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। তবে, দিল্লি থেকে ১০ মার্চ ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
এই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফর চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু নিজেই তাকে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। কার্যোপলক্ষে সৌভাগ্যবশত আমি বঙ্গবন্ধুর পাশেই ছিলাম। লক্ষ্য করি, বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত ভদ্র এবং বিনয়ের সঙ্গে; কিন্তু দৃঢ় স্বরে মিসেস গান্ধীকে তাঁর বাংলাদেশ সফরের আগেই ভারতীয় সেনাবাহিনী ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। পাশে থেকে মিসেস গান্ধীর সম্মতির কথা শুনলাম। মিসেস গান্ধীকে বলতে শুনেছিলাম- I am overwhelmed at your outspoken manner and boldness in discussing on this very important issue. Well, it will be done as per your honest wish  (আপনার স্পষ্টবাদী আচরণ এবং দৃঢ়তায় অভিভূত হয়েছি। ঠিক আছে, আপনার সদিচ্ছা পূরণ হবে।) মিসেস গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের আগেই ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সব সদস্যকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রশ্ন :প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস লক্ষ্যে গঠিত অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্মস কমিশন সম্পর্কে বলবেন? এ সময়ে গঠিত প্রশাসনিক অন্যান্য কমিটি ও এদের কাজ সম্পর্কে ধারণা দেবেন?
উত্তর :প্রশাসনিক ও চাকরি পুনর্বিন্যাস কমিশন :বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেই বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো বিন্যস্তকরণের সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পাহাড়প্রমাণ সমস্যা সমাধানে মনোনিবেশ করেন। দেশের বেসামরিক প্রশাসন কাঠামোয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মুজাফ্‌ফর আহ্‌মেদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। বিদ্যমান বিভিন্ন টেকনিক্যাল এবং নন-টেকনিক্যাল পদ ও চাকরির কাঠামো সরকারের স্বাভাবিক ক্রিয়ামূলক (functional) প্রয়োজনীয়তা এবং আবশ্যক নিরিখে ভবিষ্যৎ কাঠামো সম্বন্ধে এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর চাকরি ছাড়া অন্য সব ধরনের বেসামরিক চাকরিকে সমন্বিতকরণের উপায় সম্বন্ধে সুপারিশমালা প্রণয়নের দায়িত্ব এ কমিটিকে প্রদান করা হয়। নতুন চাকরি-কাঠামোয় সমপর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং চাকরি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনার দিকনির্দেশনা ও নীতিমালা নির্ধারণের দায়িত্বও কমিটির ওপর বর্তায়। সরকারের বিভিন্ন স্তরের চাকরিতে ভবিষ্যতে নিয়োগের নীতিমালায় শিক্ষাগত ও চাকরির অন্যান্য যোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব কমিটিকে দেওয়া হয়। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করার দায়িত্ব কমিটিকে অর্পণ করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর সরকার কমিটির সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর পরবর্তী কোনো সরকারই এ কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেননি।
বেসামরিক প্রশাসন পুনর্বিন্যাস কমিটি :বঙ্গবন্ধুর সরকার চাকরি পুনর্বিন্যাস তথা প্রশাসন-ব্যবস্থা সুসংহত করার আগে প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন বিভাগ ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জি.এ. ৪/৪১৭/৭১-১৫৭৩ সংখ্যক প্রজ্ঞাপন দ্বারা জনাব এম.এম. জামানকে চেয়ারম্যান করে বেসামরিক প্রশাসন পুনর্বিন্যাস কমিটি (Civil Administration Restoration Committee) গঠন করে। এই কমিটিকে সরকারের বিভিন্ন স্তরের বেসামরিক প্রশাসন-ব্যবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা পুনর্বিন্যাস এবং তৎকালীন পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/দপ্তরসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্তীকরণ এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রণালয়/দপ্তরের সঙ্গে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়/দপ্তরের একত্রীকরণের উপায় ও পন্থা সম্বন্ধে সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জাতীয় বেতন কমিশন :গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১ জুলাই, ১৯৭২-এর এমএফ (প্রশাসন) ২ই-১(৩০০)/৭২/১০৮১ সংখ্যক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জনাব এ. রবকে সভাপতি করে জাতীয় বেতন কমিশন গঠিত হয়। পাকিস্তানের কবলমুক্ত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণির পূর্ববর্তী কয়েকশ' কর্মচারীর জন্য প্রচলিত প্রায় দুই হাজার দুইশ' বৈষম্যমূলক ও অরাজক বেতনহার (pay scales) নিয়ে কমিশনকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ সরকার বেতনহারে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন। এই পরিবর্তনের ফলে বেতনহার পূর্বে প্রচলিত দুই সহস্রাধিক বেতনহারকে মাত্র ১০টি গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাজেই, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বঙ্গবন্ধুর সরকারই সুষ্ঠু সুশৃঙ্খলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হিসেবে পরিগণিত হওয়ার দাবিদার।
প্রশ্ন :শিল্পের জাতীয়করণ প্রসঙ্গে জানতে চাই। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত কী ছিল?
উত্তর :প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে জাতীয়করণ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনো অগণতান্ত্রিক কথামাত্র নয়, আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটা নতুন সমাজ ব্যবস্থার ভিত রচনার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়বো'।
বিদেশি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি ছাড়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা স্বাধীন বাংলাদেশে যত ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং শিল্প কারখানা ছিল সেগুলোকে জাতীয়করণ করার নীতিমালা বঙ্গবন্ধুর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ তারিখে রাষ্ট্রপতির ২৬ সংখ্যক আদেশ হিসেবে এটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করে সেগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা কীভাবে হবে জন্যও বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনা ছিল। এ সম্পর্কে তাঁর সরকারের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে দ্রুত ব্যবস্থা গৃহীত হয়। শোষণ ও অবিচারমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু তাঁর দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। এ জন্য উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব সৃষ্টি, নিস্কণ্টক ও শর্তহীন সাহায্য গ্রহণ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরষ্পর শ্রদ্ধাশীল থাকা ইত্যাদি প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু তাঁর সরকারের সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করেন।
জাতীয়করণ নীতির আওতায় বেসরকারি মাঝারি ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের উৎসাহ প্রদান করা হয়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (TCB) অধীনে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ন্যস্ত করা হলেও বৈদেশিক বাণিজ্য জাতীয়করণের পরিকল্পনা সরকারের ছিল।
প্রশ্ন :পরিকল্পনা কমিশন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কার্যক্রম কী ছিল?
উত্তর :সামগ্রিক ও সুপরিকল্পিতভাবে দেশ পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের দ্রুত উন্নয়নের পথে কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি জারিকৃত আদেশমূলে পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবগঠিত পরিকল্পনা কমিশনে একই রকমভাবে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য পেশাজীবীর সমন্বয় ঘটান বঙ্গবন্ধু। মুক্ত বাংলাদেশে প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে ডেপুটি চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয় অধ্যাপক নূরুল ইসলামকে। প্রধানমন্ত্রী নিজে ছিলেন চেয়ারম্যান। অধ্যাপক ইসলাম মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগ পান। কমিশনের অন্যান্য সদস্য ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদগণ- ডক্টর মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও ডক্টর আনিসুর রহমান- তাঁরা প্রত্যেকেই প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন ছিলেন।
পরিকল্পিত উপায়ে দেশ গঠনে এবং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) প্রণীত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অভিপ্রায় অনুযায়ী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তব প্রেক্ষাপটে প্ল্যানিং কমিশন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। তিনি প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখেন। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি শত্রু-শক্তিকে বিতাড়িত করার মাত্র দেড় বছরের মধ্যে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সম্বন্ধে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, প্রস্তুতির সময় যেভাবে চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছিল তা থেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে ব্যতিক্রমধর্মী করতে হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মুখবন্ধে তিনি বলেন যে, কোনো পরিকল্পনাই, এমনকি সবচেয়ে সুন্দরভাবে গ্রথিত পরিকল্পনাও কোনো ভালো ফল অর্জন করতে পারে না- যদি না তাতে জনসাধারণের সার্বিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, যদি-না া কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়। জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধু জনসাধারণের প্রতি আত্মনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
প্রশ্ন :নতুন মন্ত্রণালয় গঠন নিয়ে কী ভাবনাসমূহ কাজ করেছিল?
উত্তর :জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব প্রত্যক্ষভাবে গ্রহণ করেই দেশ পরিচালনায় চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুরু করেন। বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয় সামাল দিতে তিনি প্রথম বাংলাদেশ সরকারের অবয়বেও পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে যে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধ পরিচালনা এবং যুদ্ধ অবসানের পর দেশ পুনর্গঠন এবং উন্নয়নের জন্য সরকার গঠন করেন। দেশ মুক্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু এ সরকারের উপযোগী পরিবর্তন সাধন করতে প্রয়াসী হন। এজন্য সরকার পরিচালনা পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। অধিকন্তু সরকারের কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য নতুন নতুন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, বিভাগ সৃষ্টি জরুরি হয়। মাত্র সাড়ে তিন বছরে (১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত) বঙ্গবন্ধু পরিকল্পনা অনুসারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার পরিচালনার কাজ করেন। বাংলাদেশ সরকারের যাত্রাপথ বিপদসংকুল চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে মসৃণ হয়ে আসার প্রাক্কালে তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী পক্ষ নিশ্চিহ্ন করে দেয়, বঙ্গবন্ধুকে বরণ করতে হয় নৃশংস মৃত্যু। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথ ধরেই এখনও বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংকটের আবর্তে থেকেও প্রথম বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় সব কাজ সম্পন্ন করার জন্য খুবই স্বল্প পরিসরে কয়েকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, অঙ্গ সংগঠন সৃষ্টি করে। দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। তেমনি, বিদেশে বাংলাদেশের কর্মতৎপরতা সচল রাখতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দেশের অর্থনৈতিক বিষয়, শিল্প-কলকারখানা ও বাণিজ্যিক দিকগুলোর দিকে দৃষ্টি রাখতে অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। সরকারি আদেশ-নির্দেশ-প্রজ্ঞাপন জারিসহ নিয়োগ-বদলি-পদায়ন প্রভৃতি কাজসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় এবং সাধারণ প্রশাসন বিভাগ সৃষ্টি করা হয়। এ ছাড়া সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবিরের অসুস্থ, আহত মানুষের সেবা ইত্যাদির জন্য স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠাসহ তথ্য ও বে মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়, সংসদবিষয়ক বিভাগ তৈরি করা হয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিবিষয়ক কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য সৃষ্টি হয় কৃষি বিভাগ। মুক্তিযোদ্ধা এবং জনগণের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থায় পুল-কালভার্ট, সেতু, রেলওয়ে, নৌপথ ইত্যাদি যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে সে জন্য এসব বিষয় দেখভাল করতে সরকারের প্রকৌশল বিভাগও ছিল। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বাধীনে কিছু সংস্থা গঠন করা হয়।
প্রশ্ন :প্রশাসক বঙ্গবন্ধুকে সামগ্রিকভাবে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
উত্তর :কী ধরনের রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু ছিলেন এবং কী কী প্রশাসনিক উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেন- তা সীমিত পরিসরে বলা কঠিন। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই তিনি প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছেন সদ্য মুক্ত বাংলাদেশ, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করে এমন একটি রাষ্ট্র এবং সরকারের ভিত্তি স্থাপন করতে যেখানে ও যার মাধ্যমে শোষণহীন এক সমাজ কায়েম হবে। স্বাধীন হবার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের ভারতে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান এবং দৃঢ়চেতা জাতীয়তাবাদী ভূমিকা, তা সারা পৃথিবীতেই বিরল। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহতকরণের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোগুলো বঙ্গবন্ধু নির্ধারণ করে গেছেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম সুলিখিত সংবিধান প্রণয়ন, রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত নির্ধারণ, জাতীয় প্রতীক প্রণয়ন, রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যপদ্ধতি এবং কার্যবণ্টন (রুলস অব বিজনেস এবং অ্যালোকেশন অব বিজনেস) তৈরি করাসহ যুধবিব্ধস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সদস্যপদ অর্জন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, উন্নয়নসহ অসংখ্য মৌলিক কাজ তিনিই করেছেন অসাধারণ নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞার দ্বারা, সম্মোহনী নেতৃত্বের গুণাবলির অতুল স্পর্শে।
রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন, স্বাধীনতা অর্জন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহতকরণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়নসহ সার্বিকভাবে রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধুর এই মৌলিক কাজগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী সব সরকার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছে এবং সেগুলোর ওপর নির্ভর করেই াও দেশ পরিচালনা করেছে। বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী চিন্তার কারণে প্রতিষ্ঠিত সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্তসমূহের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে সব সরকার নিজেদের ধ্যানধারণামতো অগ্রসর হবার চেষ্টা করেছে।

বিষয় : বঙ্গবন্ধু শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্প ছিলেন

মন্তব্য করুন