১. বিস্ময়, ধাঁধা ও প্যারাডক্স
এখনো পায়নি, তবে, কালক্রমে অর্থনীতির টেক্সবইতে জায়গা করে নেবে 'বাংলাদেশের উন্নয়ন বিস্ময়'- কেউ কেউ সংক্ষেপে যাকে বলেছেন, 'বাংলাদেশ প্যারাডক্স' বলে। নব্বইয়ের দশকের শেষে এসে প্রথমে শোনা গিয়েছিল ধাঁধার কথা। এত নিচু আয়ের স্তরে থেকে বাংলাদেশ কী করে এত দ্রুত প্রজনন হার (ফার্টিলিটি রেট) এবং শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে নিয়ে আসতে পারল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার বাড়াতে পারল, (এবং সেটা রক্ষণশীলদের এক রকম চোখ-রাঙানি অস্বীকার করেই)- সেটা তো এক হিসেবে 'ধাঁধা'ই। ইংরেজিতে 'বাংলাদেশপাজল' শব্দটাই ব্যবহার করা হচ্ছিল তখন বারবার করে। ধাঁধার পরে ব্যবহূত হলো 'প্যারাডক্স' শব্দটি, অর্থাৎ ভাবখানা এই যে, এসব সাফল্য তো হওয়ার কথা নয়; উল্টো অবস্থার ক্রমাবনতি হওয়ারই কথা ছিল। সেটা যে হলো না তা কি পরিসংখ্যানের গলদ, অথবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য- নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক পরিবেশগত বিবেচনা বহির্বিশ্বের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে বলে? এ জন্যই কূটাভাস বা প্যারাডক্স শব্দের তকমা পরানো হলো। বাংলাদেশে 'ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল' ও আরও কিছু সংস্থার সূচক ক্রমাগত বলে যাচ্ছিল ২০০০-র দশকের শুরুতে যে, সুশাসনের পরিস্থিতির ফি-বছর অবনতি হচ্ছে এবং কিছুতেই সেই অবনতির ধারাকে ফেরানো যাচ্ছে না। ছেলেবেলার নার্সারি রাইম মনে করে টিএস এলিয়ট যেমন লিখেছিলেন, 'লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন ফলিং ডাউন ফলিং ডাউন' পাশ্চাত্য সভ্যতার পতনকে লক্ষ্য করে, তেমনি করেই যেন বিদেশি সংস্থাগুলো সুর মিলিয়ে 'সুশাসনের সূচকের পতন হচ্ছে পতন হচ্ছে পতন হচ্ছে' বলে যাচ্ছিল অনবরত। তাদের বক্তব্য, এ রকম অবনতিশীল সুশাসন সূচকের পরিস্থিতিতে কী করে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসূচকে অগ্রগতি। শুধু সামাজিক সূচকেই নয়, কীভাবে অপশাসনের পরিস্থিতিতে থেকেও সম্ভব হয় কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের সাফল্য, রপ্তানিমূলক গার্মেন্টস শিল্পে অগ্রগতি, ১৯৯৮ সালের মতো বন্যা-দুর্যোগ মোকাবিলায় দৃঢ়তা, স্থৈর্য ও রেসিলিয়েন্স দেখানো? এক সময় অবশ্য প্যারাডক্স শব্দটাও ঝরে পড়ল বাংলাদেশ- বিশেষজ্ঞদেরডিকশনারি থেকে। ২০০০ সালের শেষের দিক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালের কভিড সামাল দেওয়া পর্যন্ত ব্যবহূত হয়ে আসছে একটাই শব্দ বেশি বেশি করে সেটি হচ্ছে 'বিস্ময়' : বাংলাদেশ একটি 'উন্নয়ন-বিস্ময়' (ডেভেলপমেন্ট সারপ্রাইজ)। ধাঁধা-প্যারাডক্স ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত 'বিস্ময়' শব্দটাই টিকে গেল। ২০২০-এর দশকে যখন অর্থনীতি প্রবেশ করছে, তখন তৃতীয় বিশ্বের বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। অন্য কোনো শব্দে এ দেশের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতার 'বিদেশি ভাষায়' অনুবাদ করা চলে না এখন বুঝি। এই বিস্ময়ের রহস্য-উন্মোচনের দিকে মুখ রেখে কয়েকটি জল্পনা থাকল এই লেখাটিতে।
২. অপ্রত্যাশিত নাকি প্রত্যাশিত?
মাঝে মাঝে চারপাশে উন্নয়ন-বিস্ময় ও অপ্রত্যাশিত সাফল্যের ন্যারেটিভ শুনতে শুনতে আমার মনে হয়- সব অর্জনই কি প্রত্যাশার বাইরে ছিল? যাদের মঙ্গলগ্রহে পৌঁছানোর কথা, যাদের চাঁদে ট্রানজিটে থাকার কথা, তারা যদি মহাকাশযানে করে গ্রাভিটির বলয় ভেদ করে পৃথিবীর আকাশে স্পেস-স্টেশন বানায় বা নূ্যনপক্ষে রকেট উৎক্ষেপণের সামর্থ্য অর্জন করে- তাকে কি আমরা বলব অপ্রত্যাশিত নাকি প্রত্যাশিত সাফল্য? শিল্প-বিপ্লবের আগের লন্ডনের চেয়ে আমাদের ঢাকা শহর সমৃদ্ধশালী ছিল- এটা কি কার্ল মার্কসই ক্যাপিটালে বলে যাননি? এই শহরের মসলিনের কারিগররা যখন রপ্তানিমুখী পণ্য তৈরি করছেন, তার একশ বছর আগে-মধ্যযুগের শেষ ভাগে- এখানেই ভাটি অঞ্চলে কি সৃষ্টি হয়নি 'মৈমনসিংহ গীতিকা'? 'বঙ্গ-বৃত্তান্তে' অসীম রায় দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগের বাংলা সোনার বাংলা ছিল না হয়তো- বৈষম্য তখনও ছিল প্রবল- কিন্তু শহরে ও গ্রামে উচ্চতর সংস্কৃতির চর্চা ছিল। জাতিভেদ, বর্ণভেদ, ধর্মভেদ প্রভৃতির দেয়াল ছিল বিভেদের, সেই সঙ্গে ঐক্য-ভাবনাও ছিল। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতির সংগ্রামও ছিল এই পূর্ববঙ্গে। কৃষক-সমাজের ভেতরে থেকেই হিন্দু-মুসলমান পালাকার-লেখকেরা নানা কথা ও কাহিনি রচনা করেছেন- যার ক্ল্যাসিক বিবরণ মেলে দীনেশ চন্দ্র সেনের ও মুহম্মদ এনামুল হকের লেখায়। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ব্লুমহার্ড (ইষঁসযধৎফঃ)-এর 'ক্যাটালগ অব বেঙ্গলি প্রিন্টেড বুকস ইন দ্য লাইব্রেরি অব দ্য ব্রিটিশ মিউজিয়াম' বইয়ের ১২৬ পাতাজুড়ে অন্তর্ভুক্ত অসংখ্য রচনার লেখক হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের। আমার বলার কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের নানা পর্যায়ের মধ্যে প্রবহমান পূর্ব বাংলার 'সাংস্কৃতিক জগৎ' অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল পূর্বাপর। স্বশিক্ষিত লালন, হাছন রাজা, রাধারমণ বা অতি সাম্প্রতিকের শাহ আব্দুল করিম সংস্কৃতি, সমাজ ও পারিপার্শ্বের রাজনীতি-রাষ্ট্রকে তাদের সৃষ্টিতে ধারণ করেছিলেন। এক কথায়, মাথাপিছু আয়ের অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরে থেকেও গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজি ছিল অনেক উঁচুতে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্যান্য প্রদেশে (যেমন বিহার, উড়িষ্যা বা আসামে) এ রকমটা ছিল না, আর উত্তর ভারতের সংস্কৃতি ছিল মূলত শহর-নির্ভর।
এতসব বলছি কেন? আমাকে যখন কোনো প্রথাগত বিদেশি বিশ্নেষকেরা জিজ্ঞেস করেন যে, স্কুলভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মেয়েদের এত অভাবনীয় সাফল্যের পেছনের রহস্য কী, তখন আমি না বলে পারি না মধ্যযুগের গ্রাম-বাংলার মহুয়া-বেহুলার কথা, মনে পড়ে আলাওলের পদ্মাবতী এবং আমি স্মরণ করিয়ে দিই- 'ভুলে যাবেন না এ দেশেই হয়েছে জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, আর বেগম রোকেয়ার সময়ের চেয়ে অগ্রসর রচনা 'সুলতানার স্বপ্ন'। বঙ্কিমচন্দ্র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্বময়ী নায়িকাদের কথাও আমাদের মনে পড়ে। একইভাবে ভুলে যাই না রবীন্দ্রনাথের জীবনের, গল্পগুচ্ছের, চিঠিপত্রের ও উপন্যাসের নারী-চরিত্রদের। যারা অর্থনীতির ওপরে সংস্কৃতির দীর্ঘ অনুরণন এতটুকু হলেও স্বীকার করেন, তারাই স্বীকার করবেন যে এই অঞ্চলে, এই বাংলাদেশে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে ও কর্মক্ষেত্রে নারীর উত্তরোত্তর ক্ষমতায়ন মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। যারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের সাংস্কৃতিক পটভূমির দীর্ঘ ক্রিয়াশীলতা সম্পর্কে অনবগত তাদেরকেই কপালকুণ্ডলার সামনে দাঁড় করিয়ে শোনানো দরকার ছিল- 'পথিক, তুমি পথ হারাইছ?' আমার বিশ্বাস পথ হারিয়ে ফেলা পথিক একজন বিদেশি কনসালট্যান্ট অর্থনীতিবিদ ছিলেন। মোদ্দা কথা, বাংলাদেশের উন্নয়ন-বিস্ময়ের পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে পূর্ব বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য- যেটি নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এবং যা আখেরে জেন্ডার-সংবেদনশীল স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি ভূমিকা রেখেছে পরোক্ষভাবে হলেও- সহায়ক সামাজিক মূল্যবোধ (সোশ্যাল নর্ম) তৈরির মাধ্যমে। আর মূল্যবোধ বা বোধ কখনো পাঁচসালা পরিকল্পনা ধরে সৃষ্টি হয় না। এর জন্য দরকার- ইতিহাস।
৩. মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক ভূমিকা
সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ ইতিহাস নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়ক সামাজিক মূল্যবোধের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এটি একমাত্র ইতিহাসগত ফ্যাক্টর নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন-বিস্ময় সৃষ্টিতে ১৯৪৭ থেকে শুরু হওয়া জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালের উদারনৈতিক ও সমতাবাদী আকাঙ্ক্ষার সংবিধান একটি সুদূরপ্রসারী পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিল। এ ক্ষেত্রে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার অর্থনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়নের কাঠামোগত রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল যাত্রার শুরুতেই। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা বা 'আইডিয়ার' ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিকালে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি বড় পাওয়া ছিল উন্নয়নের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি নিয়ে আগোগোড়া স্বচ্ছ ধারণার। বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা, শ্রম অনুযায়ী বণ্টন-নীতি, ত্রিবিধ (রাষ্ট্রীয়, ব্যক্তি ও সমবায়) মালিকানার স্বীকৃতি, নারী-পুরুষকে সমান অধিকার, সবার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকার, যারা পেছনে পড়ে থাকল তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা এবং ক্রমান্বয়ে একটি সুষম আয় ও সম্পদ বণ্টনের সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল সেই দর্শনে ও সংবিধানে। যার নিকটতম তুলনা পাই আজকের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলসের (এসডিজি) ঘোষণায়।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু 'আইডিয়া' দিয়েই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যকে প্রভাবিত করেনি। চার দফা বা চার মূল স্তম্ভ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল বাঙালির চিন্তাজগতে। আর কোনো দেশের সংবিধানের ঘোষণা অংশে (প্রিয়েম্বল) এত স্পষ্ট করে লেখা হয়নি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ তথা সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানের কথা। সেখানে যা বলা ছিল এ নিয়ে আমি 'কালের খেয়া'তে বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে কিছুটা আলোচনা করেছি। তার পরেও উন্নয়নের বিস্ময়ের রহস্য সন্ধানে সেই আদর্শের মৌলিক দিকের প্রতি আরেকবার দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারছি না :
'আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।' অনেকে বলতে পারবেন, এ তো কেবল ইতিহাস আর সংবিধানের আদর্শের কথা। এর সঙ্গে বাংলাদেশের পরবর্তী অভাবনীয় অর্থনৈতিক সাফল্যের যোগসূত্র কোথায়?
সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র থেকে দেখা গেছে যে, যে সমস্ত এলাকায় বা দেশে কৃষক-সংগ্রামের বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে উদারনৈতিক সমতাধর্মী মতাদর্শ ও নীতিমালা সহজে গৃহীত হয়েছে। অভিজিৎ ব্যানার্জী, রবিন বার্জেস প্রমুখ দেখিয়েছেন যে, ভারতের যেসব এলাকায় রায়তের পক্ষে কৃষি আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেসব এলাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অধিকতর গরিববান্ধব হয়েছে, ভূমিসংস্কার বা বর্গাচাষিদের সপক্ষে আইন ফলপ্রসূভাবে গৃহীত হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে আন্না দুরাইয়ের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা-ই দীর্ঘমেয়াদে ডিএমকে এবং এআইডিএমকের দ্রাবিড় ভাষাভাষী অন্ত্যজ শ্রেণির আন্দোলন ও সংগঠনকে উস্কে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে তামিলনাড়ূ, অল্প্রব্দপ্রদেশ ও কর্ণাটক রাজ্যের দরিদ্রবান্ধব সামাজিক সূচকসমূহকে সহায়ক ফ্যাক্টর হিসেবে প্রভাবিত করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে ও কেরালা রাজ্যে ভূমি সংস্কার ও বর্গা-স্বত্ব আইন কৃষক আন্দোলনের পূর্ব-ঐতিহ্য থাকার কারণেই বাস্তবায়ন করা সহজতর হয়েছিল। এর ফলে এ দুই রাজ্যে দারিদ্র্যের ভেতরে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত দ্রুত কমিয়ে আনা গিয়েছিল এবং অন্যান্য সামাজিক শিক্ষা-স্বাস্থ্য সূচকেও এর শুভ প্রভাব পড়েছিল। আমার যুক্তি হচ্ছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও শুভ প্রভাব পড়েছিল কৃষিবান্ধব, গ্রামমুখীন 'সবুজ বিপ্লব' ও গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের ওপরে এবং পরবর্তীতে প্রাথমিক শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে ও নারীর ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত করার পেছনে।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতিমালা ও লক্ষ্যকে প্রভাবিত করেছে তা-ই নয়। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি 'গর্বিত জাতীয়তাবাদের' জন্ম হয় যা দেশকে পরিচালিত করে বড় বড় সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সামাজিক নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তী সময়ে এনজিও প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে এবং মধ্যস্তর থেকে আগত বেসরকারি এক উদ্যোক্তা শ্রেণি কালক্রমে আত্মপ্রকাশ করে। যার দৃপ্ত পদচারণা দেখতে পাই রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাত থেকে নানা প্রকার 'অভ্যন্তরীণ চাহিদামুখীন' শিল্প, কৃষি ও সেবা খাতের বিকাশে। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া এত অসংখ্য এনজিওর সৃষ্টি হতো না বাংলাদেশে। এই কথাটা বিহারে এক সেমিনারে পনেরো বছর আগে বলেছিলাম আমি। সে সময় নীতিশ কুমার মন্ত্রিসভার অনেক অর্থনৈতিক পরামর্শক, উপদেষ্টা ও সরকারি আমলাবৃন্দ বিহারের তুলনামূলক দৈন্যদশার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সামাজিক খাতের নেতৃত্বের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের প্রচ্ছন্ন ভূমিকার কথা স্বীকার করেছিলেন। একই কথা বলেছিলাম ২০১১ সালে পাকিস্তান প্ল্যানিং কমিশনের আমন্ত্রণে বুরবান শহরে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে। মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা শুনে আমাকে পরবর্তী সময়ে এক বেলুচিস্তানের উচ্চ পর্যায়ের আমলা জানান যে, 'মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাসের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করেছে! এখন তার পক্ষে আরও অনেক বড় লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব।' বেলুচিস্তানের জন্য তাকে বিষণ্ণই মনে হয়েছিল সেদিন।
৪. একচক্ষু বিশ্নেষণের সমস্যা
উইলিয়ামস ফকনারের এক চরিত্র বলেছিল, 'দি পাস্ট ইজ নট ডেড; ইট'স নট ইভেন পাস্ট।' কিন্তু অতীতকে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়, একে পড়তে পারতে হবে দিব্যদৃষ্টি দিয়ে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই সেই 'তৃতীয় নয়ন' নেই। এমনকি কখনও কখনও বিচার-বিশ্নেষণের ক্ষেত্রে আমরা নিতান্তই একচোখা। এই কারণেই সত্তর আশির দশকের বড় ঘটনাগুলো আমরা শনাক্ত করতে পারিনি। অনেকেই মনে করেছেন যে, এ দেশে (আমি এদের 'কৃষি নৈরাশ্যবাদী' বা এগ্রারিয়ান পেসিমিজমের অনুসারী বলি) আমাদের দেশে জনসংখ্যার বিস্ম্ফোরণকে ঠেকানো যাবে না। কৃষির মান্ধাতা-আমলের 'উৎপাদন-সম্পর্ক' একে আধুনিকায়ন করতে দেবে না। ফলে খাদ্যে 'স্বয়ংসম্পূর্ণতার' লক্ষ্য কখনোই এ দেশে অর্জিত হওয়ার নয়। খুব অল্প জনই- মাহবুব হোসেন ও আবু আবদুল্লাহ ছিলেন ব্যতিক্রম- বুঝতে পেরেছিলেন যে, জনসংখ্যার চাপে দিশেহারা কৃষক-সমাজ নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর স্বার্থেই নতুন কৃষি-প্রযুক্তিকে আগ্রহে গ্রহণ করবে। আশির দশকে সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি এভাবেই সফলতা পেল বাংলাদেশের গ্রামগুলোয়; নব্বইয়ের দশকে নীরব বিপ্লব ঘটালো শ্যালো টিউবওয়েল; আর দুই হাজারের দশক থেকে শুরু হলো কৃষির দ্রুত হারে যান্ত্রিকীকরণ। হালের বলদের সংকট দূর হয়ে গেল পাওয়ার টিলারের আর ট্রাক্টরের চাকার তলে। এখন তো সুদূর কুড়িগ্রামে এবং সুনামগঞ্জের বা নেত্রকোনার হাওর এলাকায় দিব্যি নেমে যাচ্ছে যন্ত্রচালিত ধান কাটার ও মাড়াইয়ের যন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টার। জিরাতীরা (ভ্রাম্যমাণ কৃষি শ্রমিক) আসুক বা না আসুক হাওর এলাকায় ধান কাটতে যন্ত্র সভ্যতা চলে এসেছে গ্রামে গ্রামে। কৃষি মজুরদের মজুরি বেড়েছে, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি কমেছে, ঝগড়াপুর আর ঝগড়াপুর থাকছে না।
শুধু যে কৃষির ক্ষেত্রে অনেকেরই একচক্ষু বিশ্নেষণ ছিল তা-ই নয়, খুব কম অর্থনীতিবিদই এ দেশে বাঙালি শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণির গতিশীল বিকাশের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন আশি-নব্বইয়ের দশকে। এ দেশের বাঙালি উদ্যোক্তারা 'ফার্স্ট জেনারেশন বিজনেসম্যান'- এই তকমা দিয়ে এদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কার্যত নাকচ করা হয়েছিল। বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান নানা বিতর্কের মাঝে থাকেন, কিন্তু তিনি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে 'আজকের বাংলাদেশ' অনুষ্ঠানে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে একটি অর্থনৈতিক সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'স্বাধীনতার পরে আমরা প্রায় সবাই ছিলাম ফার্স্ট জেনারেশন বিজনেসম্যান। প্রথমে আমরা গেছি ট্রেডিংয়ের মধ্যে, সেখানে লাভ করে পুঁজি সঞ্চয় করে গিয়েছিলাম শিল্প খাতে পরবর্তী সময়ে।' মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিজম থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেই তবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটালিজমের দিকে যাত্রা সূচিত হয়। এটা ধ্রুপদি ক্যাপিটালিজম বিকাশের পথ। বাংলাদেশেও সেভাবেই উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে এটিও একটি বড় ফ্যাক্টর।
আমি জানি, অনেকেই এখন 'প্রাথমিক পুঁজি সঞ্চয়নের' কথা তুলবেন এবং স্মরণ করিয়ে দেবেন যে, সরকারি বিশেষায়িত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রদত্ত অনেক শিল্প ঋণের অর্থের আশি ভাগই সত্তর-আশির দশকে আর ব্যাংকের কাছে ফিরে আসেনি। এই সময়ই 'লুটেরা ধনিক' টার্মটির জন্ম হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যাকে তখন মনে হয়েছিল সর্বব্যাপী লুটপাটের উৎসব, সেই পরিস্থিতিতেই আমাদের অজ্ঞাতসারে কলকারখানামনস্ক একটি শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছিল কী গার্মেন্টস খাতে, কী অভ্যন্তরীণ চাহিদামুখীন শিল্পে। যারা 'ডিফল্ট' করেছিলেন, তারা ডিফল্ট করতে করতেই ইন্ডাস্ট্রি চালনা করা শিখছিলেন। ডানি রডরিক যাকে বলেছেন- 'ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ সেলফডিসকভারি' বলে। পরবর্তীতে ২০০০ বা ২০১০-র দশকে এরাই ব্যবসা-শিল্প খাতের বড় বিজনেস গ্রুপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন; এদের অনেকেরই বাৎসরিক টার্নওভার '২০০০ কোটি' টাকার ওপরে। এদের অনেকেই একই সঙ্গে অনেকগুলো খাতে বিচরণ করছেন, শিল্পের পাশাপাশি ব্যাংক-বীমা, নির্মাণ শিল্প, পত্রিকা-মিডিয়া কোম্পানির মালিক হয়েছেন। রপ্তানির পাশাপাশি সফল হয়েছেন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে। এদের অনেককেই আমরা 'করপোরেট সেক্টর' হিসেবেই দেখি। এটাও ধ্রুপদি ক্যাপিটালিজমের পথ- ছোট/মাঝারি পুঁজি থেকে ক্রমশ ঘনীভবন ও কেন্দ্রীভবনের মাধ্যমে বৃহৎ/অতি বৃহৎ পুঁজিতে রূপান্তরিত হওয়া। এদেরই নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিল্প খাত, অবকাঠামো খাত এবং রপ্তানি খাত অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করেছে। 'বাংলাদেশ বিস্ময়ের' পেছনে এটি একটি বড় ফ্যাক্টর।
গার্মেন্টস শিল্পের বিষয়ে একচক্ষু বিশ্নেষণের একটি উদাহরণ দেব। বাংলাদেশ এখন চীনের পরই বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহৎ পোশাক পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। এই গার্মেন্টস শিল্প যে জাগবে সত্তর দশকে কোনো অর্থনীতিবিদই আঁচ করতে পারেননি, আশির দশকে এর বিকাশ দেখেও এবং পথে-ঘাটে বস্ত্র-বালিকাদের চলতে-ফিরতে দেখেও অনেকেই একে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। যারা এর সাফল্য দেখেছেন, তারাও একে সাময়িক অর্জন বলেই ভেবেছেন এবং গার্মেন্টসের বিকাশকে মূলত মাল্টিফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট (এমএফএ)-এর 'এফেক্ট' হিসেবে দেখেছেন। ২০০৫ সালে 'কোটা পদ্ধতি' উঠে গেলে এই শিল্পে ধস নেমে আসবে- এ রকম সবজান্তা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন অনেকেই। কিন্তু অর্থশাস্ত্রেই 'লার্নিং বাই ডুইং' এবং 'লার্নিং বাই সিইং'-র কথা ব্যাখ্যা করা আছে। সেটি মনে রাখলে 'এগ্রারিয়ান পেসিমিজমের' মতো 'এক্সপোর্ট পেসিমিজমের' বিষণ্ণ করা প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা যেত বিচার-বিশ্নেষণকে এবং সেটা করা গেলে শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে-নারীর ক্ষমতায়নে-কৃষি উৎপাদনে-শিল্পে-রপ্তানি খাতে আজকের বাংলাদেশের সাফল্যকে তখন ততটা অভাবনীয়, ততটা অপ্রত্যাশিত বা ততটা বিস্ময়ের বলে নাও মনে হতে পারত।
লেখক
অর্থনীতিবিদ
প্রাবন্ধিক

বিষয় : বিস্ময়ের রহস্য সন্ধানে

মন্তব্য করুন