সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যায় 'নদী আন্দোলন' নিয়ে লিখতে গিয়ে একটি বিষয় চকিতে মাথায় খেলে গেল! মাত্র কয়েক বছর আগেও এ ধরনের আয়োজনে সাধারণত 'পরিবেশ আন্দোলন' বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। নদী নিশ্চয়ই বৈশ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এভাবে আলাদা করে ভাবার বিষয়টি যে সাম্প্রতিক সংযোজন, স্বীকার করতে হবে।
অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতকের ইতিহাস যদি দেখি, আন্দোলন হিসেবে সামগ্রিক পরিবেশের চেয়ে নদী অনেক পুরোনো বিষয়। সেই ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময়ই নদী উঠে এসেছিল জনপ্রিয় স্লোগান হিসেবে- 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা'। অবশ্য সেই স্লোগান ছিল রূপক অর্থে। আমাদের সভ্যতা, সমাজ, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা- সবই ছিল নদীনির্ভর। নদীর এই সর্বব্যাপ্ত ভূমিকারই স্বীকৃতি ছিল স্লোগানের নদীর রূপায়ণ। যদিও তার মাত্র বছর দুয়েকের মাথায় মুক্তিযুদ্ধের সময় এই রূপক অর্থই প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে ফলাফল নির্ধারণী ভূমিকা রেখেছিল নদী। বর্ষায় টইটম্বুর নদী যেমন আশৈশব নদীর সঙ্গে বেড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল, তেমনই নদীবিচ্ছিন্ন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য হয়ে উঠেছিল অভিশাপ। সেদিক থেকে বলা চলে, বাংলাদেশে নদী সুরক্ষা আন্দোলনের সূত্রধর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম।
বৈশ্বিকভাবে আমরা দেখি, পরিবেশ আন্দোলন সূচিত হয়েছে পরিবেশ সাংবাদিকতার পথ ধরে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেদিক থেকে আমাদের সংবাদপত্রে নদী মনোযোগ পাওয়া শুরু করে সত্তর দশকের শেষ ভাগে। মূলত গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে। তবে সেটা কূটনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে। আশির দশকে এসে নদীভাঙন-সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন বিশেষ মাত্রা পেতে থাকে। সেটাও দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে। আর ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর থেকে নদী ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিষয় যেমন বন্যা, বাঁধ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সংবাদপত্রে উঠে আসতে শুরু করে।
প্রসঙ্গত, নব্বইয়ের দশকের আগে নদীতে দখল প্রকট হয়ে ওঠেনি। দূষণ থাকলেও তা ছিল সংবাদমাধ্যমের নজরদারির বাইরে। নদী ঘিরে সংকট যত বেড়েছে, সংবাদমাধ্যমে এই ইস্যুর উপস্থিতি তত গাঢ় হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন বহু দিন পর্যন্ত ছিল আলোকপাতের বাইরে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে উপজীব্য হতে থাকে নাব্য সংকট, পানি বণ্টন, দখল, দূষণ, বাঁধ, পর্যটন, ভাঙন প্রভৃতি নদীকেন্দ্রিক বিষয়। এসব নিয়ে সংবাদের পাশাপাশি বিশ্নেষণ, কলাম, সাক্ষাৎকার যুক্ত হয়েছে আরও পরে, একুশ শতকের গোড়ায়। সেদিক থেকে দেখলে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় নদীবিষয়ক সাংবাদিকতার ধারা শুরু হয়েছিল।
নদী রক্ষায় নাগরিক উদ্যোগও সূচিত হতে থাকে নব্বই দশক থেকে। বলাবাহুল্য, সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের অংশ হিসেবে। এর একটি 'পরশ' বা পরিবেশ রক্ষার শপথ নামে একটি নাগরিক জোট। নব্বই দশকের মাঝামাঝি গঠিত হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি তথা 'বেলা'। আবার নব্বই দশকের একেবারে শেষ ভাগে গঠিত হয় 'বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন'। পরবর্তী সময়ে বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনে জড়িত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা গঠন করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বা 'বাপা'।
একুশ শতকের গোড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা গঠন করেছিলাম 'রিভার লাভিং পিপল'। পরবর্তীকালে সেটা পুনর্গঠিত হয় 'রিভারাইন পিপল' হিসেবে। আর দশটা পরিবেশবাদী উদ্যোগের সঙ্গে এর পার্থক্য ছিল যে- এটা শুধুই নদী নিয়ে কাজ করবে। কোনো একটি বিশেষ নদী নয়; সারাদেশের নদ-নদী। শুরুতে ব্যক্তিগত ও বৈঠকি আলাপে এই প্রশ্ন বিরল ছিল না যে, নদী কেন? কেন পাহাড় নয়, কেন বন নয়, কেন কৃষি নয়, কেন জীববৈচিত্র্য নয়; কেনই বা সার্বিক অর্থে পরিবেশ নয়? কেন শুধুই 'রিভারাইন পিপল'? নিজস্ব পাঠ ও পর্যবেক্ষণের ওপর ভরসা করে তখন আমরা বলেছিলাম, বাংলাদেশে নদী বাঁচলেই পরিবেশ বাঁচবে। বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলনের মিছিল যদি দৃঢ় করতে হয়, তাহলে প্রথম পদচিহ্ন এঁকে দিতে হবে নদীতীর ও বুকের নরম পলিমাটিতে। কারণ ব-দ্বীপে নদী মানেই পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার মূলসূত্র।
বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলন করতে গিয়ে মনে রাখা জরুরি- বদ্বীপে নদী ভালো থাকলে বন ভালো থাকে; নদী ভালো থাকলে কৃষি ভালো থাকে; নদী ভালো থাকলে হাওর বা বিল ভালো থাকে। নদী ভালো থাকা মানে মৎস্যসম্পদ, সেচ, সুপেয় পানি, নৌ-যোগাযোগ, নগর ভালো থাকা। আমরা বলেছিলাম, বাংলাদেশে নদীকে নমস্য মানলেই কেবল পাহাড়, সমতল, বন, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, যোগাযোগ, প্রকৃতি সতেজ থাকবে, সবুজ আরও 'গাঢ় সবুজ' হবে। নদীকে নমস্য মানলেই কেবল পরিবেশ আন্দোলন, কৃষি আন্দোলন, বন-পাহাড়-জীববৈচিত্র্যের আন্দোলন সাফল্য পেতে পারে।
গত এক দশকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ক্রমেই পরিবেশ আন্দোলনের মূল অভিমুখ হয়ে উঠছে নদী। বিদ্যমান পরিবেশ আন্দোলনগুলো যেমন নদীর প্রশ্নে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, তেমনই গড়ে উঠছে নতুন নতুন নদী আন্দোলন। কেবল ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। নদী বিষয়ে জনসাধারণ এখন কেবল সচেতন নয়, সোচ্চারও। তারা সংগঠিত হচ্ছে। ২০০০ সালে হয়তো একটি বা দুটি সংগঠন নদী নিয়ে কাজ করত। এখন সারাদেশে শতাধিক সংগঠন পাওয়া যাবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যাবে, নদী নিয়ে 'পোস্ট' আগের তুলনায় বহুগুণে বেড়েছে। মানুষ আগের তুলনায় বেশি নদী দেখতে যাচ্ছে। আগে পর্যটন গন্তব্য মানেই প্রায় অবধারিতভাবে সমুদ্র বা পাহাড়। এখন নদীও হয়ে উঠেছে পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্র। মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও নদীবিষয়ক প্রতিবেদন, বিশ্নেষণ, টকশো বেড়েছে।
নদী নিয়ে নাগরিকরা আগের তুলনায় বেশি সোচ্চার হওয়ার কারণে সরকারি পর্যায়েও নদী রক্ষায় উদ্যোগ ও তৎপরতা বেড়েছে। নতুন নতুন আইন ও প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। গত দুই আড়াই দশকে বেশ কয়েকটি আইন ও নীতি হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আইন, পানিনীতি, জলাধার সংরক্ষণ আইন, পানি আইন, নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রভৃতি। সম্প্রতি নদীবিষয়ক টাস্কফোর্স, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। আগে থেকেই ছিল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় প্রভৃতি। মোট কথা নদী রক্ষায় সরকারের নীতিগত, আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বেড়েছে। আমাদের উচ্চ আদালতও নদী রক্ষায় যেমন সংবেদনশীল, তেমন আর কোনো দেশে দেখা যায় না। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু যুগান্তকারী কিছু রায় ও নির্দেশনা এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। নদ-নদীকে জীবন্তসত্তা ঘোষণা করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ব্যক্তিগতভাবে নদী রক্ষায় যথেষ্ট উদ্যোগী।
শ্নাঘার সঙ্গে বলা যায়, দেশের নদী আন্দোলন এখন 'মোমেন্টাম' পার করছে। বাংলায় বললে, এখন সময় নদী আন্দোলনের। প্রশ্ন হচ্ছে, এই 'মোমেন্টাম' লইয়া আমরা কী করিব? দখল, দূষণ, নির্বিচার বালু উত্তোলন যদি চলতেই থাকে; নদীতে প্রবাহ স্বল্পতা এবং ভাঙন যদি নিরসন না হয়; তাহলে লাভ কী? সাদা চোখেই দেখা যায়, নদীবিষয়ক উদ্যোগ ও নদী পরিস্থিতির অবনমন যেন সমানুপাতিক হারে বাড়ছে।
প্রশ্ন হতে পারে, এই পরিস্থিতিতে নদ-নদীর পরিস্থিতি উন্নয়নে নাগরিকদের তাহলে করণীয় কী? দেশের কেন্দ্রে ও প্রান্তে এত আন্দোলন সত্ত্বেও নদীগুলোর পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়ার জন্য সরকার ও কর্তৃপক্ষের কাঁধে দায় চাপানো যেতেই পারে। এটা যেমন সত্য, তেমনই সহজ। কিন্তু বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে নাগরিক আন্দোলনকারীর পার্থক্য হচ্ছে, তিনি বা তারা কেবল 'সত্য' উচ্চারণ করেই থেমে যাবেন না। আদর্শ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নিরন্তর ও নিরলস কাজ করে যাবেন। যদি 'ডাক শুনে কেউ না আসে' তবে একলা চলতে হবে।
এক্ষেত্রে দেশের নদী রক্ষায় সক্রিয় আন্দোলনগুলোর জন্য চারটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। প্রথমত, জ্ঞানভিত্তিক নদী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শুধু 'আওয়াজ তোলা' দিয়ে এখন আর চলবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে শহরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি প্রয়োজন ছিল। এভাবে নাগরিক ও সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেছে। কিন্তু একই ধরনের কর্মসূচি আর কতদিন? নাগরিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে খুব জনপ্রিয় একটি শব্দ হচ্ছে 'সচেতনতা বৃদ্ধি'। আমি প্রায়ই বলে থাকি যে, দেশের মানুষ নদী নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। তারা জানে নদীর দখল-দূষণ খারাপ। তারা চোখের সামনে দেখছে নদী না থাকলে কী হয়। এখন আসলে তথ্য, যুক্তি, উপাত্ত দিয়ে নদী দখল বা দূষণকারীদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এখন মানুষকে সংগঠিত করতে হবে, যুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে। যাতে করে মানুষ বুঝতে পারে যে, নদী সুরক্ষার বিষয়টি যেমন সামষ্টিক, তেমনই ব্যক্তিগতভাবে সবার জন্য জরুরি। সেটা কীভাবে সম্ভব? পরের অনুচ্ছেদে বলছি। দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে নদ-নদীর অর্থনৈতিক মূল্য ফিরিয়ে আনতে হবে। এর বিকল্প নেই। অন্যথায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ব্যক্তিগতভাবে নদীর প্রতি দায়বদ্ধ করা যাবে না। বিদ্যমান নদী আন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, নদী হারিয়ে যাওয়ার আর্থিক ক্ষতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারা। কিংবা নদী উদ্ধার হলে এর আর্থিক লাভ হাতে-কলমে দেখাতে না পারা। দখল, দূষণ, ভরাট, প্রবাহ স্বল্পতা, এর কারণ, বিরূপ প্রভাব নিয়ে আলোচনা, প্রতিবেদন, সমীক্ষা অনেক দেখা যাবে। কিন্তু এসবের ফলে আমরা আর্থিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, এ ব্যাপারে একাডেমিক কাজ কম। তুলনা করলে দেখা যাবে, আমাদের অর্থনীতিবিদরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কতটা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কতটা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, প্রায়ই হিসেব করেন ও তুলে ধরেন। হরতাল-ধর্মঘটের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিরও আর্থিক ক্ষতির হিসাবও পাওয়া যাবে। কিন্তু নদীবিরোধী তৎপরতার কোনো আর্থিক ক্ষতির হিসাব নেই। আমাদের অর্থনীতিতে নদীর অবদান কতখানি, জিডিপির কত শতাংশ, সেই হিসাবও কি আছে? তৃতীয়ত, নদী সুরক্ষা আন্দোলনগুলোকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে অনেক সামাজিক আন্দোলন প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দিয়েও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি প্রকল্প ও অর্থায়ন নির্ভরতার কারণে। বরং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে আন্দোলনের ক্ষেত্রে সমাজের যে অন্তর্গত শক্তি ছিল; যে স্বেচ্ছাসেবী মানসিকতা ছিল; ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর যে অঙ্গীকার ছিল; আর্থিক সহায়তা নির্ভর আন্দোলন ও কর্মসূচির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তা ফিকে হয়ে গেছে। স্বল্পমাত্রায় হলেও নদী সুরক্ষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এই সর্বনাশা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে আসতে হবে। চতুর্থত, নদী আন্দোলনে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকায় সত্তর-আশির দশকে মূলত কর্মজীবনে অবসরপ্রাপ্তদের 'সামাজিক কর্তব্য' হিসেবে পরিবেশ আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশেও নব্বইয়ের দশকে পরিবেশ আন্দোলন সূচিত হয়েছিল মূলত প্রৌঢ় বা প্রবীণ নাগরিকদের হাত ধরে। এখানেও গত এক দশকে তরুণদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই অংশগ্রহণ যেন নিছক 'হবি' না হয়ে দাঁড়ায়। তরুণদের নদীর প্রশ্নে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে 'দায়িত্বশীল' করে তোলা জরুরি। বস্তুত নদী বা বৃহত্তর অর্থে পরিবেশ আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে আরও আগেই চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল। সেই ২০০৩ সালে জাতিসংঘ প্রণীত 'ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ রিপোর্ট' প্রথমবারের মতো পরিবেশ ও তারুণ্যের প্রশ্নটি স্বতন্ত্রভাবে সামনে আনে। সেখানে দেখানো হয়েছিল, তরুণদের যুক্ত করা কেন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবেশবিনাশী তৎপরতার চূড়ান্ত দুর্ভোগ পোহাতে হবে আজকের তরুণ তথা আগামী দিনের পরিণত মানুষদের। আজকে নদীদূষণ আগামীর নাগরিকদেরই জীবন আরও বেশি করে বিষিয়ে তুলবে। তরুণরা তথ্যসমৃদ্ধও; কারণ পরিবেশ বিনাশের ফলে আগের প্রজন্ম কী কুফল ভোগ করেছে, সেই উদাহরণ তাদের সামনে থাকে। আর তরুণদের 'উদ্ভাবনী' ক্ষমতাই পারে নদী সুরক্ষায় 'বৃত্তের বাইরে' সমাধান খুঁজতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নদী আন্দোলনে তরুণদের সম্পৃক্ততা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের তরুণরা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে; স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে; গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে নেত্বত্ব দিয়েছে; অতি সম্প্রতি গণজাগরণ মঞ্চ কিংবা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নদী সুরক্ষার আন্দোলনের নেতৃত্বও তাদের জন্য অধীর অপেক্ষায়। এক নিদারুণ সময়ে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে ডাকছে।
লেখক
সাংবাদিক ও গবেষক
মহাসচিব, রিভারাইন পিপল

বিষয় : নদী আন্দোলন

মন্তব্য করুন