সাধারণ পাঠকদের জানা না থাকলেও ব্যাংকিং জগতের সঙ্গে জড়িত অনেকেই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উঠে আসা ভারতের ইয়েস ব্যাংকের কাহিনিটা হয়তো জানেন। প্রথমে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পাঁচ বছরের মধ্যেই ২০০৪ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয় ব্যাংকটি। তার এক বছরের মাথায় ক্রেডিট কার্ড ব্যবসায় পা বাড়ায়, বাজারে শেয়ারও ছাড়ে। যাত্রা শুরুর মাত্র চার বছরের মাথায় বিজনেস টুডে কেপিএমজি বেস্ট ব্যাংক নির্বাচিত হয় ব্যাংকটি। ২০১৭ সালের শেষে ব্যাংকের বয়স যখন তেরো, তখন এটির শাখার সংখ্যা এক হাজার পঞ্চাশটি এবং এটিএম এক হাজার সাতশর ওপরে। অর্থাৎ বছরে গড়ে আশিটিরও বেশি শাখা খুলেছে ব্যাংকটি কিংবা প্রতি মাসে গড়ে ছয়টির বেশি। ২০১৮-১৯ বছরের বার্ষিক রিপোর্টে দেখা যায়, চৌদ্দ বছরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে মোট চৌদ্দটি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এই ব্যাংককে। চালু হওয়ার দশ বছরের মাথায় ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার কোটি রুপি, আর আমানত ৭৪ হাজার কোটি। তারপর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে ঋণের পরিমাণ। পরের নয় বছরে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় চার গুণ। ২০১৯ সালে ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় সোয়া দুই লাখ কোটি রুপিতে। কিন্তু এই চোখ ধাঁধানো সাফল্যের আড়ালে ব্যাংকটির আকাশে ঘনীভূত হচ্ছিল দুর্যোগের কালো মেঘ।
সাদা চোখে মনে হতে পারে ব্যাংকটির দ্রুত উত্থানই বুঝি এই দুর্গতির জন্য দায়ী? মোট ঋণের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি এবং শাখা সম্প্রসারণের গতি দেখে এই ধারণা হওয়াই সঙ্গত। অভিযোগ আছে, যেসব বড় কোম্পানিকে তাদের দুর্বলতার কারণে অন্য ব্যাংক ঋণ দিতে অস্বীকার করত, ইয়েস ব্যাংক প্রতিযোগিতা এড়াতে সেসব গ্রাহককেই ঋণ দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই পরবর্তী সময়ে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি প্রমাণিত হয়। ২০২০ সালের শুরুতেই ব্যাংকের একজন স্বতন্ত্র পরিচালক 'করপোরেট সুশাসনের নিম্নগামী মান, নিয়মাচার পরিপালনের ব্যর্থতা এবং ব্যবস্থাপনার কর্মপদ্ধতির ব্যাপারে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বোর্ড থেকে পদত্যাগ করলে দানা বাঁধে মূল সংকট। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের বিপরীতে সংস্থান রাখার জন্য মূলধন বাড়ানোর অক্ষমতা, বিনিয়োগকারীদের বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত চাওয়া এবং আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা। পরে দেখা গেছে ২০১৮-১৯ সালের ব্যালেন্সশিটে তিন হাজার কোটি রুপির খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা গোপন করে গিয়েছিল ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক ইয়েস ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করে একজন প্রশাসক নিয়োগ দেয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার কোটি রুপিতে, যা মোট ঋণের ১৯ শতাংশ, প্রভিশন বাদ দিয়েও নিট খেলাপি ঋণ ছিল ৬ শতাংশ। মার্চ ২০০০ অর্থবছরে (ভারতে অর্থবছর ধরা হয় এপ্রিল-মার্চ) ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৪৭৮ কোটি রুপি, ২০১৮ সালে এই অঙ্ক ৪২২৫ কোটি রুপিতে পৌঁছে যায়। পরের বছরই বড় ধাক্কাটা আসে, যখন খেলাপি ঋণের জন্য বিরাট অঙ্কের সংস্থান করতে হয়। এ বছর নিট মুনাফা নেমে যায় ১৭২০ কোটি রুপিতে। ২০২০ সালে ইয়েস ব্যাংকের ব্যালেন্সশিটে প্রথমবারের মতো লোকসান উঠে আসে এবং তার পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৪১৮ কোটি রুপি। সদ্যসমাপ্ত ২০২১ অর্থবছরে এই লোকসান কমে এলেও তার পরিমাণ ছিল ৩৪৬২ কোটি রুপি। অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চাতুরিবিন্যাস করে যে পরিমাণ (১৮৯১৯ কোটি রুপি) কাগুজে মুনাফা দেখানো হয়েছিল, গত দুই বছরের মোট লোকসান ছিল তার চেয়েও বেশি।
এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর ব্যাংকের শেয়ারমূল্যেও ব্যাপক ধস নামে। ২০১৮ সালে যে ব্যাংকের শেয়ারমূল্য ছিল ৪০০ রুপি, ২০২০ সালের মার্চে সেটা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ১৬ রুপিতে। শেষাবধি রাষ্ট্রায়ত্ত স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ইয়েস ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ শেয়ার কিনে নিলে ব্যাংকটি নিশ্চিত পতন থেকে রক্ষা পায়। পরবর্তী সময়ে সেই শেয়ারের একাংশ বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার পরও ইয়েস ব্যাংকের মালিকানার ৩০ শতাংশ এসবিআইর হাতেই থেকে যায়।
ওপরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ইয়েস ব্যাংকের এই পরিস্থিতির জন্য ব্যাংকটির অতি আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদী কৌশল নয়, বরং সুশাসনের মারাত্মক ঘাটতিই ছিল প্রধানত দায়ী। অতিসম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) ১৭০০ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির জন্য ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা এমডি, তার পরিবারের সদস্য এবং এক আবাসন কোম্পানির মালিকের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। তদন্তে উঠে আসে এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সময়ে ৭১টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় মোট ৩২ হাজার কোটি রুপি ঋণ, যেগুলো পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়ে যায়। তদন্তে আরও উদ্ঘাটিত হয়, কিছু কর্মকর্তাকে বাজারের চেয়ে অনেক বেশি বেতন, সুযোগ-সুবিধা এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদবিতে ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা বিভিন্ন অনিয়মের ব্যাপারে কোনো আপত্তি উত্থাপন করতে বা বাধা দিতে না পারেন।
ব্যাংকটির পরিণতির বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অভিযোগের তীর নিশানা করেছেন দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার (সেবি) দিকে। তার মতে, ২০১৭ সালের পর থেকে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক রগ্‌ণ ব্যাংকটির ওপর কঠোর নজরদারি চালু করলেও তার আগে থেকে চলে আসা এতসব কেলেঙ্কারির বিষয়ে উদাসীনতা ছিল তাদের। তার প্রশ্ন, সেবি পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখে বলে দাবি করলেও ইয়েস ব্যাংকে এতকিছু ঘটল কীভাবে?
বিস্ময়কর হলেও সত্য, বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দশ বছরে সুশাসনের অভাবে ঘটে যাওয়া বিশ্বের দশটি বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারির মধ্যে নয়টিই ঘটে আমেরিকার মতো কঠোর অ্যাকাউন্টিং নীতি মেনে চলা (?) দেশে, আর একটি ঘটে ভারতে (সত্যম কেলেঙ্কারি)। অনেকের স্মরণে থাকার কথা, খোদ মার্কিন মুলুকে এনরন, ওয়ার্ল্ডকম কেলেঙ্কারির মতো লজ্জাকর আর্থিক দুর্নীতি ঘটে যাওয়ার পর মার্কিন কংগ্রেস নড়েচড়ে বসেছিল। বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ২০০২ সালে পাস হয় সার্বেইনস-অক্সলি অ্যাক্ট, যাতে অ্যাকাউন্টিংয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। এতে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির বোর্ডের দায়িত্ব চিহ্নিত করা হয় এবং অ্যাকাউন্টিং কারসাজির বিরুদ্ধে রাখা হয় যথাযথ শাস্তির বিধান। তবে মজার ব্যাপার, এই আইন পাস হওয়ার পরও আমেরিকায় ঘটে গেছে একের পর এক অ্যাকাউন্টিং কারসাজি। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে সুশাসনের ঘাটতির কারণে।
ইয়েস ব্যাংকের উদাহরণের এই দীর্ঘ বিবরণ তুলে ধরার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান প্রবণতা ও চ্যালেঞ্জ বিষয়ে এই স্বল্প পরিসরে কিছুটা আলোকপাত করা। এই চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করার জন্য আমরা অতিসরলীকৃতভাবে কেবল খেলাপি ঋণের কথা তুলে ধরি বলে সমগ্র প্রবণতার ব্যাপ্তিটাকে ধরা যায় না। খেলাপি ঋণ একটা চ্যালেঞ্জ বটে, কিন্তু সেটির উৎপত্তিও হয় সুশাসনের অভাব থেকে। সুশাসন বিষয়টা কারও কারও কাছে এতই বিমূর্ত যে, সেটার একটা কেতাবি সংজ্ঞা এখানে দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
সুশাসন বলতে আমরা বুঝি, এটি কোনো প্রতিষ্ঠানকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একগুচ্ছ নীতিমালা, নিয়মাচার এবং সঠিক কর্মপদ্ধতির এক সমাহার। ধারণাটি যে কেবল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ও তার সুবিধাভোগীদের, যেমন শেয়ারহোল্ডার বা মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাহক, সরবরাহকারী, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সর্বোপরি সমাজের স্বার্থরক্ষার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় তা নয়, প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্যও সুশাসন অতি প্রয়োজনীয় এক উপাদান। সুশাসনের বিভিন্ন নিয়ম-নীতি ও প্রক্রিয়া যখনই লঙ্ঘিত, অকার্যকর কিংবা ব্যর্থ হয়, তখন একটি প্রতিষ্ঠান যত উচ্চ অবস্থানেই থাকুক না কেন, নেমে আসে বিপর্যয়। ওপরে বর্ণিত ইয়েস ব্যাংকের অবিশ্বাস্য উল্লল্ফম্ফন এবং সুনামির গতিতে ভূমিতে আছড়ে পড়ার দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে হুবহু এ রকম দৃষ্টান্ত না থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানের কিছু উপসর্গ এই ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রকট হচ্ছে মন্দ ঋণ লুকিয়ে রাখার প্রবণতা। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করলেও তা সবসময় সর্বক্ষেত্রে কার্যকর থাকে না। কার্যকর না থাকার এই প্রবণতাকেই সুশাসনের ঘাটতির একটা উপাদান হিসেবে তুলে ধরা যায়। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা খুবই জরুরি। সুশাসন প্রয়োগের ব্যর্থতা কখনোই রাতারাতি ঘটে না, এটি দীর্ঘদিন ধরে ঘটতে থাকে এবং সেটা বোঝার জন্য কিছু সতর্ক সংকেতও পাওয়া যায়, এই সতর্ক সংকেতকে গুরুত্ব না দিয়ে সংশোধন বা পরিপালনের চেষ্টা না করলেই ঘটে চূড়ান্ত বিপর্যয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সংঘটিত হওয়া এ জাতীয় কিছু ঘটনা বিশ্নেষণ করলেই দুর্বল বা অনুপস্থিত সুশাসনের প্রমাণ মেলে।
সুশাসনের ঘাটতির কিছু লক্ষণ এখানে উল্লেখ করা যায়। যেমন- ব্যাংকিং বিষয়ে বোর্ড সদস্যদের পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, বোর্ডে ব্যক্তি বা পরিবারতন্ত্রের একচ্ছত্র প্রভাবের কারণে বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা, ব্যালেন্সশিট ও আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে বোর্ড সদস্যদের অপর্যাপ্ত ধারণা, ক্রমবর্ধমান মুনাফার জন্য যথাযথ নিয়মাচারের খেলাপ ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় গঠিত বোর্ডের অধীন অডিট কমিটি, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি ইত্যাদি গঠন করলেও এসব কমিটির সদস্যদের অনেকেই তাদের কর্তব্য ও করণীয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন।
আমাদের এবং ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের স্মরণে রাখা উচিত, ব্যাংকের মূল ব্যবসা পরিচালিত হয় ঝুঁকির মধ্য দিয়ে, আর এই ঝুঁকি হচ্ছে মূলত ঋণঝুঁকি। যদিও আরও কিছু ঝুঁকি আছে, তবু ঋণঝুঁকিটাই প্রধান, আর এই ঝুঁকি থেকেই আসে ব্যাংকের সিংহভাগ মুনাফা। ব্যাংক তার ব্যবসায়িক কারণে যে ঝুঁকি নেয় কিংবা সৃষ্টি করে, সেটি যখন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়ে নিয়ন্ত্রণাতীত হয়ে যায়, তখনই দেখা দেয় বিপর্যয়। আমাদের স্মরণে থাকতে পারে, আমেরিকার অর্থনীতির যে চোখধাঁধানো উন্নতি দেখা যাচ্ছিল, কেবল সুশাসনের ঘাটতির কারণে ২০০৮ সালে সেখানে নেমে আসে বিশাল বিপর্যয়, যা গ্রাস করেছিল প্রায় সমগ্র বিশ্বকে। মহাশক্তিধর একটি দেশের জন্য এটা ছিল বিশাল এক গ্লানি। সেই গ্লানিবোধ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই সে দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বেশ কিছু নিয়মাচার ও আইন প্রণয়ন করা হয়, যা অন্যান্য দেশের জন্যও প্রযোজ্য হয়ে পড়ে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ব্যাংকের সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণের বিধান করা। ইয়েস ব্যাংক এই মূলধন কিংবা মন্দ ঋণের সংস্থান রাখার প্রয়োজনীয়তার প্রতি কোনো নজর না দিয়ে উন্মত্তের মতো ঋণ বিতরণ করে যাচ্ছিল বলেই ব্যাংকটির ওপর নেমে এসেছিল অবশ্যম্ভাবী বিপর্যয়। বাংলাদেশের সুশাসিত ব্যাংকগুলো এই কাজটি না করলেও মন্দঋণ সংস্থানের বিষয়ে অনেক ব্যাংকেরই গড়িমসি কিংবা অনীহা আছে, কারণ মন্দঋণ সংস্থান ও বিতরণযোগ্য লভ্যাংশের মধ্যে রয়েছে (অর্থনীতির ভাষায়) ঋণাত্মক সম্পর্ক, অর্থাৎ মন্দঋণের সংস্থান বেশি হলে লভ্যাংশ কমে যায়।
আমাদের ব্যাংকিং খাতে যদি কেবল সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথে সেটি হবে বিশাল এক অগ্রগতি। এই খাতকে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন নীতিমালা ও আইন বিদ্যমান থাকলেও সেসব যে ঠিকভাবে পরিপালিত হচ্ছে, এমন কথা খুব জোর দিয়ে বলা যাবে না। এই ব্যত্যয়ের সঙ্গে আরও বেশি প্রকট কাঙ্ক্ষিত মূল্যবোধের অভাব। সুশাসন নিশ্চিত করার পথে আরেকটি বাধা পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণেও ভঙ্গ হয় আইন ও নিয়মাচার। সুতরাং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন কায়েম ও নিশ্চিত করার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ অতি জরুরি, কারণ ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে জড়িত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও টেকসই প্রবৃদ্ধি। এসব পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিধিমালা ও বিভিন্ন নিয়মাচার পরিপালনে ব্যর্থতার জন্য যথাযথ আইনি ব্যবস্থা ও দণ্ডের প্রয়োগ নিশ্চিত করা, প্রকৃত নজরদারি জোরদার করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করা, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সচেতন ও দায়বদ্ধ করা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা হলেই একটা শক্তিশালী ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতি বিশ্নেষক

বিষয় : ব্যাংকিং খাতে সুশাসন

মন্তব্য করুন