আমাদের বাঙালি জাতির মৌলিক ও আদি ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলতে গেলে এক সময়ে এখানে 'ঢাকাই মসলিন' নামে যে সূক্ষ্ণ পাতলা সুতি কাপড় তৈরি হতো সে বিষয়টি নিঃসন্দেহে অগ্রাধিকার পাবে। এই কুঠির শিল্পের শৈলী এবং নান্দনিকতা নিয়েও নানা কিংবদন্তির অন্ত নেই। ইতিহাসবিদগণের তথ্য-উপাত্ত থেকে যা পাওয়া যায়, ঢাকার মসলিন শিল্পের বয়স চারশ বছরের বেশি। মসলিন, মোগল সম্রাটদের আমল এবং রাজধানী ঢাকার গোড়াপত্তন সমসাময়িক বলা যায়। 'মসলিন' শব্দের উৎস বা উৎপত্তি নিয়ে ব্রিটিশ শাসকগণ বা ইউরোপীয়দেরও মতদ্বৈততা রয়েছে। তবে এটি সত্যি যে, পুরাকালে ঢাকা এবং ঢাকার আশেপাশে উৎকৃষ্ট ধরনের তুলা থেকে সূক্ষ্ণ সুতি বস্ত্র তৈরি হতো। অনেক গবেষক মনে করেন, ইরাকের 'মসুল' এলাকাতেও এ ধরনের সুতি কাপড় পাওয়া যেত এবং এ 'মসুল' শব্দ থেকেই মসলিন শব্দের উৎপত্তি। বলা হয়ে থাকে, মোগল সম্রাট নূরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সময় অর্থাৎ ১৬১০ সালের আগে মসলিনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বিস্ময়কর হলো, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গের বা পূর্ব বঙ্গের সূক্ষ্ণ সুতি বস্ত্রের কথা উল্লেখ আছে। এমনকি ঢাকার মিহি ও উন্নত সুতি বস্ত্রশিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা, পঞ্চদশ শতকের চীনা লেখকগণ এবং ইউরোপীয় বণিকগণ।
২.
মে ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আবদুল করিম তার 'ঢাকাই মসলিন' বইয়ে জেমস্‌ টেলর এর A Sketch of the Topography and Statistics of Dhaka বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ঢাকা জেলার তাঁত শিল্প ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে জেমস্‌ টেলর নিজের চোখে দেখেছেন। তার মতে, ঢাকা জেলার প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি তাঁতের কাজ চলত কিন্তু উৎকৃষ্ট ধরনের মসলিন তৈরির জন্য কয়েকটি স্থান বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ ছিল। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা, সোনারগাঁ, ধামরাই, তিতাবাদি কাপাসিয়া, জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুর। তার বর্ণনায় ধামরাইয়ে সে আমলে ৪০০ ঘর তাঁতি পরিবার বসবাস করত। তিতাবাদি কাপাসিয়া উপজেলার অন্তর্গত শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এখানে উৎকৃষ্ট ধরনের ফুটি কার্পাস জন্মাত এবং মোলায়েম ও সূক্ষ্ণ মসলিন তৈরি হতো। তখন টেলর সাহেব নিজের চোখে তিতাবাদিতে ২০০ ঘর তাঁতি পরিবার দেখেছিলেন। ফুটি কার্পাস তুলা থেকেই উন্নত মানের মিহি মসলিন কাপড় তৈরি হয়ে থাকে। বলা বাহুল্য, ফুটি কার্পাস তুলা ঢাকার আশেপাশে বা শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী এলাকায় জন্মাত; পৃথিবীর অন্য কোথাও গুণগত বা এমন মানসম্পন্ন তুলা দেখা যায় না। এদিক থেকে বিচার করলে এটি সৃষ্টির এক রহস্যময় নিয়ামত; যা শুধু এ বাংলার মাটিতেই জন্ম নেয়। কাজেই উন্নততর মসলিন মানে বাংলার সম্পদ, বাংলার ইতিহাস এবং বাংলার তরুণ-তরুণীদের জেলি লাগানো আঙুলের স্পর্শ।
৩.
এসব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া সোনালি ঐতিহ্য বিশ্বখ্যাত 'ঢাকাই মসলিন' পুনরুদ্ধারে সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় প্রবল উৎসাহ ও উদ্যোগ গ্রহণ করে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে মন্ত্রণালয়ে পরিদর্শনে এসে বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে আমাদের হারানো গৌরব মসলিন শিল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই থেকে মসলিন উদ্ধারে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের অধীন একটি ছোট্ট প্রকল্প হাতে নিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে ১০ সদস্যের কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কমিটি মসলিন কাপড় সংগ্রহের নিমিত্তে দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করেন। একপর্যায়ে কমিটির সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে লন্ডনে গিয়ে ভিক্টোরিয়া আলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ঢাকাই মসলিনের এক টুকরো কাপড় সংগ্রহ করেন। সেই কাপড় থেকে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এর তুলা ও সুতার ধরনের অনুসন্ধান চালান। তারা সুতার মে. কা. পরিমাপের ব্যবস্থা নেন। এতে দেখা যায়, সংগৃহীত মসলিনের সুতার সূক্ষ্ণতার পরিমাণ প্রায় ৬৫০ মে. কা.; যা বর্তমানে দেশে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ মে. কা. এ নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ আলবার্ট মিউজিয়ামে রক্ষিত মসলিনের চেয়েও সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ। শুধু তাই নয়, আমাদের বিশেষজ্ঞ দলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত জঙ্গলে গিয়ে তারা ফুটি কার্পাসের চাষ ও আসল কার্পাস গাছ আবিস্কার করতে সক্ষম হন। যেখানে স্থানীয় কার্পাস চাষিরা জানেন না এর তুলা থেকে মসলিন কাপড় হয়। তারা জানান, তারা কেবল বালিশের জন্য এ তুলা চাষ করে থাকেন। অথচ এ এক মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ।
৪.
অধ্যাপক আবদুল করিমের গবেষণামূলক বই 'ঢাকাই মসলিন' মতে, ১৮৭১ সালের পরে বঙ্গে বা পূর্ব বাংলায় মসলিনের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশ বেনিয়ারা নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করে দেশীয় মসলিন শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়। তখন তারা তুলা, সুতা, রং,মজুরি ইত্যাদির ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে করারোপ করে যাতে পেশাদার নিপুণ কারিগররা হতাশ এবং নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। এখানে উল্লেখ করা যায়, যে ধরনের কার্পাস তুলা থেকে উন্নত মানের মিহি ও সূক্ষ্ণ সুতি মসলিন কাপড় তৈরির শিল্প গড়ে উঠেছিল তা মূলত ঢাকার বা বর্তমানের নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতীরবর্তী জনপদ।
অধ্যাপক আবদুল করিমের মতে, 'যে কোনো বস্ত্র বয়নের তিনটি স্তর রয়েছে- কার্পাস সংগ্রহ, সুতা কাটা এবং কাপড় বয়ন। ঢাকাই মসলিনের বৈশিষ্ট্য ছিল, কার্পাস উৎপাদন থেকে আরম্ভ করে কাপড় তৈরি হওয়া পর্যন্ত ঢাকা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, বিদেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। ঢাকার মাটিতেই কার্পাস জন্মাত ঢাকার তাঁতিরাই সুতা কাটত এবং বস্ত্র বয়ন করত।' এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকাই কার্পাস তুলার আদি ও অকৃত্রিম উৎস।
৫.
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে আমার যোগদান অনেকটা আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে প্রায় সাড়ে ৯ মাস জাতির ক্রান্তিকালে নিরলস ও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি থেকে দায়িত্ব পালন করে নিজে করোনাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকাবস্থায় আমার এমন বদলি। সবকিছুই নিয়তি (predestined) মেনে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করি। কাজকর্ম বুঝে উঠতে উঠতে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে মসলিন পুনরুদ্ধারবিষয়ক তাঁত বোর্ডের ছোট এ প্রকল্প। ভাবছিলাম, কয়েক মাসের চাকরির অবশিষ্টাংশে বড় কিছু শুরু করলেও এর সমাপ্তি পাব না। প্রকল্পের আদ্যান্ত জানলাম। মাত্র ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প এটি। ইতোমধ্যে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অব্যয়িত ৫ কোটি টাকা হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন এবং প্রশাসনিক অনুশাসন বাস্তবায়নে দৃঢ় উদ্যোগ নিই। মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর (বীরপ্রতীক) সঙ্গে পরামর্শ করে ডেমরা এলাকায় বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) পরিত্যক্ত জায়গার সন্ধান পাই।
৬.
জুন ২০২০-এ নারায়ণগঞ্জ জেলার তারাব পৌরসভার আওতায় শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর সংযোগস্থলে অসাধারণ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশে ছায়াঘেরা, দেয়াল-সুরক্ষিত অব্যবহূত তিন একর জায়গা পরিদর্শনে যাই। তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালক সফরসঙ্গী হিসেবে থাকেন। সেখানে আশির দশকের গোড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল 'জুটো ফাইবার গ্লাস ফ্যাক্টরি'। জমির মালিকানা বিজেএমসির। বর্তমানে কতিপয় লোকবলসহ এর উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। মূলত দেশে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের আবিস্কার তথা প্রাচুর্য্যের কারণে জুটো ফাইবার ফ্যাক্টরি মুখ থুবড়ে পড়ে। আবাসিক ভবনসদৃশ স্থানটি প্রথম দর্শনেই আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। মনে হচ্ছিল, অধ্যাপক করিমের বইয়ের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। মন্ত্রী এবং তার সহধর্মিণী হাসিনা গাজী, তারাব পৌরসভার মেয়রের সহযোগিতায় শুরু করি 'ঢাকাই মসলিন হাউস' গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জিং কাজ। চার মাস ধরে সপ্তাহে অন্তত একবার পরিদর্শন করে চলেছি আমি। নামকরণ, গোলঘর, তোরণ নির্মাণ, ডিজাইন, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর সুরক্ষা, কালার বিন্যাস, বিদ্যমান স্থাপনাসমূহের যথোপযুক্ত ব্যবহার, সরকারি অর্থের সাশ্রয় সাধন সবকিছুর দেখভাল করা অব্যাহত রাখি।
উদ্দেশ্য, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মসলিনের কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয়ভাবে এক ছাতার নিচে (under one umbrella) সমন্বিত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আনা। কর্মজীবী নারী শ্রমিকদের শিশুদের সুরক্ষার জন্য নির্মিত হয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার, প্রেয়ার রুম, মসজিদসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড। উল্লেখ্য, একই রাস্তায় পাশের ও সংলগ্ন অপর একটি বিজেএমসির অব্যবহূত পতিত দুই একর জায়গায় তাঁত বোর্ডের প্রস্তাবিত 'জামদানি ভিলেজ' তৈরির কাজও ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী মসলিন এবং জামদানি দুই বোন পাশাপাশি বসবাস করবে।
৭.
ঢাকার অদূরে শীতলক্ষ্যার তীরে নিসর্গ-ছোঁয়া এক অনন্য স্থানে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির নাম দিয়েছি 'ঢাকাই মসলিন হাউস' 'হারানো ঐতিহ্যের সন্ধানে দেশ'। ইংরেজি করা হয়েছে, The House of Dhakai Muslin. Lost Heritage : The Nation’s Quest.. আমি একবুক আশা নিয়ে আছি, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক শুভ উদ্বোধনের ভেতর দিয়ে অচিরেই দীর্ঘ প্রত্যাশিত আমাদের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়, আমাদের জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ ও গৌরবগাথা সেই মসলিন আবার ফিরে আসবে। ১৮৫১ সালে ইংল্যান্ডে সর্বশেষ মসলিনের প্রদর্শনী (exhibition) হয়েছিল এবং এতে তখনকার পত্রপত্রিকা ঢাকাই মসলিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিল। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, গোটা পৃথিবী বাংলাদেশকে আরেকবার নতুন করে আবিস্কার করবে। আমি এ-ও প্রত্যাশা করি, দেশীয় ফুটি কার্পাস থেকে উৎপাদিত ৭০০ মে. কাউন্টের সূক্ষ্ণতম মসলিন শাড়ি বহির্বিশ্বে ফের আলোড়ন তুলবে। আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ইতোমধ্যে নির্মিতব্য এ মসলিন হাউস পরিদর্শনপূর্বক এতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। তারা মসলিনের এমন পুনরুজ্জীবনকে বিদেশ নীতির (foreign policy) ভাষায়soft power tool বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমার সুদীর্ঘ চাকরিকালের শেষ উদ্যোগটির সফল বাস্তবায়ন পেলে ডেমরা ও তারাব পৌর এলাকা এবং শীতলক্ষ্যার বিদ্যমান তটরেখা একদিন হয়তো বিশ্বজনীন পরিচিতি পাবে। এমন মধুর স্বপ্নেও আমি নিরন্তর ভাসতে চাই। কেননা, মানুষ তার অধীত জ্ঞানের চেয়ে বড় কোনো স্বপ্ন দেখে না।

লেখক
প্রাবন্ধিক
কথাসাহিত্যিক

বিষয় : ঢাকাই মসলিন হাউস

মন্তব্য করুন