সন্ধ্যার পরপরই একটু জ্বর জ্বর ভাব লাগছিল। রাতের খাবারের পর রসায়ন দ্বিতীয় পত্রের চতুর্থ অধ্যায় 'তড়িৎ রসায়ন' পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে রাত ১২টা পেরিয়ে গেল। চারদিকে বাজি ফুটছিল। আর এভাবেই শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের আমার প্রথম প্রহরটি।
তখনও করোনার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি গোটা বিশ্ব। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো আমরা ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে নিশ্চিন্ত মনে ২০২১ উদযাপন করতে পারতাম। করোনা মহামারির কারণে আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয় আর জানুয়ারি মাসেই এসএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে রেজাল্ট প্রকাশ করা হয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসের মধ্যেই মেডিকেলসহ আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হয়ে যায়। অনেকেই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়; কিন্তু করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় অন্য ভর্তি পরীক্ষাগুলো পেছানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশের স্বপ্টম্ন অপূর্ণই থেকে যায়। শেষমেশ নভেম্বরের দিকে যথারীতি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভর্তি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
এদিকে, ২০২০ সাল থেকেই অনেক লম্বা সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল। কিছু কিছু স্কুল-কলেজ অনলাইন মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমগুলো চালু রাখে; যদিও দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এগুলো থেকে বঞ্চিত ছিল। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার সঙ্গে যুক্ত রাখতে সরকার অ্যাসাইনমেন্ট পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী অন্যজনের টাস্ক কপি করে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে উত্তর সংগ্রহ করে অ্যাসাইনমেন্টগুলো সম্পন্ন করে, যা কখনোই কাম্য ছিল না। আবার পরিবারের ভরণপোষণ মেটাতে অনেকের শিক্ষাজীবন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। বছরের শেষের দিকে স্বল্প পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যায়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়। অন্যান্য শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাগুলোও নির্দেশ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমিক শিক্ষার ভেতর একটা অসামঞ্জ্যতার সৃষ্টি হয়, যেটা সেশনজট সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটা বড় কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়।
গেল বছরে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছিল অনেকটাই স্তিমিত। লকডাউনের জাঁতাকলে পিষ্ট তরুণ সমাজ নিজেদের উৎপাদনশীল কাজে ঠিকভাবে নিয়োজিত করতে পারেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষককে তাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকে শিক্ষকতা ছেড়ে নিরুপায় হয়ে অটো চালানোকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন; যা আমরা সবাই পত্রিকায় দেখেছি। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে শিক্ষকরা হলেন মেরুদণ্ডের একেকটি হাড়। হাড়গুলো যদি সঠিক অবস্থায় না থাকে, তাহলে একটি জাতি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে কী করে? করোনার প্রকোপ কমে গেলেও এখনও থেমে যায়নি। শিক্ষার্থীদেরও গেল বছরের তুলনায় শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ততা কিছুটা হলেও বেড়েছে। আশা করা যায়, নতুন বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবার শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ ফিরে আসবে, তরুণ প্রজন্ম যার যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে পাবে। প্যান্ডামিকের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সৃষ্ট সেশনজট মোকাবিলা এবং স্কুল-কলেজে শিক্ষার ভারসাম্য আনার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। তবেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সামঞ্জস্য আনা সম্ভব হবে এবং তরুণ প্রজন্মও তাদের তারুণ্যের শক্তিতে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।
লেখক

বুয়েট, ঢাবি ও আইইউটির
ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী