একটি মহাসড়ক, বন্দর বা একটি মেগা গ্রকল্পে দেশের শুধু প্রত্যক্ষ উপকারই হয় না, পরোক্ষ অনেক ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়। একটি প্রকল্পকে ঘিরে বহুমুখী অন্তর্জাল তৈরি হয়। সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একটি প্রকল্পের সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত থাকে। সড়ক কিংবা ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্প হলে সেখানে প্রচুর নির্মাণ শ্রমিকের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। সড়ক নির্মাণ করতে রড, সিমেন্ট, বালুসহ অন্যান্য উপকরণের প্রয়োজন হয়। মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এর মাধ্যমে টাকার লেনদেন হয়। বছর শেষে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে।
যেমন গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ শহরের দূরত্ব ৮৭ কিলোমিটার। সড়কটি যখন দুই লেনের ছিল, তখন যাতায়াতে সময় লাগত চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা। প্রতিদিন যানজটে নাকাল হতো যাত্রীরা। প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটত। সড়কটি চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর যাতায়াতে যেমন সময় লাগছে আগের চেয়ে অর্ধেক, তেমনি বদলে গেছে ওই অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা।
সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরের বছর সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে; এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা খরচে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে। চার লেনের মহাসড়ক হওয়ার পর ওই এলাকায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, সেটি নিয়ে গত বছর গবেষণা করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সেই গবেষণায় উঠে এসেছে, সড়কটি চার লেনে উন্নীত হওয়ার আগে সেখানকার মানুষের মাসিক গড় আয় ছিল পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। এখন সেটি বেড়ে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। কৃষিপণ্য পরিবহনে আগে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়তেন কৃষকরা, সেই ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলেছে তাদের। পণ্য পরিবহনে খরচও কমেছে। মিলেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ, চিকিৎসাসেবায় এসেছে সহজলভ্যতা। সড়ক দুর্ঘটনা কমে গেছে। রাস্তার পাশে বেড়েছে জমির দাম। দিন দিন বাড়ছে শিল্প-কারখানা, বিভিন্ন অফিসের শাখাও তৈরি হচ্ছে। মহাসড়কটি গাজীপুর, শ্রীপুর, ভালুকা, ত্রিশাল ও ময়মনসিংহ সদরের মানুষের জীবনমান পুরোপুরি বদলে দিয়েছে বলে আইএমইডির ওই গবেষণায় উঠে এসেছে।
দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে অবকাঠামো দুর্বলতাকে দায়ী করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। অবকাঠামো উন্নয়নে গত এক দশকে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয় সরকার, যার মধ্যে একটি হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতু। সোয়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর নির্মাণকাজ এরই মধ্যে ৮১ শতাংশ শেষ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়বে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে বদলে যাবে পুরো দক্ষিণাঞ্চল।
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পদ্মা সেতুর পাশাপাশি পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রো রেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কক্সবাজার থেকে মিয়ানমারের ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণ, রাজধানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।
গত এক দশকে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট নির্মাণের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে আধুনিক, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। গত ১০ বছরের হিসাবে দেখা গেছে, জনগণের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে স্বস্তি আনতে ২৭৬ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। নতুন করে আরও ৩৪১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এক হাজার ১৪০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও জেলা মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ গুচ্ছ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত আট হাজার ৭০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে র‌্যাম্পসহ ৪৬.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পের কাজ চলছে। রাজধানীতে গণপরিবহনের উন্নয়নে উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে মেট্রো রেল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের গতি বেগবান হবে বলে সবার বিশ্বাস।