আমরা কেন পিছিয়ে আছি? কেন পিছিয়ে থাকব? এ প্রশ্ন সামনে রেখেই এখন অনেকে সিনেমা তৈরি করছেন। যাতে করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের সিনেমাও আলাদা করে চেনানো যায়। গল্প আমাদেরও আছে, যা নিজেদের যাপিত জীবনের দৃশ্যপট তুলে ধরে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পর্দায় সেসব গল্প উপস্থাপনের ভঙ্গিতেও এসেছে পরিবর্তন, যা কয়েক বছর আগেও চোখে পড়েনি। তখন ভিনদেশি সংস্কৃতির অনুকরণেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন বেশির ভাগ নির্মাতা। তাদের যুক্তি, সাধারণ দর্শক যা পছন্দ করেন, সেটাই তারা তুলে ধরছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুগে যুগে বিশ্বজুড়ে সিনেমার ধরন বদলেছে কীভাবে? নির্মাতাদের কারণেই বদলেছে। তারা নানা রকম নিরীক্ষা চালিয়েছেন, যার মাধ্যমে বদলেছে দর্শক-রুচি। অবশ্যই সিনেমা বিনোদনের অন্যতম একটি মাধ্যম। কিন্তু বিনোদন দিতে আমরা কী উপকরণ তুলে ধরেছি, সেটা দেখার বিষয়; একই সঙ্গে ভাবার বিষয়ও বটে। আশার কথা হলো, এখন আমরা নিজেদের গল্প বলায় সাহসী হয়েছি। দর্শক-রুচি বদলে দেওয়ার প্রয়াসেই এখনকার নির্মাতারা এই সাহস দেখাতে পারছেন। এই সাহসী হয়ে ওঠার পেছনে অনলাইন বড় একটি ভূমিকা রাখছে- এটা অস্বীকারের উপায় নেই। যে সময়ে আমরা দেখছি, মন্দা ব্যবসার কারণে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নামতে শুরু করেছে, সে সময়েই অনলাইন এসেছে আশীর্বাদ হয়ে। আবারও তাই চলচ্চিত্র শিল্পী নিয়ে নতুন করে আশার জাল বুনতে শুরু করেছি আমরা।
২০২১ সালের শুরুতেও আমাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ছিল। যাদের বিনোদনের জন্য দিন-রাত একাকার করে আমরা কাজ করি, সেই মানুষগুলো কাছে আমাদের কাজ তুলে ধরতে পারছি না। তার চেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় ছিল, করোনা মহামারির জন্য অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়া। একে একে পরিচিত মানুষের চলে যাওয়া ছিল ভীষণ কষ্টের। তাই করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও চলচ্চিত্র অঙ্গনে যে প্রাণের স্পন্দন ছিল, তা খুঁজে পেতে আরও কিছুদিন সময় লেগেছে। যখনই আবার চলচ্চিত্র অঙ্গন সজীব হয়ে উঠতে শুরু করেছে, তখনই একটা বড় পরিবর্তন চোখে পড়েছে। জানি না, একটা বন্দি সময়ের পর মানুষের মনে কী উপলব্ধি হয়েছে, যার জন্য তাদের ভাবনাও বদলে গেছে। সবাই যার মতো করে নিজস্ব ভাবনা-সৃষ্টি তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অনলাইনও সুযোগ করে দিয়েছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত ভিন্ন ধরনের আয়োজন তুলে ধরার। তাই বেড়েছে মৌলিক গল্প নিয়ে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কাজ করার। আমার বিশ্বাস, ২০২২ সাল এবং তারও পরবর্তী সময়ে কাজের এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আর নিজেদেরও এই প্রশ্ন করতে হবে না, কেন আমাদের চলচ্চিত্র অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্র থেকে এত পিছিয়ে?
সংখ্যায় বেশি কি কম, তা দিয়ে শিল্পী বা নির্মাতার গুণ বিচার চলে না। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি কাজ করে যাচ্ছি। ২০২১ সালে আমার মাত্র একটি ছবি মুক্তি পেয়েছে, সেটা হলো 'মৃধা বনাম মৃধা'। এই ছবি নিয়ে দর্শকের যে প্রতিক্রিয়া, তা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়েছে যে, অনুভূতির দেয়ালে যদি কোনো ছাপ রাখা যায়, তা অনেক দিন পরেও চোখে পড়বে। তাই কী ধরনের কাজ করছি, সেটাই মুখ্য; সংখ্যা নয়। আমার চেষ্টা থাকবে, সব কাজের মধ্য দিয়েই সব শ্রেণির দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়া। সেটা অসম্ভব নয়, কারণ বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার মতো অনেকে এখন চলচ্চিত্র ভুবনে পা রেখেছেন। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পুরোনোদের ধ্যান-ধারণা। আত্মবিশ্বাসী হতে এর বেশি আর কী চাই।

লেখক

চলচ্চিত্র অভিনেতা