আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলে। বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের নিজের স্বপ্নের কথা জানালে সবাই নিষেধ করেন। এলাকার কেউই বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি। অনেকে তাচ্ছিল্য করে বলেছে, কৃষিকাজই যখন করবে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কী দরকার ছিল। কিন্তু আমার ধ্যান-জ্ঞানে কৃষি ও সৃষ্টিশীল কিছু করার তাড়া ছিল। পরিবারের সহায়তায় ছোট ভাই আব্দুল বারীকে সঙ্গে নিয়ে ১২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলি স্বপ্নের 'রূপগ্রাম এগ্রো ফার্ম'। প্রথমেই এই খামারের মধ্যে তিন বিঘা জমিতে পুকুর কাটি। পুকুরের কাটা মাটিতে ৭০০ আম গাছ, ১২০টি লিচু, ১০০টি মাল্টা, ১০০টি ড্রাগন ও ১০০টি ভিয়েতনামি নারিকেল গাছের চারা লাগাই। সেই সঙ্গে হাঁস ও ছাগল পালন এবং গরুর মোটাতাজাকরণ প্রকল্প হাত দিই। এক ফসলি এই ১২ বিঘা জমির ধান থেকে বছরে আয় হতো ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অথচ মাত্র এক বছরে কৃষি খামার থেকে আয় আসে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। এই আয়ের টাকা দিয়েই একের পর এক জমি লিজ নেওয়া শুরু করি।
আমার খামারে রয়েছে ৫০ প্রজাতির ফলের গাছ। খামারে আরও আছে বাসক, তুলসী, নিম, নীল অপরাজিতা, সাদা লজ্জাবতীসহ নানা প্রজাতির ঔষধি গাছ। আছে বিভিন্ন জাতের ফুলগাছও। শুরু করি মাছ ও হাঁস-মুরগি চাষ।
নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষির ওপর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিই। যেকোনো পরামর্শের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা বেশ সাহায্য করেন।
এ অবস্থায় সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকায় প্রায় ৭৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলি 'বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক'। এই পার্কে এখন চাষ হচ্ছে আম, লিচু, পেঁপে, মাল্টা, বলসুন্দরী বরই, কাশ্মীরি বরই, ড্রাগন ফল, বিদেশি প্যাশন ফল, জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন, পুষ্টিকর ফল অ্যাভোক্যাডো। শুধু তাই নয়, এসব গাছ থেকে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি চারা উৎপাদন নার্সারিও করেছি। তার খামারের চারা ইতোমধ্যে এলাকায় সাড়া ফেলেছে। সাধারণ বনজ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় বৈচি, অরবরই, বিলিম্বি, যজ্ঞডুমুর ইত্যাদি গাছের সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি।
দেশের সুস্বাদু আমের কদর বাড়ছে বিশ্ববাজারে। বিশ্বে আম উৎপাদনে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে অবস্থান করলেও রপ্তানিতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। গত মৌসুমে দেশে প্রায় ২৮ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হলেও রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭০০ টন। দেশের আম স্বাদে-গুণে সেরা হলেও, বিশ্ববাজার ধরতে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক কৌশল ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে ফ্রুট ব্যাগিংয়ের গুরুত্ব অনেক। এটি এখনও কৃষিপণ্যের আওতায় না হওয়ায় প্রায় ৫৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক্ক দিতে হয়। ফলে ফ্রুট ব্যাগের দাম বেশি হওয়ায় প্রান্তিক চাষিরা ব্যাপকভাবে এটি ব্যবহার করছেন না। এইচএস কোড পরিবর্তন করে ফ্রুট ব্যাগ কৃষিপণ্য হিসেবে গণ্য হলে শুল্ক্ক কমে প্রায় ৫ শতাংশ হবে। এতে ব্যাগিংকৃত রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ আম উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়বে। এইচএস কোড পরিবর্তন না করলে ফ্রুট ব্যাগিং ব্যবহার করা কৃষকদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা যায় কৃষি অফিসের মাধ্যমে। দেশে ফল-মূল, শাকসবজিসহ কৃষিপণ্য রপ্তানিতে যত দ্রুত সম্ভব সারাদেশের কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে ভিএইচটি (ভ্যাপার হিট ট্রিটমপন্ট) প্লান্টসহ আধুনিক প্যাকিং হাউস নির্মাণ করতে হবে। এতে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিশেষ গতি সঞ্চার হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের যেভাবে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সেভাবে রপ্তানিযোগ্য ফসল উৎপাদনে জড়িত কৃষকদেরও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া দরকার।
বাংলাদেশ এখন কৃষিপণ্য উৎপাদনে (দানা শস্য, ফল, সবজি, মাছ, প্রাণিসম্পদ) অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বের সেরা দশের মধ্যে আছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানির অফুরন্ত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এ ছাড়া প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য আমদানি করতে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তা সাশ্রয় হবে।
বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি খাত। জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই স্মার্ট কৃষির দিকে আমাদের যেতে হবে। কৃষি খাতে আইওটিসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফল-ফসলসহ কৃষির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শস্য-কৃষি বীমার প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু করতে হবে। তবেই ভরসা পাবেন কৃষক, এগিয়ে যাবে এ দেশের কৃষি।
লেখক

কৃষি উদ্যোক্তা
জাতীয় যুব পুরস্কার ২০২১ প্রাপ্ত