বাংলাদেশের বয়স এখন পঞ্চাশ বছর। ইতিহাসের কষ্টিপাথরে বিচার করলে খুব একটা দীর্ঘ সময় নয়। এই স্বল্প সময়েই বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা এক কথায় অভাবনীয়। বিস্ময়কর। ১৯৭২ সালে জাতির পিতার নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ তার উন্নয়নের দৌড় শুরু করে, তখন তার চলার পথটি ছিল খুবই সরু। বলা যায় 'মেঠোপথ'। আর আজ সেই পথ উন্নয়নের মহাসড়কে গিয়ে মিশেছে। সেদিনের আট বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি আজ ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার। সেদিনের মাথাপিছু আয় ৯৩ ডলার থেকে বেড়ে আজ ২,২২৭ ডলার। মাইনাস সাড়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে শুরু করা দেশটি আজ ৭ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। করোনার ভয়ংকর ছোবল সত্ত্বেও পথ হারায়নি বাংলাদেশের অর্থনীতি। সারা পৃথিবীর অর্থনীতি যখন ৩.৫% সংকুচিত হয়েছে তখনও বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪%-এর মতো বেড়েছে। বিশ্ব মোড়লরা যদি ঠিক সময়ে করোনার টিকা সরবরাহ করতে পারত তাহলে নিশ্চয় এই প্রবৃদ্ধির হার আরও বেশি হতো। তার প্রমাণ চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণসমূহ। বাংলাদেশ সরকার তার বাজেটে বলেছে, এ বছর আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশ হবে। তখনও কিন্তু আমরা জানতাম না করোনার মতিগতি কী হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সাহসী প্রধানমন্ত্রী অনেক দূরে দেখতে পান। ঠিক যেন বঙ্গবন্ধুর মতো।
পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে তিনি স্বাধীন দেশে ফেরার পথে দিল্লিতে থেমেছিলেন। এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন দেশে ফিরতে তিনি এত উতলা কেন? তখন তিনি বলেছিলেন, তাঁর সমগ্র জনগণ তাঁর জন্য অধীর অপেক্ষায় আছেন। আগামীর বাংলাদেশ হবে 'শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির'। তিনি বরাবরই সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এক অসামান্য অর্থনৈতিক যুদ্ধের তিনি নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত 'ধ্বংসস্তূপ থেকে সমৃদ্ধির পথে' বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথাতেই তিনি ৯৩ ডলারের অর্থনীতিকে তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বের গুণে ২৭৩ ডলারে উন্নীত করেছিলেন। কিন্তু দেশবিরোধীদের আঘাতে সেই শুভযাত্রা হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। জাতি হারায় তাঁর শ্রেষ্ঠতম সন্তানকে। অর্থনীতি হারায় তার দিশা। তাই এর পরের বছরই বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ধপাস করে পড়ে যায় ১৩৮ ডলারে। এর পরের বছর ১২৮ ডলারে। দীর্ঘ ১৩ বছর লেগেছিল আমাদের মাথাপিছু আয়কে পঁচাত্তরের পর্যায়ে আনতে।
অনেক চড়াই-উতরাই শেষে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বের নামিদামি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশের গতিময় অগ্রযাত্রার খবর আসছে। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর টুপিতেও যুক্ত হচ্ছে নয়া সব পালক। সর্বশেষ পালকটি যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘে 'এসডিজি প্রগ্রেস অ্যাওয়ার্ড'টি দেওয়ার সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের এসডিজি উপদেষ্টা এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের 'আর্থ ইনস্টিটিউটে'র পরিচালক বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জেফরি স্যাক্স যখন বলেছেন বাংলাদেশের এসডিজি সূচকের বেশিরভাগেরই অগ্রগতি সারাবিশ্বে পয়লা নম্বরে। তাই তো তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আখ্যা দিয়েছেন 'জুয়েল ইন ক্রাউন' বলে।
শুধু জাতিসংঘ কেন অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করে চলেছে। দি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গবেষণা দল বলেছে, বাংলাদেশ যদি তার টিকা প্রদানের উচ্চ ধারা বজায় রাখতে পারে, তাহলে বর্তমান অর্থবছরে ৭% থেকে ৭.২% প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। যে হারে রপ্তানি ও আমদানির ধারা ফিরে এসেছে, এলসি খোলার হার যেভাবে বাড়ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গতি আসায় আমাদের পোশাক পণ্যের রপ্তানির অর্ডার যে হারে বাড়ছে তাতে এ কথা বলাই যায় যে, আমাদের অর্থনীতি এ বছর ৭ শতাংশের বেশি হারেই বাড়বে। তবে অনেক দিন পর সারাবিশ্বের অর্থনীতি হঠাৎ করে খুলে যাওয়ার কারণে তেলের দাম ও জাহাজ পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়ছে। ডলারের চাহিদাও বাড়ন্ত। অনেকেই চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, আত্মীয়স্বজনকে দেখতে এবং ব্যবসায়ী প্রয়োজনে এখন বিদেশে যাচ্ছেন। তাই ডলারের দাম বাড়ছে। সাময়িকভাবে হলেও প্রবাসী আয়ও আগের বছর থেকে কমছে। তাই মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ছে। দেশের ভেতরেও বন্যা ও ভারি বৃষ্টিপাত, চাঁদাবাজি এবং কতিপয় ব্যবসায়ীর গুজবসহ বিভিন্ন কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। আশা করা যায়, মূল্যস্ম্ফীতির এই প্রবণতা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার তাদের উপযুক্ত নীতি উদ্যোগের মাধ্যমে কিছুদিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে। মূল্যস্ম্ফীতি স্থিতিশীল রাখার ভালো রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের।
নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কিন্তু বাংলাদেশ তার মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির হার গত এক দশক ধরেই এশিয়াতে এক নম্বরে রেখেছে। স্ট্যানচার্টের মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই নমিনাল হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। এই সময় চীনের হার ছিল ৬.৯%। আর ভারতের ৩.১%। পুরো ২০১১-১৮ সময়কালে বাংলাদেশের মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির নমিনাল হার ছিল ৯.৪%। চীনের ৭%। ভারতের ৩.৯%। সম্প্রতি আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের এই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৫%। বিশ্বব্যাংক বলছে, তা হবে ৬.৪ শতাংশ। আর এডিবি বলছে, এই হার হবে ৬.৮ শতাংশ। আমার ধারণা, প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নিচে হবে না। আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেহেতু খুবই স্লথ, মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির হার স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়বে। বাংলাদেশের মানুষের যেমন আয়-রোজগার বাড়ছে, তেমনি ভোগের পরিমাণও বাড়ছে। আমাদের প্রবৃদ্ধির ৬৩% আসে এই ভোগ থেকে। আগের চেয়ে সহজে শহরে ও বিদেশে কর্মরত মানুষের আয় মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যের কাছে পৌঁছাতে পারছে। তাছাড়া গ্রাম থেকে অনেক মানুষ বাইরে কাজের সন্ধানে বের হওয়ায় গ্রামের শ্রমবাজার বেশ টাইট হয়ে গেছে। একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক আয় ৫০০ টাকার নিচে নয়। বাচ্চাদের পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দিকে এখন নিয়মিত পাওয়া এই টাকা তাদের প্রয়োজনমতো খরচ করতে পারেন। পোশাককর্মীরাও তাদের পরিবারকে নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছেন। ফলে পাঁচ বছরের শিশুদের পুষ্টির মান, উচ্চতা ও ওজন দুই-ই বাড়ছে। আর কমছে শিশুমৃত্যু। সব মিলে তাই বাংলাদেশের বিশ্ব ক্ষুধা সূচক অর্জন খুবই ভালো। এ বছর তা ১৯.৫। ৯ বছর আগেও তা ছিল ২৮.৫।
বাংলাদেশ যে উন্নয়নের দৌড়ে ভালো করছে তা ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) নিয়মিত বলে আসছে। ২০২০ সালের এক প্রক্ষেপণে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বিশ্বের ৩৪তম হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। ২০২০ সালে তার অবস্থান ছিল ৪০তম। সে কারণেই দি স্ট্যানচার্ট গবেষণা টিম বলেছে, ২০২৬ সালেই বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। তখন তার মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আইএমএফের বিশ্ব আউটলুক বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ২০২৬ সালে হবে ৫১৬ বিলিয়ন ডলার। এই প্রেক্ষাপট মনে রেখেই বাংলাদেশ তার দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনার মোদ্দা কথা হলো, ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ। তখন তার মাথাপিছু আয় হবে সাড়ে ১২ হাজার ডলার। তার প্রবৃদ্ধির হার এই ২০ বছরে গড়ে হবে ৯%। এই সময় মূল্যস্ম্ফীতি ৫ শতাংশের সামান্য নিচেই থাকবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে ১.০৩%। সঞ্চয়ের অনুপাত হবে জিডিপির ৩৭.৭৫%। বিনিয়োগের অনুপাত ৪০.৮৭%। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ৩১.২৩%। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ২.৮২%। রপ্তানি এই সময়ে বাড়বে ১১.২% হারে। আমদানি ১০.৭%। প্রবাসী আয় ৪.৬৭%। ৬.৩৪ মাসের আমদানি খরচ জোগানোর মতো বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে বাংলাদেশের।
এখন অর্থনীতির যে গতিময়তা আমরা দেখতে পারি তাকে আরও বেগবান করার প্রয়োজন রয়েছে। গড়ে আরও ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমাদের বাড়িয়ে যেতে হবে। সরকার এসব ভেবেই অনেকগুলো মেগা অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এক পদ্মা সেতুই তো আমাদের ১ শতাংশের বেশি বাড়তি প্রবৃদ্ধি দেবে। এসব প্রকল্প প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুই-ই গাণিতিক হারে বাড়ানোর ক্ষমতা রাখবে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আমাদের আগামীর বাংলাদেশকে নয়া উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে পরিকল্পিত এই বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি জানিয়েছে যে, এমন ১২টি প্রকল্প আছে যা গত পাঁচ-ছয় বছরে শুরুই করা যায়নি। আরও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আমাদের মনিটরিং ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের আওতায় এনে আধুনিক করার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুশাসন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নিয়মনীতির স্বচ্ছতা সমেত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন খুব বেশি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়েছে। এ খাতকে আরও সবুজ করার প্রয়োজন রয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাদ দিয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৩০% রিনিউয়েবল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা 'মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যানে'র আওতায় গ্রহণ করেছে তাকে বেশ সাহসী ও আশা জাগানিয়াই বলা চলে। জলবায়ু পরিবর্তন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে তার বাজেটের ৮ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে।
সবুজ প্রবৃদ্ধির এই ধারা সচল ও অক্ষুণ্ণ রাখতে একদিকে যেমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, অন্যদিকে এসব ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত দক্ষ জনশক্তি গড়ার চ্যালেঞ্জও আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এসব কিছুই সরকার একা করতে পারবে না। ব্যক্তি খাতকেও গবেষণা ও উন্নয়নে তাদের অবদান রাখতে হবে। সরকার বরং তাদের সমর্থনে নীতি-সহায়তার ওপর বেশি করে জোর দিতে পারে। এসবের জন্য অর্থ লাগবে। দেশের ভেতর থেকে যেমন রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে এবং তেমনি বিদেশ থেকেও আন্তর্জাতিক আর্থিক সমর্থন জোগাড় করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে দরকার চৌকস অর্থনৈতিক কূটনীতি। আমাদের নেতৃত্বের যে ঔজ্জ্বল্য রয়েছে তাকে সম্পদ করে বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পগুলো ঠিকমতো বলতে পারলে নিশ্চয় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সভায় যথার্থভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটেই আগামীর উন্নত টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণে করণীয় কী হতে পারে তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি :
০১) ঐতিহ্যের পরম্পরা :আমরা কোথায় কোথায় অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভালো করেছি সে খাতগুলোকে চিহ্নিত করে বাড়তি নীতি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে আজকের এই গতিময় অবস্থানে আনার পেছনে সাফল্যের পাটাতন গড়ে দিয়ে গিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন কৃষি, শিল্প, শিক্ষায় এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যাও এসব নীতিকে সমর্থন দিয়ে চলেছেন। নেতৃত্বের ঐতিহ্যের এই পরম্পরা এবং আগামীর নীতিকাঠামোকে আরও আধুনিক, গণমুখী ও টেকসই করে যাওয়াটাই হবে আমাদের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর দায় শুধু রাষ্ট্রের একার নয়। ব্যক্তি খাত, অ-সরকারি অলাভজনক খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের বন্ধনেই বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
০২) মানুষের ওপর বিনিয়োগ :উন্নত দেশ গড়তে চাইলে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ বিনিয়োগ শিক্ষা খাতে দিতে হবে। একই সঙ্গে এমন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে আমাদের আগামী প্রজন্ম কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানে পারদর্শী, জলবায়ু ও পরিবেশ সচেতন, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সুস্বাস্থ্য অর্জনে জীবনশৈলীতে উৎসাহী হয়। কভিড আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা ও সক্ষমতা- দুই-ই সামনে এনেছে। জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আগামীর বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য সহযোগী ও গবেষণা সুযোগ বৃদ্ধির জন্য বাড়তি বাজেট ও শিক্ষার মতো বৃহৎ পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা নীতি ইতোমধ্যেই তৈরি আছে। সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষামূলক এই নীতি বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের ওপর নজর দেওয়াটাও মানবিক বিনিয়োগের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
০৩) উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর : আমাদের শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য দক্ষতা উন্নয়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তি-সহায়ক করার পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও যাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডাটা ব্যবস্থাপনার সুযোগ নেওয়া যায় সেজন্য কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ জোরদার করার উদ্যোগ সরকার ও ব্যক্তি খাতকে নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাজেট সমর্থন দিতে হবে। আর্থিক খাতেও অন্তর্ভুক্তি ও দক্ষ ব্যাংকিং সেবা প্রদানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সব ব্যাংকেই 'উদ্ভাবনী হাব' তৈরি করতে হবে।
০৪) রপ্তানি বৃদ্ধি :রপ্তানি বাণিজ্য বাংলাদেশ ভালোই করছে। তবে এই সাফল্য একটি বিশেষ খাতভিত্তিক। তাই অন্যান্য খাতকে সমান নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানির বহুমুখীকরণ ও গতিময়তা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যেসব পণ্যে আমাদের অপেক্ষাকৃত সুবিধা আছে যেমন- ওষুধ, পোশাক, চামড়া, আইটি, কৃষি, প্রক্রিয়াজত পণ্য, সেসব পণ্যকে বিশ্ব সরবরাহ চেইনের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করা খুব জরুরি।
০৫) পর্যটন শিল্পে সহায়তা : কভিড-উত্তর বিশ্বে দেশজ ও আন্তর্জাতিক- দুই ধরনের পর্যটনেই চাহিদা বাড়বে। এই খাতে 'ভি-শেপড' উত্তরণের সম্ভাবনা প্রচুর। সেজন্য স্বদেশের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা এবং তাদের ই-বুকিংসহ যাবতীয় সহায়ক সার্ভিস, যাত্রীদের অভিযোগ মীমাংসার ব্যবস্থা এবং সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
০৬) খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে জোর :কভিডকালেই আমরা বুঝতে পেরেছি খাদ্য উৎপাদন করলেও বিতরণ ও মার্কেটিং ব্যবস্থা কতটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তাই খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এবং এই পণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিং খুবই দরকার। দেশের ভেতরে নতুন করে অনেক ই-কমার্স উদ্যোক্তা খাদ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এসব খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্টার্ট-আপ পুঁজিসহ খুব সহজেই স্বল্পমাত্রার ঋণ ও প্রণোদনা সমর্থন দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ব ভ্যালু চেইনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার জন্য এ খাতকে এফডিআইবান্ধব করার জন্য নীতি সংস্কারের প্রয়োজন হলে করা যেতে পারে।
০৭) সফটওয়্যার শিল্পের প্রসার :বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। বেশকিছু হাই-টেক পার্ক গড়ে উঠেছে। ট্যাক্স-হলিডেসহ দক্ষতা উন্নয়নেও এ খাতকে নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই নীতি সহায়তার সঙ্গে অর্থায়ন ও ব্র্যান্ডিং জোরদার করতে পারলে এর বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
০৮) নগরায়ণ :ঢাকা ও চট্টগ্রামের আশপাশেই আমাদের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ গড়ে উঠেছে। ফলে শ্রমিকের বাসস্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসন ও যাতায়াত সংকট লেগেই আছে। বিশেষ শিল্প অঞ্চলগুলো গড়ে উঠলে এবং অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর সবুজ পরিকল্পিত বিকাশ ঘটলে আমাদের নগরায়ণ টেকসই হবে।
আরও অনেক খাত নিয়েই এমন নীতি আলোচনা করা সম্ভব। কিন্তু স্থানাভাবে আলোচনা আর বাড়াতে চাচ্ছি না। এই কটি খাতকে নীতি মনোযোগের অংশ করা গেলেই আমাদের কভিড-উত্তর বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের গতিপথ নির্ণয় অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। বছরে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন মোটেও সহজ কাজ নয়। তবে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারলে তা অসম্ভবও নয়। সরকার অবিশ্যি নীতি পরিবেশ তৈরির কাজ করবে। ব্যক্তি খাতকেও সামাজিক দায়বদ্ধ আচরণ করতে হবে। কভিডের পর বদলে যাওয়া বিশ্বের জীবনশৈলী, মানুষের মনোভাব, প্রযুক্তিনির্ভরতা, দাপ্তরিক কাজের ধরন, পারিবারিক জীবনযাপন ও বিদেশ ভ্রমণসহ সবকিছুই বদলে গেছে। জীবন আর কখনোই আগের মতো হবে না। বদলে যাওয়া এই বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, সংস্কৃতি- সব কিছুতেই নয়া সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। এসব সুযোগ কবজা করেই আমাদের উদ্যোক্তা ও সরকারকে মিলেমিশে সামনের দিকে হাঁটতে হবে। তবেই না আমাদের পক্ষে ২০৪১ নাগাদ উন্নত টেকসই বাংলাদেশ অর্জন করা সম্ভব।
লেখক

অর্থনীতিবিদ
সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক

বিষয় : উন্নত টেকসই বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন