দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সরকারকে এমন সব উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ব্যবসা করা সহজ হয়। এ জন্য তারা আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট আয়কর কমানো, অগ্রিম আয়কর নেওয়া বন্ধ করা, উৎসে আয়কর কমানো, ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ করা, নীতির ধারাবাহিকতা রাখা, সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতাসহ নানা উদ্যোগ চেয়েছেন। পাশাপাশি রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থা সহজ ও হয়রানিমুক্ত করারও প্রস্তাব করেছেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা করহার কমিয়ে করের আওতা বাড়িয়ে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আগামী অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর যৌথভাবে এর আয়োজন করে। ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমানের সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও সমাপনী বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন। তিনি সংবাদপত্র শিল্পের আয়কর কমানো, নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহারসহ বর্তমান সংকটে এ শিল্পে সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

সভায় আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আর্থিক খাত, শিল্প-বাণিজ্য এবং অবকাঠামো খাত- এই চার বিষয়ে আলাদা আলোচনা হয়। এসব বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব রাখা হয়। আয়কর ও ভ্যাট বিষয়ে ডিসিসিআই বলেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির দেওয়া লভ্যাংশ থেকে যে ১০ শতাংশ উৎসে কর নেওয়া হয়, তা চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয়, সব ধরনের কোম্পানির করপোরেট করহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমাতে হবে। করপোরেট ডিভিডেন্ড আয়ে কর ২০ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করতে হবে। কর ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় করারও প্রস্তাব এসেছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।

অন্যান্য বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- খেলাপি ঋণ কমানো, কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্পকে আলাদা করে সংজ্ঞায়ন করা এবং মাঝারি ব্যবসাকে আলাদা করা, স্থানীয় বাজারে পাটপণ্য বিক্রিতে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা আরও পাঁচ বছর বাড়ানো, অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমির লিজ মূল্যের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, একটি দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক নীতি প্রণয়ন ইত্যাদি।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন হচ্ছে। আরও যেসব উন্নয়ন দরকার, সেগুলো সরকারকে অবশ্যই করতে হবে। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। সরকারের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের আরও বেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমস্যা সব দেশেই আছে। বাংলাদেশে হয়তো তুলনামূলকভাবে বেশি। এক জায়গায় হাত দিতে গেলে ২০ জায়গা নড়ে ওঠে। সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ববাদী আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার মনে হয় কর্তৃত্ববাদিতা পছন্দ করে। তা না হলে এই সময়ে এসেও কেন বিভিন্ন সংস্থার নামে কর্তৃপক্ষ শব্দটি যুক্ত করা হয়। তিনি আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাব সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরবেন বলে আশ্বাস দেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অ্যাপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, যেখানে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। এসব শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে চাকরি পাবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, সবাইকে যাতে চাকরির খোঁজ করতে না হয়, তার জন্য ব্যবসার সুযোগ করে দিতে হবে। ব্যবসা করার পরিবেশ সহজ হলে দেশে এসএমই খাত বড় হবে।

বিশেষ অতিথি হিসেবে এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি সংসদ সদস্য সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, সব ব্যবসায়ী সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ চান। এ পরিবেশ দিতে হবে। এ ছাড়া করোনার সময়ে যেসব ছোট প্রতিষ্ঠান সরকারের সহযোগিতা নিতে পারেনি, তাদের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বাজেটে উদ্যোগ দরকার। উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি।

বিশেষ অতিথি এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাজেট প্রণয়নে এনবিআর ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করলেও বাজেটে তা প্রতিফলিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মতামত ছাড়াই নীতি নেওয়া হয়ে থাকে; যা অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি বলেন, অগ্রিম আয়কর কেটে রাখায় ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু এ কর শেষ পর্যন্ত সমন্বয় বা ফেরত দেওয়া হয়, সেহেতু কেটে না রাখলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।

এমসিসিআই সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, করপোরেট করহার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। গত দুটি অর্থবছরে কমানো হয়েছে। তবে আগামী বাজেটে আরও ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমাতে হবে। উৎসে কর কমানো এবং রিফান্ড নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দুর্দান্ত ও অদম্য। সহজে ব্যবসা করার পরিবেশ দেওয়া হলে ব্যবসায়ীরা দেশকে এগিয়ে নেবেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সহযোগিতা করতে চায় না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার। তিনি বলেন, শিল্প বহুমুখীকরণের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সরকারি দপ্তরের লোকেরা ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবে সহয়োগিতা করছেন না।

বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরের জমির লিজে ভ্যাট আছে। বিনিয়োগের স্বার্থে এ ভ্যাট প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা ও ইউটিলিটি খরচ কমানোর উদ্যোগ দরকার।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, কোনো নীতি খণ্ডকালীন করা উচিত নয়। বর্তমানে নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করতে হচ্ছে। কিন্তু নতুন কিছু আমদানি করতে গেলেই এইচএস কোডের জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এ জটিলতা দূর করতে হবে। ব্যবসায়ীদের ঘাটে ঘাটে দৌড়ানোর পরিবেশ দূর করা না গেলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ব্যবসাকে করোনার আগের জায়গায় নেওয়ার উদ্যোগ দরকার। এ জন্য কর কমাতে হবে। পুঁজিবাজারে এসএমই প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিকে বেগবান করতে প্রণোদনা দিতে হবে।
ইফাদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিন আহমেদ বলেন, অটোমোবাইল শিল্পে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা দরকার।

এনবিআরের সাবেক সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হবে দেশ। তখন আমদানি পর্যায়ে অনেক রাজস্ব কমবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্বের জোগান দিতে হবে। ফলে ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার। এনবিআর ভ্যাট আইন এবং অগ্রিম আয়কর বিষয়ে বাজেটে নতুন করে ভাববে বলে তিনি আশা করেন।
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান বলেন, ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে বের করতে হবে। সেজন্য বন্ড মার্কেট উন্নয়ন করতে হবে। সঞ্চয়পত্রে সুদ বেশি থাকায় বন্ড বাজার দাঁড়াচ্ছে না। মিউচুয়াল ফান্ডও আকর্ষণীয় হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাত বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন পূরণ করে থাকে। ব্যাংক খাত থেকে বিদেশি সংস্থা ও সঞ্চয়পত্রের তুলনায় সুবিধামতো সহনীয় পর্যায়ে অর্থ পাওয়া যায়।
ফিকি সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয় বলেন, একদিকে পণ্যমূল্য বাড়ছে। অন্যদিকে রিজার্ভ কমে আসছে। এ অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ঠিক রাখতে সভরেন বন্ড ইস্যু করা দরকার। পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার উন্নয়নে উদ্যোগ দরকার।

অ্যালায়েন্স হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী জওহর রিজভী বলেন, বর্তমানে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে প্রণোদনা দিয়ে ও কর কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

এক্সপো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম বলেন, লজিস্টিক বাবদ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে খরচ বেশি। আগামী পাঁচ বছরে সমুদ্রগামী রপ্তানি দ্বিগুণ হবে। ফলে লজিস্টিকসের চাহিদা বাড়বে। এ বিষয়ে এখনই একটি নীতিমালা দরকার।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসিং অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি নাভিদুল হক বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য বিতরণ ব্যবস্থায় উন্নয়ন দরকার।

অন্য আলোচকরা করপোরেট ডিভিডেন্ট আয়ের ওপর কর কমানো, টার্নওভার করের ঊর্ধ্বসীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীতকরণ, কর রিফান্ড সহজ করা, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে নমনীয় ভ্যাট হার, বন্ড বাজার শক্তিশালী করা, এসএমই খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনাসহ বিভিন্ন দাবি জানান।

সভায় আরও বক্তব্য দেন ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক তালহা ইসমাইল বারী, ঢাকা চেম্বারের পরিচালক ব্যারিস্টার সামি সাত্তার, ইশমত জেরিন খান, জিয়া উদ্দিন ও খায়রুল মজিদ মাহমুদ।