বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের সব মানুষকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা যিনি ছিলেন, তারও জন্মশতবর্ষ আমরা উদযাপন করেছি। তার অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে, অনেক স্বপ্ন এখনও বাস্তবায়ন থেকে দূরে রয়ে গেছে।
একাত্তরের মার্চ মাস, আমরা তখন দুর্বার তারুণ্যের অংশ। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছি। উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনে ক্লাস বয়কট করেছি। রেসকোর্সের কোনায় বসে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ শুনে উত্তেজিত, উদ্বেলিত এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। তারপর চলে গেছে দীর্ঘ পাঁচটি দশক- নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে, মাঝে মধ্যে হোঁচট খেয়েছে, কিন্তু উঠে দাঁড়িয়েছে, সামনে এগিয়ে যাওয়া থেমে থাকেনি।
বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন- বাংলাদেশের নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার। যার জন্য আমাদের লাখ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন। আজ বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে দেখছি সেই স্বপ্নের অনেক কিছুই আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাতে আমাদের অগ্রগতি বারবার থেমে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। সবার জন্য একই ধারার, একমুখী, বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে তৈরি করা যায় সেই দিকনির্দেশনা প্রণয়নের জন্য 'কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন' গঠন করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে আমাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পরপর আমাদের সাক্ষরতার হার ছিল ২০ শতাংশের মতো। অনেকদিন পর্যন্ত সেখান থেকে আমরা এগোতে পারিনি। ছেলে-মেয়ের সমতা তো দূরের কথা বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে অনেক দূরে হারিয়ে গেল। সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে মোটাদাগে মূলধারা, ধর্মীয় ধারা এবং ইংরেজি মাধ্যম- এই তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল বাংলাদেশে। ধীরে ধীরে বৈষম্য আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে থাকল। ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চবিত্তের সন্তান, মূলধারা বা বাংলা মাধ্যমে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তান আর ধর্মীয় ধারা অথবা এনজিও পরিচালিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় বিত্তহীনের সন্তানেরা পড়বে- এটিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
আয় বৈষম্য বাড়তে থাকার কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ভেদাভেদ তৈরি হলো, তা পাকাপোক্ত হলো আশির দশকে- ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য দেখা দিলো। সামরিক শাসকের পতনের পর নব্বইয়ের দশক থেকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের ধারা যখন সূচিত হলো, তখন আমরা শিক্ষায় বেশকিছু অগ্রগতির ধারাও লক্ষ্য করলাম। বিশেষ করে মেয়ে শিশুর শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় অভভরৎসধঃরাব উরংপৎরসরহধঃরড়হ চড়ষরপু অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা- সেই কর্মসূচি তখন নেওয়া হলো। মেয়েদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা হলো, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা হলো। পরবর্তী সময়ে আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, আরেকটি দল নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে; কিন্তু মেয়েশিশুর জন্য ইতিবাচক নীতিমালার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং সেই ধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সাধারণত সরকার বদল হলে দেখা যায় সব নীতিই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মেয়ে শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারাটি অব্যাহত থাকল। প্রথমে পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি, আর এখন দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক। সেইসঙ্গে উপবৃত্তি চলছে। এর মধ্যে দেখা গেল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। তখন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বা নীতিনির্ধারকরা সংগতভাবেই ভাবলেন যেন ছেলে-মেয়ের মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে গিয়ে নতুন আরেকটি বৈষম্য তৈরি না হয়; ছেলেরা যাতে পিছিয়ে না যায়- সে কারণে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া এলাকার ছেলেদের জন্যও ২০ শতাংশ উপবৃত্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মেয়েরা এগিয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে উপরের স্তরগুলোতেও মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন মেডিকেল, প্রকৌশলসহ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী নারী।
কিন্তু সংখ্যাগত দিক দিয়ে শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ একদিকে দৃশ্যমান হলেও অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জ উঠে এলো। কারিগরি শিক্ষায় মেয়েরা তেমন আসছিল না; এমনকি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ও মেয়ের সংখ্যা অনেক কম। আবার উচ্চতর পর্যায়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আরেকটি বড়ো চ্যালেঞ্জে হলো, বাল্যবিবাহের প্রবণতা, যা শিক্ষা থেকে মেয়েদের ঝরে পড়ার একটি বড় কারণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিককালে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রে- সেটি হলো নারীর প্রতি সহিংসতা। স্বাধীনতার এত বছর পরও মেয়েদের চলাচলের জন্য আমরা রাস্তাঘাট নিরাপদ করতে পারিনি। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নারীরা মাঝেমধ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে থাকেন। গণপরিবহন ও কর্মস্থলেও তারা নিরাপদ নন। দুঃখের বিষয় যে, শুধু এসব ক্ষেত্রেই নয়, ঘরের ভেতরেও নারীর প্রতি সহিংসতার লাগাম আমরা এত বছরেও টেনে ধরতে পারিনি। ২০১৮ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলেছে, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে নিজ গৃহেই নির্যাতিত হয়ে থাকেন; হয়তো স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি নয়তো সন্তান অথবা অন্য কারও হাতে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, আমাদের নারীর অগ্রযাত্রা একদিকে যেমন দৃশ্যমান- তৃণমূল থেকে হিমালয় শিখর পর্যন্ত, অন্যদিকে ঘরে-বাইরে নারীকে প্রায়শ নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে নারীদের জীবন-জীবিকা, শিক্ষাঙ্গন- সর্বত্র।
শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। ততোধিক বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার মান। নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সবার শিক্ষার মান নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরাও চিন্তিত। সংখ্যার দিক দিয়ে আমরা শিক্ষায় অনেকদূর এগিয়েছি। এটি সারাবিশ্বেই স্বীকৃত যে, বাংলাদেশের মতো তথাকথিত দরিদ্র, উন্নয়নশীল দেশের রক্ষণশীল সমাজে শিক্ষায় এমন অগ্রগতি সাধারণত দেখা যায় না। এর পিছনে তিনটি প্রধান কারণ। প্রথমটি হলো, বাংলাদেশে সর্বস্তরে জনমানুষের মধ্যে শিক্ষার চাহিদা তৈরি হয়ে গেছে। একেবারে বিত্তহীন মানুষ থেকে উচ্চবিত্ত, সাধারণ শ্রমজীবী থেকে নীতিনির্ধারক শ্রেণি- সবাই তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী। দ্বিতীয়টি হলো, শিক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে কখনও ভাটা পড়তে দেখিনি আমরা। এ ব্যাপারে গণতান্ত্রিক সব সরকারের সবসময় শক্ত অবস্থান ছিল। এখনও সেটি অব্যাহত আছে। তৃতীয়টি হলো, সহায়ক নীতিমালা। শুধু মেয়ে বা নারীর জন্য নয়, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি থেকে শুরু করে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ পদ্ধতির বইপুস্তকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আদিবাসী শিশুদের জন্য পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হচ্ছে। আর বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তো সব শিক্ষার্থীর জন্যই দেওয়া হয়; এই সহায়ক নীতিমালাগুলো শিক্ষার অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
আরও বেশকিছু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাংলাদেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান। আমরা জানি, রাজনীতিতে একেবারে ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন করার জন্য বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা দলটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটি রাখা হয়নি। দলের সর্বপর্যায়ে সর্বস্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এক- তৃতীয়াংশ নারী থাকার কথা ছিল। সেটি কোনো রাজনৈতিক দল বাস্তবায়ন করেনি। তার পরেও বাংলাদেশের একটি অর্জন পৃথিবীব্যাপী আলোচিত- ২৯ বছর ধরে আমাদের সরকারপ্রধান নারী! পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল।
সাম্প্রতিককালে নারী অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে ওষুধ শিল্প, চা শিল্প, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষিসহ সর্বত্র নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মুহূর্তে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রয়েছে বাংলাদেশে, যার মধ্যে অধিকাংশই নারী। তারা কৃষি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে একটু প্রণোদনা, একটু পরিবেশ পেলেই নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে আসছেন। ইদানীং প্রশাসনেও নারীর পদচারণা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান-সামরিক বাহিনী, পুলিশ প্রশাসন, এমনকি শান্তিরক্ষী মিশন- সর্বত্র আমাদের নারীরা অংশ নিচ্ছেন এবং যথাযোগ্য মর্যাদা ও সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এই করোনা মহামারির সময়েও আমরা দেখলাম, যাদের আমরা সম্মুখ সারির করোনাযোদ্ধা বলেছি, তাদের মধ্যে অনেক নারীও ছিলেন।
দৃশ্যমানতা ও সংখ্যার দিক দিয়ে এগুলো বড় অর্জন। কিন্তু অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় এখনও নারীর অবস্থান শক্ত হয়নি। এমনকি বেসরকারি খাতেও- শিল্পপ্রতিষ্ঠান অথবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর সংখ্যা এখনও হাতে গোনা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন নারী, বিচার বিভাগে নারীরা এসেছেন; কিন্তু এসব উচ্চতর পর্যায়ে অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বেরও জায়গা থেকে সমতা অর্জনে এখনও অনেকদূর যেতে হবে।
আমাদের সমাজ নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা অংশীদারিত্বের জায়গায় দেখতে অভ্যস্ত নয়, একজন নারী তার পেশা-জীবিকা নিয়ে যদি এগিয়ে যেতে চান, তখন সাধারণত প্রথম বাধাটা আসে পরিবার থেকেই। এক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার বোধ যেমন কাজ করে, তেমনি পারিবারিক মানসিকতা, কূপমণ্ডূকতা ও অনেক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কেবল সরকার বা রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নয়, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র- সর্বত্র নারীর অংশীদারিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাটি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এই জায়গাটিকে শক্ত করার জন্য পরিবার থেকেই পরিবর্তন শুরু হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার কারণে নারীর প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি।
লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, সংখ্যাগত দিক থেকে অংশগ্রহণ যতটাই বৃদ্ধি হোক, শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নিম্নতম। আমরা অনেক মেগা প্রকল্প করছি- খুবই ভালো, কিন্তু মানব সক্ষমতা বিনির্মাণ করতে না পারলে আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর মতো মেগা অবকাঠামোগুলো আগামীতে দেখাশোনা করবে কে? প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির যুগে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিজ্ঞানমনস্ক, দক্ষ জাতি তৈরির বিকল্প নেই। সেখানে আমরা বৈশ্বিক একটি রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক বিভাজনের মধ্যেও পড়ে গেছি। ধর্মীয় উগ্রবাদের কারণে আজ বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টির মতো আমাদের অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়ন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, পদে পদে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
পঞ্চাশ বছর আগে বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় একটি স্তম্ভ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে আমরা অনেকদূর সরে গেছি। যে কোনো ধরনের উগ্রবাদ, সেটি ধর্মীয় হোক, রাজনৈতিক হোক- তার প্রধান শিকার হয় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশু। সেটি যুদ্ধবিগ্রহ হোক, বৈশ্বিক সংকটই হোক অথবা স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই হোক।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান ঘটেছে দেশে দেশে। বাংলাদেশেও ধর্মকে ভিত্তি করে সামাজিক ও রাজনৈতিক উগ্রবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একের পর এক সাম্প্রদায়িক চেতনাভিত্তিক আস্টম্ফালন ও আক্রমণ ঘটেই চলেছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে তৈরি করা দল এখন ক্ষমতায়। সেই দলের তো কোনো রকম ধর্মীয় উগ্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি নানাভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নষ্ট করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। পঞ্চাশ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংগ্রাম করে আমরা স্বাধীন দেশের পতাকা এনেছিলাম। এখন আরেকটি সংগ্রাম- বৈষম্যহীন সমাজের সংগ্রাম, ধর্মীয় উগ্রবাদকে প্রতিহত করে নারী-পুরুষের অসুস্থ বিভাজন ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের দমিয়ে রাখার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। ধর্মের অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই সন্ত্রাসকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। আমাদের দেশের আপামর জনগোষ্ঠী অকারণে কোনো ধরনের রক্তপাত চায় না। তারা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়; তারা অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন; কিন্তু রাজনীতির নামে যে বিভাজন আর অসহিষ্ণুতা চলে তাকে সমর্থন করে না।
আমাদের অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সংস্কৃতি। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে একটি বড় অংশ ছিল বাঙালির শাশ্বত সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা, যেখানে নারীর ভূমিকাও দৃশ্যমান ছিল শিল্পচর্চার প্রায় সব ক্ষেত্রে। সংগীত, চলচ্চিত্র, নাট্য পরিচালনা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সর্বত্র নারীর অনেক অবদান রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজে যথাযোগ্য অনুপ্রেরণা আমাদের মেয়েরা প্রায়শ পায় না। তবু সব বাধা পেরিয়ে নিজের শক্তি দিয়ে তারা এগিয়ে আসছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিকে আমরা একসূত্রে গাঁথতে পারিনি। শিক্ষার বৈষম্যমূলক বহু ধারাকে এখনও একমুখী করতে পারিনি। কুদরাত-এ-খুদা কমিশন প্রণীত শিক্ষানীতিকে আমরা পাশ কাটিয়ে গেছি। ২০১০ সালের শিক্ষানীতির মধ্য দিয়ে একাত্তরের স্বপ্নপূরণের চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু সব শিক্ষার্থীকে একই ধারায় আনা সম্ভব হচ্ছে না বর্তমান পুঁজিবাদী, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। বর্তমানে একেক ধারায় একেক রকম পাঠ্যসূচিতে চলছে শিক্ষা, যার মাধ্যমে আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এক বিভাজন তৈরি করে দিচ্ছি আমরা। বাংলাদেশের মাটিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে অবশ্যই আনতে হবে। সে নিয়মের নির্মাণ ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত একটি শিক্ষা আইন আমরা এখনও করতে পারিনি। এসবই আমাদের চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এ চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশকে অবশ্যই মোকাবিলা করতে হবে।
সবকিছুর পরও আমাদের বড় শক্তির জায়গা হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক অনেক বিপর্যয় সাফল্যের সঙ্গে সামলে নিয়েছে। এতকিছুর পরেও যেকোনো বিপর্যয়ে বাংলাদেশের মানুষের এগিয়ে যাওয়ার একটা অসাধারণ স্পৃহা, অদম্য শক্তি আছে। তথ্যপ্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিনে আজকের বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে আমরা যদি নীতি-নৈতিকতাবোধসম্পন্ন বৈষম্যহীন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা করে দিতে পারি, তবে তাদের অগ্রযাত্রাকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু যেভাবে বলেছিলেন, 'দাবায়ে রাখতে পারবা না'- আজকে পঞ্চাশ বছর পরে সেটাই মনে হয় যে, তার স্বপ্নের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারলে আমাদের কেউই দাবিয়ে রাখতে পারবে না। এ জন্য চাই বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, দক্ষ জাতি গঠনে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সহায়ক নীতিমালা, যথাযথ কৌশল এবং যথার্থ বিনিয়োগ।
আমার একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করতে চাই। চার বছর আগে সিলেটের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা কয়েকজন শান্তি ও মূল্যবোধের নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করছিলাম। তখন দশম শ্রেণির একটি মেয়ে বলেছিল, আপনারা যে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা বলছেন, দুর্নীতিও তো সেই অবক্ষয়ের অংশ। বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই সেটি মূল্যবোধের অবক্ষয়। তখন সে বলল, আমার বাবা সরকারি চাকরি করেন এবং আমি জানি তিনি কত বেতন পান। কিন্তু গত ঈদে পনেরো হাজার টাকা দিয়ে তিনি আমাকে একটি লেহেঙ্গা কিনে দিয়েছেন। আমার মূল্যবোধের জায়গা থেকে কি প্রতিবাদ করা উচিত ছিল না? আমরা তাকিয়ে রইলাম মেয়েটির দিকে। বললাম, সেটি তোমার করা উচিত ছিল। পরে শুনেছি কোরবানি ঈদে সে তার বাবার দেওয়া দামি উপহার প্রত্যাখ্যান করেছে। শাবাশ বাংলাদেশ।
তরুণদের মধ্যে এমন মানবিক শক্তি আছে। বক্তৃতা-বিবৃতি বা পুথিগত বিদ্যা দিয়ে নয়, হৃদয়ের শক্তি দিয়ে, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত দিয়ে তাদের সঠিকভাবে চালিত করতে পারলে তারা ঠিকই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
লেখক
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

বিষয় : বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন

মন্তব্য করুন