জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছি। বাস করছি ফরিদপুর শহরে। জন্ম ফরিদপুর জেলার আলিপুরে হলেও আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঝালকাঠি জেলার গড়ইয়া গ্রামে। ২০১০ সালে গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমালাম। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেকে শক্ত করে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি।
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করি ২০১৩ থেকে, তখন রক্তদান করতাম। এরপর বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতাম। একটা সময় দেখলাম, আমি কাজ করতে চাই পার্মানেন্ট সলিউশন নিয়ে; কিন্তু অনেকে কাজ করে শুধু শখের বশে! তখন মনে হলো, আমার একারই কাজ করতে হবে এবং অনেক মানুষের জন্যই করতে হবে। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত ভলান্টারি একটা নেশা হয়ে গেছে।
২০১৮ সালে ফরিদপুর সদর উপজেলার বান্ধব পল্লির সুইপার কমিউনিটির শিশুদের নিয়ে অবৈতনিক স্কুল 'হাসিমুখ পাঠশালা'র মাধ্যমে সামাজিক কাজ শুরু করি। স্কুলটি মূলত এই সম্প্রদায়ের শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক বিকাশ, নৈতিক শিক্ষা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং যথাযথ যত্নের বিষয়ে কাজ করছে। নারী অধিকার নিশ্চিত করতে একদল তরুণ-তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে 'হাসিমুখ পাঠশালা'র পাশাপাশি গড়ে তুলি 'নন্দিতা সুরক্ষা' নামে একটি সংগঠন। লিঙ্গ সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে আমার সংগঠনটি। করোনার ভয়াবহতায় লকডাউন শুরু হওয়ার পর যখন সবাই ঘরে, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একই বাড়িতে পরিবারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে থেকে আমরা কাজ করেছি ফরিদপুর জেলার অসহায় দুস্থ নারী ও শিশুদের জন্য।
বাংলাদেশের মতো একটি ছোট উন্নয়নশীল দেশে বাস করে এ দেশের কুসংস্কার আচ্ছন্ন অশিক্ষিত মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে অসংখ্যবার অপমানিত, অবহেলিত হয়েছি; কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ৩০ হাজার মানুষকে সেবা প্রদান করেছি। আমাদের কাজের ফল হিসেবে দেশে প্রথমবার ঋতুস্রাববান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে ফরিদপুর জেলার ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু হয়েছে ঋতুস্রাব সুরক্ষা ব্যাংক।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অর্থায়নে সমন্বয়কারী হিসেবে লেগস প্রকল্পে কাজ করেছি। কাজের সম্মাননা হিসেবে পেয়েছি জাতিসংঘ থেকে 'ইন্সপায়ারিং ওম্যান ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২১'। বিশ্বের ১২টি দেশের মধ্যে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে পেয়েছি 'ফোর্সেস অব নেচার অ্যাওয়ার্ড ২০২১'। আমি কাজ শুরু করার পর দেখলাম, আমার আশপাশের হাজার হাজার মানুষ নানা অজ্ঞতায় ডুবে আছেন, অথচ তারা একটু সহায়তা পেলে সুন্দর জীবনযাপন করতে পারেন। তখন মনে হলো, আমার একটা মাত্র জীবন এত মানুষের সুখের সঞ্চার করতে পারলে আমি কেন তাদের জন্য কাজ করছি না? এই এতশত ঘাত-প্রতিঘাতে কেবল শান্তি পাই যখন পাঠশালার বাচ্চারা 'ম্যাডাম' বলে ডাক দেয়।
নির্যাতিত নারীর অধিকার বুঝে পাওয়ার পর জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে কিংবা বৃদ্ধার হাতে খাবার তুলে দেওয়ার পর 'খালা পাইসি' বলে হাসি দেওয়া। তাদের নির্ভরতার মানুষ হতে পারাটাই বড় প্রাপ্তি। মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হতে পারে, আমি স্বপ্ন দেখি একদিন আমার হাত ধরে অসংখ্য নারী এভাবে এগিয়ে আসবে দেশকে সমৃদ্ধ করতে, সমাজকে নারীবান্ধব করতে।
লেখক

তরুণ নারীকর্মী
ফোর্সেস অব নেচার অ্যাওয়ার্ড ২০২১ বিজয়ী