ডিজিটাল কমার্স নিয়ে ইদানীং নানা ধরনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। গত দেড় বছরে অতিমারির সময়ে অনলাইনে কেনাকাটা অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও আমরা এ বিষয়ে খুবই উৎসাহিত বোধ করছিলাম। এর প্রধান কারণ হলো, ভোক্তার কেনাকাটার অভ্যাসকে ডিজিটাল করার জন্য যে বেগ পেতে হচ্ছিল অনলাইন বিক্রেতাদের, তা অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল অতিমারির লকডাউন। দোকানপাট-হাটবাজার বন্ধ থাকায় ক্রেতারা মোটামুটি বাধ্য হয়েই অনলাইনে দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। ফলে কাস্টমার অ্যাকুজিশন বেড়ে গিয়েছিল বেশ তাড়াতাড়ি। তাই এই খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য কভিড শাপে বর হয়েছিল বললে অত্যুক্তি হবে না।
কিন্তু অতি সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অনলাইন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে কিছু ব্যবসায়ীর গ্রেপ্তারের ঘটনায় ডিজিটাল কমার্স নিয়ে যে একটা উৎসাহ ও সম্ভাবনার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে অনেকটাই ভাটা পড়ে যায়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ডিজিটাল কমার্সের অপ্রত্যক্ষ হওয়ার সুযোগকে অপব্যবহার করে এই অনিয়ম এবং প্রতারণার আশ্রয় নেয়।
অপ্রত্যক্ষ কেনাবেচার চল বহু বছর আগে থেকেই আমাদের দেশে ছিল; ডিজিটাল যুগ শুরু হওয়ার আগে ক্যাটালগ দেখে বা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করে মনি-অর্ডারের বিনিময়ে বা ভিপিপি পার্সেলে আমরা কেনাকাটা করে এসেছি বহুকাল। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইন ওয়েবসাইটে বা সামাজিক মাধ্যমে কেনাবেচাকে আমরা এখন ইলেকট্রনিক কমার্স বা আরও ব্যাপক অর্থে ডিজিটাল কমার্স বলে থাকি। কিন্তু এই ডিজিটাল কমার্সের পরিধি আরও অনেক বড়। শুধু পণ্য বিক্রয়কে ডিজিটাল কমার্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশের বদৌলতে সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবাও অনলাইনে টাকার বিনিময়ে এখন গ্রহণ করা সম্ভব। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টাকা-পয়সা লেনদেন বা ব্যাংকিং, ইন-অ্যাপ ক্রয় ইত্যাদিও ডিজিটাল কমার্সের আওতায় পড়ে। কমার্স শব্দটিও বেশ ব্যাপক। ডিজিটাল বাণিজ্যে ব্যবহূত নানান কৌশল, বিপণনকার্য ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও এখন ডিজিটাল কমার্সের অধিক্ষেত্র। আসলে ই-কমার্স বা ডিজিটাল কমার্স বলে আলাদা কোনো ব্যবসা খাত নেই। ডিজিটালাইজেশনের ফলে সব ব্যবসায়ই এখন ডিজিটাল কমার্স। চিরাচরিত দোকান বা বাজারগুলোরও এখন একটা ডিজিটাল উপস্থিতি বা শাখা রয়েছে। তাই, শুধু বিশেষ কিছু বিক্রয় প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল কমার্সের আওতায় রাখাটা ভুল হবে এবং সে কারণে যেসব নীতিমালা বা আইন করা হচ্ছে, সেগুলো পুরো ডিজিটাল কমার্স জগতের ব্যাপ্তি মাথায় রেখেই করা উচিত।
দেখা যাক, কী কী ধরনের অনিয়ম ইদানীং অনলাইন ব্যবসায়ে দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি পাওয়া যায়, তাহলো ওয়েবসাইটে বা সামাজিক মাধ্যমে যে পণ্যটি দেখানো হয়েছে, সেটি গ্রাহক পাচ্ছে না। প্রায়শই দেখা যায়, যে পণ্যটির জন্য গ্রাহক টাকা পরিশোধ করেছে বা করবে বলে অঙ্গীকার করেছে, হাতে পাওয়া পণ্যটির সঙ্গে তার মিল নেই। কখনও বা নিম্নমানের জিনিস পাঠানো হয়েছে, অথবা নকল পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। কিছু সময়ে অসম্পূর্ণ বা আংশিক পণ্যও দেওয়া হয়ে থাকে। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি না দেওয়া আরেকটি বড় অভিযোগ এই অনলাইন বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে। ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হলে সময়মতো টাকা ফেরত না দেওয়া, টাকা কেটে রাখা, এমনকি একেবারেই ফেরত না দেওয়ার ঘটনাও আছে অনেক। দেশে প্রচলিত বিভিন্ন আইন অমান্য করে অনেক অনলাইন ব্যবসা চলছে। প্রায়ই দেখা যায়, বিএসটিআইর অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রি করে এ প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশনাগুলো অলঙ্ঘন করে অনেকে অতিরিক্ত অগ্রিম টাকা নিচ্ছে বা অননুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করছে, অথবা অনুমোদনহীন ভার্চুয়াল ওয়ালেট চালু করেছে। আবার অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ের বদলে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও টাকা নিচ্ছে কেউ কেউ। দেশের প্রতিযোগিতা আইন অমান্য করে নানা রকমের অস্বাভাবিক অফার দিচ্ছে বা অননুমোদিত লটারির ব্যবস্থা করছে কিছু প্রতিষ্ঠান। সর্বোপরি ডিজিটাল কমার্সের নামে নীতিবিগর্হিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং, পনজি স্কিম, জুয়া/বাজি এবং ঋণসেবা চালিয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান।
এসব অনিয়ম ও প্রতারণাকে মোকাবিলা করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই কিছুনীতি ও নির্দেশিকা জারি করেছে। এ ধরনের ব্যবসায়ে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেই এটি করা হয়েছে। এই নীতিমালা ও পরিচালনা নির্দেশিকা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলেই উপরোক্ত অভিযোগগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে ব্যবসায়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যেহেতু সব ব্যবসায় বা কমার্সেই এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব চলে এসেছে এবং ক্রমশ তা বিক্রয় ও বিপণনে আরও বেশি ভূমিকা রাখবে, সেহেতু ডিজিটাল কমার্স নাম দিয়ে একক কোনো খাতকে আলাদা করা সম্ভব নয়। তাই এ জন্য বিশেষ কোনো লাইসেন্স বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো প্রয়োজন নেই। বাস্তবিক ক্ষেত্রে তা সম্ভবপরও নয়। তার চেয়ে ডিজিটাল কমার্স মনিটরিং সেল তৈরি করে অনলাইনে কেনাবেচা কার্যক্রমকে পর্যবেক্ষণ করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজতর ও সুশৃঙ্খল হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের স্বার্থও সুরক্ষিত হবে। এই মনিটরিং সেলটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংক, এফবিসিসিআই, বেসিস ও ই-ক্যাবের প্রতিনিধি নিয়ে গঠন করলে অধিকতর কার্যকরী হবে। এই পর্যবেক্ষণ সেলের আওতায় একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকা দরকার, যারা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে দায়েরকৃত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে এই নিয়মিতভাবে অনালাইন বিক্রেতাদের ব্যবসার ধরন যাচাই করবে এবং নীতিমালাবহির্ভূত কাজের জন্য ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পরামর্শ দেবে।
এফ কমার্স বা 'ফেসবুক কমার্স' আমাদের দেশে বহুল জনপ্রিয়। কোনো সঠিক পরিসংখ্যান যদিও নেই তবুও অনুমান করা যায় যে এ ধরনের 'প্রতিষ্ঠান' বা ফেসবুক পেজের সংখ্যা প্রায় কয়েক হাজার। কেউ কেউ বলে থাকেন লাখের ওপরে রয়েছে ফেসবুক ভিত্তিক বিক্রেতা। শতকরা প্রায় ৫০% এফ কমার্স পেজের উদ্যোক্তা হলেন নারী। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক গৃহবধূ ঘরে বানানো আচার, হস্তশিল্প ইত্যাদি বিক্রয় করে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছেন এর মাধ্যমে। যদিও ট্রেড লাইসেন্সবিহীন এই এফ কমার্সের সুযোগ নিয়ে কিছু অসৎ লোক গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে। এ ধরনের অসততাকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে সরকার এদের নিবন্ধন নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন বর্তমানে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতোমধ্যেই ফেসবুকের সঙ্গে আলোচনা বলে পেজ বুস্টিংয়ের শর্ত হিসেবে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। ভোক্তা অধিকার রক্ষার্থে এফ কমার্স উদ্যোগগুলোর এক ধরনের নিবন্ধনের প্রয়োজন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আবশ্যিক শর্তাবলি যাতে সৎ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত না করে, সেদিকে খেয়াল রাখাটা জরুরি।
প্রযুক্তির এই যুগে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ধরনের ব্যবসা তৈরি হচ্ছে। তাই একটি গবেষণা ও উন্নয়ন সেল গঠন করে নতুন ধরনের ব্যবসাগুলোতে গ্রাহকসেবা যাতে অবিরত রাখা যায় ও সেবার মান উন্নয়ন করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সব অনলাইন বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক রেটিংয়ের ব্যবস্থা রাখলে ভোক্তার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে এবং গ্রাহকরা সেই প্রতিষ্ঠানের রেটিং বা সুনামের ভিত্তিতে পণ্য অর্ডার করতে পারবে। এই রেটিং বাধ্যতামূলকভাবে সব অনলাইন বিক্রয় প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবসার প্রসার ঘটানো এখন একটি আবশ্যিক বিষয়। সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার গ্রাহকসেবাও নিশ্চিত করতে পারে। তাই অনলাইনে পণ্য ও পরিষেবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। এ বিষয়ে প্রযুক্তিগত সব ধরনের সহযোগিতার জন্য দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যথেষ্ট সক্ষম ও পারদর্শী।

লেখক
সভাপতি, বেসিস পরিচালক, এফবিসিসিআই