বাংলাদেশের কাছে সুলভ মূল্যে সমরাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রয়োজনে এ জন্য ঋণ সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে বিশ্ব সমরাস্ত্র বাজারের শীর্ষতম দেশটি। জবাবে বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও আলোচনা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সহযোগিতার অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে প্রশান্ত-ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি'তে (আইপিএস) অংশগ্রহণের জন্যও বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবেও বাংলাদেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এবং আইপিএস যেন কোনো প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার জন্য ব্যবহূত না হয়, সে বিষয়ে ঢাকার আগের অবস্থান আবারও ব্যক্ত করেছে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সময় গত বুধবার মধ্যরাতে (ওয়াশিংটন সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা) অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি বনি জেনকিন্স।

আগে এ বৈঠক পররাষ্ট্র দপ্তরের মহাপরিচালক পর্যায়ে থাকলেও এবারই প্রথম সচিব পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একে বৈঠকের গুরুত্ব বৃদ্ধি বলে মূল্যায়িত করছেন। তারা বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে বাংলাদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব ইতিবাচক এবং এটা প্রমাণ করে, ইউক্রেন সংকট পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় এ অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশের পূর্ব অবস্থান ঠিক রেখে আইপিএসের অর্থনৈতিক প্যাকেজের সুযোগ গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও তারা মত দিয়েছেন।

আলোচনার সারাংশ :সংশ্নিষ্ট একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, প্রায় সাত ঘণ্টার বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরিই সুলভ মূল্যে বাংলাদেশে সমরাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়; একই সঙ্গে ঋণ সহায়তারও। বৈঠকের প্রথম দুই ঘণ্টা এ বিষয়েই আলোচনা চলে। বাংলাদেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও প্রস্তাবটি এখনও আলোচনার পর্যায়েই থেকে গেছে।

আলোচনার প্রয়োজন সম্পর্কে বৈঠক-সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে গৃহীত 'ফোর্সেস গোল' অনুযায়ী সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উন্নত সমরাস্ত্র সংগ্রহে বিভিন্ন উৎসের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমরাস্ত্র কিনতে হলে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট) এবং জিসোমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমরাস্ত্র কেনার পূর্বশর্ত হচ্ছে জিসোমিয়া স্বাক্ষর করা। এর আগে গত মাসে ঢাকায় অংশীদারিত্ব সংলাপে জিসোমিয়ার খসড়া হালনাগাদ করা হয়েছে। বুধবার রাতের নিরাপত্তা সংলাপেও জিসোমিয়ার সবশেষ খসড়া নিয়ে কথাবার্তা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ চুক্তির প্রক্রিয়া দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ ঢাকায় আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানায়।

সূত্র জানায়, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজসহ নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইপিএসে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত উপাদান রয়েছে। বাংলাদেশ এই উদ্যোগের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র খুশি হবে। এর জবাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আরও আগে থেকেই বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে বাংলাদেশ আইপিএসের অর্থনৈতিক উপাদানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বিশেষ করে বাংলাদেশ চায়, আইপিএসের মাধ্যমে সমুদ্রপথে অবাধে ও নিরাপদে পণ্যের সরবরাহের বিষয় নিশ্চিত হোক। একই সঙ্গে আইপিএস যেন কোনো পক্ষকে প্রতিহত করার জন্য ব্যবহূত না হয়, তা নিশ্চিত করা।

সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা, সন্ত্রাস দমন, যৌথ সামরিক মহড়া এবং সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা। এর বাইরে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এ বিষয় আলোচনায় বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে র‌্যাবের অপরিহার্যতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে তিনি র‌্যাবের কোনো সদস্য অপরাধে যুক্ত হলে তার যথাযথ বিচারের ব্যাপারেও নিশ্চয়তা দেন। পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে আর কোনো বক্তব্য আসেনি বলেও সূত্র জানায়।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য :নিরাপত্তা বিশ্নেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুলভ মূল্যে সমরাস্ত্র বিক্রির এই প্রস্তাবটির দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক আছে। প্রথমত, এ প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে এ মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ- এটা প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ইউক্রেন সংকট পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, নিরাপত্তা কৌশলের জন্য বিশেষভাবে গঠিত 'কোয়াডে'র অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটা ভাগ আছে। কোয়াড তথা চতুর্ভুজ সুরক্ষা সংলাপের দেশ চারটি হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। আবদুর রশিদ বলেস, ইউক্রেন সংকট প্রশ্নে দেশগুলোকে দু'ভাগে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে সেটা স্পষ্ট হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে আরও নিবিড় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাচ্ছে।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের কোনো অবস্থাতেই সমরাস্ত্রের জন্য কোনো দেশের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। যেমন- সমরাস্ত্রের জন্য চীনের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হয়ে গেলে বাংলাদেশের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নির্ভরতা তৈরি হয়। এটা অবশ্যই হওয়া উচিত নয়। একাধিক উৎস থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ করা হলে সেটা নির্ভরতা না বাড়িয়ে বরং বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা অনেক দৃঢ় করবে। এখন পর্যন্ত বিশ্ব সমরাস্ত্রের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বরে আছে এবং তাদের অস্ত্রের প্রযুক্তি রাশিয়া কিংবা চীনের চেয়ে অনেক উন্নত। তাদের কাছ থেকে সুলভ মূল্যে অস্ত্র সংগ্রহ করা হলে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিতে প্রাধান্য দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই নিজেদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয় জোরালোভাবে তুলে ধরে; কিন্তু অন্য পক্ষের স্বার্থের প্রসঙ্গ এলে তা গ্রহণ কিংবা অগ্রহণ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান জানায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে অস্ত্র সংগ্রহের প্রস্তাব ইতিবাচক; কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, এর আগে সাতটি নিরাপত্তা সংলাপ হয়েছে মহাপরিচালক পর্যায়ে। এবার সেটা সচিব পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ফলে এ বৈঠকের কূটনৈতিক গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বৈঠকে সাশ্রয়ী দামে সমরাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবটা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। কম দামে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র পাওয়া বাংলাদেশের জন্য লাভজনক। এখানে চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে। বৈঠকে যে বাংলাদেশ আরও আলোচনার কথা জানিয়েছে, সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়ত, আইপিএসের ক্ষেত্রে যে অর্থনৈতিক প্যাকেজের প্রস্তাব এসেছে, সেটাও ইতিবাচক। আইপিএস নিয়ে বাংলাদেশ আরও আগে থেকেই এর অর্থনৈতিক উপাদানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে এবং এটি যেন প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলেছে। বাংলাদেশের এ অবস্থানটিই যৌক্তিক এবং অর্থনৈতিক প্যাকেজের প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রেও এ অবস্থান ধরে রাখতে হবে। এর বাইরে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেসব বিষয় এর আগে ঢাকায় অংশীদারিত্ব সংলাপে আলোচনা হয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকেও হয়েছে। ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাগুলোতেও প্রসঙ্গগুলো আসবে। একটা বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করা বাংলাদেশকে লাভবান করবে।