৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ২৬ মার্চ থেকে লকডাউন। শুরুতে কেউ হয়তো ভাবেনি এত বড় একটা মহামারির দিকে যাচ্ছে বিশ্ব, যাচ্ছে দেশ। আতঙ্ক ঘিরে ধরেছিল আমাদের। সেই আতঙ্ক এখন অনেকটাই কমে এসেছে। কাজ-কর্মে, অফিস- আদালতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। মানুষ কতদিন ঘরে বসে থাকবে। অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যাচ্ছে। দেশের অনেক বরেণ্য লোক হারিয়েছি আমরা। গুরুত্বপূর্ণ অনেকে চলে যাচ্ছেন আমাদের ছেড়ে। গ্রামে যদিও এর প্রভাব কম। বন্ধ ঘরে থাকলে এটি বেশি ছড়ায়। গ্রামের মানুষ খোলা হাওয়ায় থাকে, হয়তো সেজন্যই এর প্রভাব কম গ্রামে। তবে শহরে এর প্রভাব ভয়াবহ। তবু মানুষ কাজে যাচ্ছেন। রিকশা চালাচ্ছেন। ফসল ফলাচ্ছেন। মিটিং-মিছিলও চলছে। এর ভেতর শহরে কাজ হারিয়েছেন অসংখ্য গার্মেন্ট কর্মী, বাসাবাড়িতে কাজ করা গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে কাজ করা নারী কর্মী। পুরুষদের তুলনায় নারীদের চাকরি হারাতে হচ্ছে বেশি। অথচ নারী কাজ করছেন পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অনেকে বলেন, নারী সমান সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ কর্মক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। গৃহস্থালির কাজও সামলাতে হয় নারীকে। পুরুষ কিন্তু সমানভাবে কাজ করেন না। একজন নারী অফিস করে এসে আবার স্বামীর জন্য খাবার ও বাচ্চার দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন। পুরুষরা ভাবেন, এসব কাজ তাদের নয়। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনটা আগে করতে হবে। অনেক নারী নিজের কর্মদক্ষতায় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে জাতি হিসেবে নারীরা প্রাপ্য মর্যাদা পাচ্ছেন না। এই প্রথা ভাঙতে হবে। এসব নিয়ে একজন নারীবাদী হিসেবে কথা বলি বলে অনেকে আমাদের উগ্রবাদী ভাবেন। আমি নারীবাদী মানে সমান অধিকার চাচ্ছি। আমি যদি আমার ভেতরে পরিবর্তন না ঘটাতে পারি তাহলে পুরো সমাজ পাল্টাতে পারব না। আমার বাড়ি ও কর্মস্থলে যদি পরিবর্তন না আনতে পারি, তাহলে পরিবর্তন হবে না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বদলাতে হবে মানসিকতাও।
আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রশাসনের কার্যক্রমও যেন কমে আসছে। ফলে অনৈতিক কাজ বেড়ে যাচ্ছে। আবার এসব অপরাধী রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা প্রশাসনের কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় চোখ রাখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। এসব ঘটনা শুধু নারী সমাজকে নয়, বৃহত্তর নাগরিক সমাজকেই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ফেলেছে। নোয়াখালীতে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হয়েছে। সিলেটে এমসি কলেজের হোস্টেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। শিশু, কিশোর, যুবতী, বিবাহিত, অবিবাহিত এমনকি বৃদ্ধ নারীও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। নিজ বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, পর্যটনকেন্দ্র সর্বত্রই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। ঘটনাগুলো নারীকে এই বার্তা দেয় যে- নারী তুমি শুধুই পণ্য। এ পরিস্থিতির জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমাদের সমাজপতিরা দায়ী।
নোয়াখালীর সর্বশেষ ঘটনাটি মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে ওই নারীকে নির্যাতন করা হয় এবং ভিডিও ধারণ করা হয়। আমি একই সঙ্গে বিক্ষুব্ধ ও বিস্মিত যে, এতদিন এ নিয়ে জাতীয় স্তরে দূরে থাক, স্থানীয় পর্যায়েও কোনো টুঁ শব্দটি হয়নি। নারীর সল্ফ্ভ্রম ও নাগরিকের মর্যাদা এতটাই মূল্যহীন?
মন্দের ভালো, নির্যাতনের সেই ভিডিও এক মাস পর ভাইরাল হওয়ার পর প্রশাসন সক্রিয় হয়েছে এবং মামলা করেছেন ভুক্তভোগী নারী।
আইনের প্রতি জনগণের আস্থা কতটা কমে গেছে, তা এ ঘটনাটি বিশ্নেষণ করলেই বোঝা যায়। ঘটনার এক মাস পর ভিডিওটি ভাইরাল করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগী থানায় যাননি। কী কারণে তিনি থানায় যাননি? ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরই কেবল পুলিশ তৎপর হয়েছে। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, নোয়াখালীর মতো এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটে। এর মধ্যে অল্প কিছু ঘটনা আমরা জানতে পারি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় যান না। আবার কেউ কেউ থানায় গেলেও মামলা করতে পারেন না। আবার কোনোমতে মামলা হলেও আসামি গ্রেপ্তার হয় না। ফলে ন্যায়বিচার তথা অপরাধীর শাস্তি অধরাই থেকে যায়।
আবার দেখা যায় অপরাধীরা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত অথবা তাদের যথেষ্ট অর্থ আছে, যা দিয়ে তারা তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পারে বা তাদের অপরাধকে দুর্বল করে ফেলতে পারে। আমরা দেখছি একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। এর জন্য মূলত দায়ী জনগণের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত বাহিনীর দুর্বলতা ও উদাসীনতা।
২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর ফুর্তি হতে যাচ্ছে। এই দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা যুদ্ধ করেছেন। জীবন দিয়েছেন তারা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ দেশ চেয়েছিলেন। অথচ এখন এসব দুর্বল হয়ে এসেছে। গণতন্ত্রের চর্চাও কমে গেছে। ফলে অপরাধের জায়গাটা বেড়ে গেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। বলা যায়, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু কিছু ঘটনা বাংলাদেশের অর্জনগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমরা দেখেছি কভিড-১৯ মহামারি চলাকালে কভিডের জাল সনদ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে অভিবাসীদের হাতে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে সাংঘাতিকভাবে। এ ধরনের জঘন্যতম অপরাধের পরও অপরাধীরা মনে করে তারা পার পেয়ে যাবে। যারা এ অপরাধগুলোকে বিচার প্রক্রিয়ায় দাঁড় করাবে, তাদের সঙ্গে অপরাধীদের সখ্য থাকে।
আমাদের দেশে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই সরকারকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে নারী নির্যাতন রুখে দাঁড়াতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব থাকে সব ধরনের অপরাধকর্মকে রুখে দেওয়া। কেউ অপরাধ করলে তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো। বিচার বিভাগের কাজ কেউ কোনো অপরাধ করলে তার বিচার যেন সঠিকভাবে হয়। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ জনগণের নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। একটি বিভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতে আর অন্যটি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মানুষের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করে।
এ দুটি বিভাগ দুর্বল হয়ে পড়লে, মানুষের আস্থা না থাকলে এবং মানুষ যদি মনে করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা দেবে না, আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না, তখন অপরাধীরা অপরাধকর্মে আরও বেশি উৎসাহিত হয়; কারণ তারা জানে যে, তারা পার পেয়ে যাবে।
এও মনে রাখতে হবে, যখন গণতন্ত্র সঠিকভাবে চর্চা করতে দেওয়া হয় না বা গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে, জবাবদিহি থাকে না, ন্যায্যতার অভাব দেখা দেয়; তখনই এ ধরনের অপরাধ ঘটতে থাকে। আমরা দেখেছি যেসব দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, যেখানে জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই, সেখানে অপরাধের মাত্রা বাড়তেই তাকে। আমার অনুরোধ, প্রধানমন্ত্রীসহ রাজনৈতিক নেতারা যেন এসব বিষয়ে কঠোর হোন। এ ধরনের ঘটনায় কঠোর বার্তা দেওয়া উচিত যে, কোনো ব্যক্তি যদি এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত হন তিনি রাজনৈতিকভাবে যে অবস্থানেই থাকুন না কেন তাকে শাস্তি দিয়ে আইনের শাসন বলবৎ রাখা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে কিছু ঘটনা খুব বেশি আলোচিত হয় এবং জনগণ সোচ্চার হয়ে ওঠে। এসব ঘটনায় আসামি দ্রুত গ্রেপ্তার হয়। নিম্ন আদালত দ্রুত রায়ও দেন। এরপর উচ্চ আদালতে সে মামলা চলে বছরের পর বছর। অনেক আসামি জামিনে মুক্তিও পান। আমাদের দেশে এ ধরনের মামলাগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন সরকারি আইনজীবী বা পিপি। এই পিপি নিয়োগ পান রাজনৈতিক পরিচয়ে, তারা অনেক সময় জনগণের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থকেই বড় করে দেখেন। সংগত কারণে এ ধরনের মামলা পর্যবেক্ষণ হওয়া উচিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আমরা কিছুদিন আগে দেখেছি গির্জার পাদ্রিও ধর্ষণ করেছেন। নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন বন্ধ করতে হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নারী ও পুরুষকে সমানভাবে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। যারা ধর্ষণ করে তারা মানুষ নয়। তারা নিজেকেই সম্মান করতে জানে না। তারা সমাজের কলংক, সমাজে বসবাসের যোগ্য নয়। এ ধর্ষকশ্রেণির বিচার যেমন করতে হবে, তেমনি নারীর অস্তিত্বের স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা দিতে হবে। নারীকে দুর্বল করে রাখার সামাজিক ব্যাধি দূর করতে হবে সবার আগে।
আমরা অনেক সূচকে ভালো আছি ভারত-পাকিস্তানের তুলনায়। এতে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। আমরা সবাই সবকিছুতে ভালো থাকতে চাই। স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চলা এই সময়ে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল ক্ষমতায় আছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে সমাজ গড়ে তুলতে হবে। সরকার তাদের সমালোচনা নিতেই পারছেন না। সমালোচনা আর বিরোধিতা এক জিনিস নয়। সরকারকে এটা বুঝতে হবে। আর সমালোচনা নিতে হবে। সবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আত্মবিশ্নেষণ করে নিজেদের শুধরে নিতে হবে। রাজনীতি মানে লুটপাট নয়; এর পরিণতি খারাপ হতে পারে। ইতিহাস তাই বলে।
লেখক
সমন্বয়ক
নিজেরা করি

বিষয় : আমরা ভালো থাকতে চাই

মন্তব্য করুন