মা শীতলার রথ এয়েছে
কদমতলার ভাঙ্গরে।
ফুল পুষ্প দিয়ে আমরা
পূজব মায়ের চরণে।
হরি ঠাকুরের রথ এয়েছে
কদমতলার ভাঙ্গরে।
এ রথ আমরা পূজব কেমনে?
গণপতির রথ এয়েছে
কদমতলার ভাঙ্গরে।
এক সময় ষড়ঋতুর আবাহন ও সমাপনী আন্দাজ করতে পারত মানুষের সমাজ। প্রতিটি ঋতুর সন্ধিক্ষণের পরম্পরা ও পরিবর্তন তাই মানুষের সমাজে গড়ে তুলেছিল নানা কৃত্য-আঙ্গিক। সেইসব কৃত্যরীতি সামাজিক পরিবেশন ও রূপান্তরের ভেতর দিয়ে কখনও উৎসবমুখর আমেজ তৈরি করে। ব্যক্তি, পরিবার, গ্রাম ও সমাজের মঙ্গল কামনা থেকে শুরু করে অসুখ-বিসুখ ও প্রাত্যহিক সুস্থতায় এসব কৃত্য-আচার একটা সময় মানুষের সমাজের সঙ্গী হয়ে ওঠে। আবার দেখা যায়; আপদ-বিপদ, দুর্যোগ, সংকট কি মহামারির মতো নিদারুণ প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা সামাল দেওয়ার ভেতর থেকেও কখনও কখনও কোনো স্থানীয় কৃত্য একটা সময় ভূগোল ও সমাজে বিস্তৃত হয়, সর্বজনীন হয়ে ওঠে। মানুষ এসব মহামারি ও সংকট থেকে জীবন ও জনপদ দূরে রাখতে চায়। তাই কৃত্যসমূহ এক সময় সামাজিক প্রার্থনার চেয়েও উৎসবমুখর পরব হয়ে ওঠে। যেমন, মান্দি সমাজের মহামারি কৃত্য দেনমারাংআ কিংবা মাল পাহাড়িয়া সমাজের মহামারি কৃত্য পুন্টাডি। আবার কখনও কখনও কোনো কোনো মহামারিকালের বা মহামারি সামালের কৃত্য একেবারেই বিলীন হয়ে যায়। কিংবা তার রূপ ও আঙ্গিক আমূল পরিবর্তিত হয়ে ওঠে। অন্যান্য রোগের চাইতে বসন্ত, কলেরা, যক্ষ্ণা, কুষ্ঠ, কালাজ্বর রোগ দেশের শারীরিক, মনোজাগতিক ও রাজনৈতিক স্বরলিপি নির্মাণকে বারবার নির্দেশিত ও শাসন করেছে বেশি। একেক কালে একেক ধরনের রোগ-শোক ও মহামারি মোকাবিলার ভেতর দিয়েও বিকশিত হয়েছে এই জনপদের জনসাংস্কৃতিক ভূগোল। ২০২০ সাল থেকে পৃথিবী পাড়ি দিচ্ছে এক নিদারুণ মহামারিকাল, কভিড-১৯ বা করোনা মহামারি। কিন্তু এখনও দেশের নিম্নবর্গের স্মৃতিতে টগবগ হয়ে আছে দুঃসহ কলেরা ও বসন্তের ক্ষত। কলেরা মহামারি সামালে শুরু হয়েছিল ওলাইচন্ডি কৃত্য, কোথাওবা ওলাবিবির মানত। ঠিক যেমন বসন্ত মহামারি সামালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শীতলা পূজা বা পরবের মতো জনকৃত্য। উল্লিখিত মহামারি দুটির একটিও এখন মহামারি হিসেবে নেই, তবে কলেরা আছে। জলবসন্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিস্ময়করভাবে কলেরা সামালের ওলাবিবি কৃত্য আজ আর বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে আয়োজিত হয় না, কিন্তু শীতলা পরব এখনও টিকে আছে। দেশের বহু স্থানে 'শীতলা দেবীর থান' আছে। শীতলা থানগুলো এখনও গ্রামীণ সর্বধর্মের মানুষ যথাযথভাবে সুরক্ষিত রেখেছেন। চলতি আলাপখানি বসন্তবিনাশী কৃত্য শীতলা পরব নিয়ে। চলমান করোনা মহামারিকালে আরেক মহামারি সামালের সামাজিক কৃত্যের বয়ান নিয়ে। ফাল্কগ্দুন-চৈত্র এই দুই মাস বাংলার স্বাস্থ্যজীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের চিহ্ন রেখেছে। বসন্ত, কলেরা, চুলকানি, খোস-পাঁচড়া থেকে শুরু করে নানাবিধ অসুখের খতিয়ান আছে বসন্তকালে। তাই দেখা গেছে এই সময়ে শীতলা, হেঁচড়া, ঘাটাবান্ধা, সারহুল পরবগুলো আয়োজিত হয় রোগমুক্তি ও সমাজের সুস্বাস্থ্য প্রার্থনায়।
কলকাতার দে'জ পাবলিকেশন্স থেকে ১৯৮৭ সালে পুনর্মুদ্রিত গোপেন্দ্রনাথ বসুর 'বাংলার লৌকিক দেবতা' পুস্তকে ওলাইচন্ডি ও ওলাবিবির বর্ণনা আছে। '...সাধারণত বমি বা দাস্ত বা বিসূচিকা বা কলেরা রোগ না হওয়ার জন্য এর পূজা করা হয়। লেখক আরো বর্ণনা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবর্ণ হিন্দু-মুসলিমরা ওলাবিবির সাথে তার বোন ঝোলাবিবিকে হাম-বসন্ত রোগের অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে পূজা বা হাজোত দিয়ে থাকেন।' বাঙালি জনপদে শীতলা মূলত বসন্ত রোগহরণকারী দেবী হিসেবে পূজিত হন। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে কি হিন্দু কি মুসলিম সমাজ শীতলা, মনসা, ওলাবিবি, বনবিবি, খোয়াজখিজির, সত্যপীরকে শ্রদ্ধা করেন। তাদের ঘিরে আয়োজন করেন ঋতুভিত্তিক উৎসব। শীতলা দেবীকে ঘিরে বাংলাদেশের নানান প্রান্তে মূলত ফাল্কগ্দুন-চৈত্র মাসে জমে ওঠে গ্রামীণ উৎসব।
শীতলা পূজা ঘিরে নরসিংদী, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, সাতক্ষীরাসহ দেশের নানা প্রান্তেই জমে ওঠে রকমভিন্ন আয়োজন ও মেলা। গ্রামে গ্রামে শ্যাওড়া, বট, অশ্বত্থ, পাকুড়, ষষ্ঠী বট, খেজুর, বকুলতলায় গড়ে উঠেছে শীতলাতলা ও শীতলা থান। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর গ্রামে এখনও টিকে আছে এক অনন্য শীতলাতলা। এক সময় এ এলাকার মালিকানা ছিল নটবর মণ্ডলদের। তখন জোয়ারভাটার অরণ্যের মতোই ছিল এ এলাকা। বর্তমানে এই শীতলাতলা মাত্র পাঁচ-ছয় কাঠা জমিতে এসে ঠেকেছে। নকিপুর গ্রামের কমলা রানী চক্রবর্ত্তী শিশুকাল থেকে এ তলা দেখে আসছেন। তিনি জানালেন, ... আগে এখানে অনেক গামু (গেওয়া), জীবলি, তেঁতুল গাছ ছিল। নানান রকম পাখি ছিল, কুঁচলতা ছিল। বাদার (সুন্দরবন) মতো এ জায়গা বাইরের মানুষের অত্যাচারে নির্বংশ হতে চলছে। বর্তমানে এক মাঝারি আকারের মধ্যবয়স্ক ষষ্ঠীবট, জীবলি, বকুল, খেজুর, ফণীমনসা ও লতানো ঝোপ নিয়ে শীতলাতলাটি টিকে আছে। আগে চৈত্র মাসে এখানে ঘটা করে শীতলার মেলা বসত। এখন নিত্যসময়ের মানতের জন্য আসা ছাড়া শীতলা ও হরি ঠাকুরের পূজাতেই এখানে গ্রামীণ উৎসব জমে। এই শীতলাতলার ধারেই ক্ষয়াটে এক বাগদীপাড়া। এখানকার শীতলা পূজার মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাগদী নারীদের নিজস্ব শীতলা গীত। স্থানীয় বাঙালি হিন্দুদের ভাষ্য, বাগদী নারীরাই কেবল শীতলা পূজার এই বিশেষ গীতগুলো জানেন। যখন গাছতলায় পূজা হয় তখন দূরে বসে প্রবীণ এই নারীরা নিজেদের মতো শীতলা পূজার গান করেন। তাদের গান ছাড়া এই পূজা হয় না।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর গ্রামে এক ছোট্ট বাগদীপাড়ার কালীদাসী রাজবংশী (মা-দুর্গা দাসী, বাবা-মাদার মোড়ল, বয়স-৭১), হাসী দাসী (মা-ভদি দাসী, বাবা-বনচারী মোড়ল, বয়স-৭৭) এবং নিরু মণ্ডল (মা-পাঁচী মোড়ল, বাবা-বিনোদ মোড়ল, বয়স-৭৮) শীতলা পূজার গান জানেন। বংশপরম্পরায় তারা শীতলা পূজার গান গেয়ে ফাল্কগ্দুন-চৈত্র মাসে বসন্ত রোগ বিনাশের জন্য প্রকৃতির কাছে সামাজিক প্রার্থনায় মগ্ন হন। পেশায় এরা সবাই মজুরি খাটেন ও কৃষিকাজ করেন।
১.
চল সখীরে দেখে আসি গে
নিতাই লৌকার পত্র দিয়াছে।
ও আমার গৌর বলে ডেকেছে (২)
মা শীতলার পানসী এয়েছে।
চল সখীরে দেখে আসি গে
ঐ আমার গৌর বলে ডেকেছে (২)
ঐ আমার হরি ঠাকুরের পানসী এয়েছে
চল সখীরে ...

২.
একি আতা গাছেতে
একটি তোতা বয়েছে
উড়ে গেল ও মোর পাখির বাসা
পড়ে রয়েছে।
ও আমার মা শীতলার
মোহন বাঁশি বামে হেলেছে।
এটি রাস্তা দিয়েছে
তাতে আমরা মজরি খাটতেছে
উড়ে গেল ও মোর পাখির বাসা
পড়ে রয়েছে।

এটি পুকুর দিয়েছে
তাতে আমরা পুকুর কাটিছে
তাতে পদ্ম ফুটিছে
উড়ে গেল ও মোর পাখির বাসা
পড়ে রয়েছে।

৩.
হাম বসন্ত উঠল তাতে
ফুল ছড়াল সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।

মা শীতলা উঠল রথে
ফুল ছড়াল সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।

হরি ঠাকুর উঠল রথে
ফুল ছড়াল সকল পথে
এ ফুল যাবে মায়ের চরণে।

৪.
মা শীতলার হাতের বাঁশি
উড়েছে মোর ভ্রমরা
কোন বনে হারালাম বাঁশি বল না? (২)

বনে বনে খুঁজলাম বাঁশি
বাঁশির সন্ধান পেলাম না
কোন বনে হারালাম বাঁশি বল না? (২)


হরি ঠাকুরের হাতের বাঁশি
উড়েছে মোর ভ্রমরা
কোন বনে হারালাম বাঁশি বল না? (২)

ও মোর রসনা
কোন বনে হারালাম বাঁশি বল না? (২)
বনে বনে খুঁজলাম বাঁশি
বাঁশির সন্ধান পেলাম না।

৫.
কমল তুলিতে কৃষ্ণ কালীদ্বয় গেছে
পদ্ম তুলিতে কৃষ্ণ কালীদ্বয় গেছে
ও সে বামে হেলে রয়েছে
কৃষ্ণর হাতে দেখি মোহন বাঁশি
ও সে রাধা রাধা বলতেছে
কমল তুলিতে ...

শীতলা দেবীকে ঘিরে বাংলাদেশের নানান প্রান্তে মূলত ফাল্কগ্দুন-চৈত্র মাসে জমে ওঠে গ্রামীণ উৎসব


সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর কদমতলা-ফুলতলার শীতলাতলাটি মোট ২৫ কাঠা সামাজিক জমি নিয়ে। আম-কড়ই-বাঁশঝাড়, রাসমন্দির, শীতলা মন্দির ও পুকুর থাকলেও এখানে গ্রামীণ বনের মেজাজ কম। এই শীতলা পূজায় গিয়ে দেখা গেল হাঁটু গেড়ে বসে থাকা রক্তিম-হলুদ এক গাধার পিঠে (যদিও তা দেখতে ষাঁড় গরুর মতো) গাঢ় গোলাপি রঙের শাড়ি পরে বসে আছেন শীতলা দেবী। লাল-হলুদের মিশালে তার গায়ের রংকে স্থানীয় নারীরা বললেন, 'মিষ্টি রং'। তার বাম হাতে মাটির কলস এবং ডান হাতে ঝাঁটা। শীতলা দেবীর সারা শরীরে বসন্তের গুটি দাগ থাকে। সুন্দরবন সংলগ্ন বাঙালি হিন্দু গ্রামগুলোতে একটি পবিত্র পুকুর সামাজিক পুকুর থাকে। পূজা-পার্বণ, সামাজিক কাজ ছাড়া কেউ ওই পুকুরের জল ব্যবহার করে না। স্থানীয়ভাবে ঐ পুকুরগুলোই 'উছরাকরা পুকুর' নামে পরিচিত। মাটির কলসে 'উছরাকরা' পুকুরের জল থাকে। পূজার পর তা সবাইকে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কেউ কেউ শিশি-বোতলে ভরে তা নিয়ে যায়। ঘরদুয়ার, গোয়ালঘর, আঁতুড়ঘরসহ গ্রামে গ্রামে তা ছিটিয়ে দেওয়ার নিয়ম, যাতে গ্রামে বসন্ত রোগ ঢুকতে না পারে। বসন্ত তাড়াতে শীতলা মায়ের ঘটির জল দিয়ে গ্রাম বান্ধা হয়। উত্তর কদমতলায় শীতলার প্রতিমা বানালেও মাত্র ১৫ কিলোমিটার ব্যবধানে নকিপুর শীতলাতলার উৎসবেই তা ভিন্ন রকম। এখানে কোনো মাটির প্রতিমা বানানো হয় না। নকিপুর গ্রামের প্রবীণ গৃহস্থ জ্যোতির্মণ্ডল (৮২) জানান, আমরা এখানে কোনো সময়েই শীতলার মূর্তি দেখি নাই। এখানে আগে একটি শীতলার ঘট ছিল। ২০ বছর হয় হরিঠাকুরের নামেও এখন একটি ঘট বসানো হয়। সোনামুগারী গ্রামের পুরোহিত খগেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী (৭১) প্রায় ৪২ বছর ধরে নকিপুর শীতলাতলায় পূজা করছেন। তিনিও জানান, নকিপুর শীতলাতলায় কখনোই মূর্তি দিয়ে শীতলা পূজা হয়নি। তার মতে, এটি বৃক্ষ পূজা। এইখানে শীতলাতলা জাগ্রত আছে; আমরা থানের পূজাই করতেছি।
শীতলা পূজায় ১০৮টি মাটির ছোট প্রদীপ লাগে। বিল জমিনের মাটি দিয়ে বাড়ির প্রবীণ নারীরাই এটি তৈরি করে কুলা-ডালায় পূজার থানে নিয়ে আসেন। সলতের জন্য লাগে কাপাস তুলা। প্রায় বাড়িতেই কেবল পূজার জন্য এখনও কাপাস তুলা সংরক্ষণ করছেন কেউ কেউ। একটি দেবী ঘট, একটি ফুল-জলের হাঁড়ি লাগে। এতে দুধ-বাতাসা-বেলপাতা-তুলসীপাতা-ডাবের জল মিশানো হয়। পূজার পরে সবাইকে এটি খেতে দেওয়া হয়। কেউ কেউ এটি শরীরে মাখেন। কাঁচা, আধপাকা বেল, মৌসুমি ফলমূলসহ নানান খাবার ও পূজার উপকরণ লাগে। বর্ণ ব্রাহ্মণ পুরোহিত অন্যান্য শাস্ত্রীয় পূজার মতোই মন্ত্রপাঠ ও হোম যজ্ঞ করে শীতলা পূজা করেন। পূজা শেষে হোম যজ্ঞের কালি ও ঘি একত্রে মিশিয়ে সবার মাথা-কপালে লাগানো হয়। প্রসাদ ও শীতলার লুট দেওয়া হয়। শীতলার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। পরের বছর তা কোনো পবিত্র স্থানে রাখা হয় এবং আবার নতুন প্রতিমা গড়া হয়।

ঘটনা :১
গীতিকা রানী বাউলিয়া (৪০)
বাবা-কৃষ্ণপদ মণ্ডল
মা-পারুল রানী
স্বামী-রবিপদ বাউলিয়া
অর্পিতা মণ্ডল (আড়াই বছর) ও নন্দিতা মণ্ডলের (এক বছর ৩ মাস) মা গীতিকা রানী বাউলিয়া (৪০) ১৪১৭ বাংলায় অর্পিতার জন্য দণ্ডি খাটেন। অর্পিতা জন্মের পর ছয় মাসের সময় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে থাকত। শরীরে কোনো তাপ ছিল না। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে তিনি শীতলা মায়ের কাছে দণ্ডিখাটি মানসি করেন। ১৪১৬ বাংলায় একবার দণ্ডি খাটেন প্রথম। তারপর শেষ দণ্ডি খাটেন ১৪১৭ বাংলার শীতলা পূজায় উত্তর-কদমতলায়।

ঘটনা :২
অঞ্জনা রানী রপ্তান (২৬)
বাবা-ঠাকুরপদ বাউলিয়া
মা-প্রমীলা বাউলিয়া
স্বামী-হিরণ্ময় রপ্তান
অঞ্জনা রানী রপ্তানের (২৬) একমাত্র সন্তান তৃষা রানী রপ্তানের বয়স প্রায় আড়াই বছর। ৯ মাস আগে তৃষার সারা শরীরে এক ধরনের ঘা হয়। তখন তিনি মানত করেন, ঘা ভালো হলে শীতলার থানে বাতাসা লুট দেবেন। তৃষার ঘা সেরে যাওয়ায় তিনি ১৪১৭ বাংলায় উত্তর-কদমতলার শীতলা পূজায় বাতাসা লুট দেন।

ঘটনা :৩
অর্চনা রানী জোয়ারদার (৩৫)
বাবা-শিখন গায়েন
মা-কিরণ গায়েন
স্বামী-রমেশ চন্দ্র গায়েন
অর্চনা রানীর মেয়ে মমতা গায়েনের বয়স তিন বছর। ছোটবেলা থেকে তার শরীর শুকনা ছিল। মনে হতো পুষ্টির অভাব। দুই-তিনবার চোখ উল্টে মরে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। তিনি মানত করেছিলেন, মাটির প্রদীপ ও বাতাসা লুট দেবেন। এখন মমতার স্বাস্থ্য বেশ ভালো। ১৪১৭ বাংলায় তিনিও বাতাসা ও মাটির প্রদীপ নিয়ে এসেছিলেন শীতলার থানে উত্তর-কদমতলায়।

ঘটনা :৪
রীতা রানী বাউলিয়া (৪৫)
বাবা-বিমল কৃষ্ণ সরদার
মা-সীতা রানী সরদার
স্বামী-রজনীকান্ত বাউলিয়া
রীতা রানীর মেয়ে ইন্দ্রানী ব্যাপারী ও সুকুমার ব্যাপারীর বিয়ের পর তাদের কন্যা স্বস্তিকা ব্যাপারীর জন্মকালীন ত্রুটি ছিল। বাচ্চা জন্মের সময় চোখ ফোটেনি, শরীর তুলতুলে ছিল। রীতা রানী তার নাতনির জন্য দণ্ডিখাটার মানসি করেন। স্বস্তিকার বয়স এখন দুই বছর। এখন তার কোনো অসুখ নেই। ১৪১৭ বাংলায় রীতা রানী স্বস্তিকার জন্য সাতবার দণ্ডি খাটেন উত্তর-কদমতলার শীতলা উৎসবে।
সাতক্ষীরার সুন্দরবন অঞ্চলের শীতলা পূজা পালনকারীদের মতে, মানুষের হাম-বসন্ত-পাতলা পায়খানা ও জ্বর হলে এবং গরু-ছাগলের পশ্চিমে-গায়ে গুটি বের হলে, সর্দি লাগলে, পাতলা পায়খানা করলে শীতলা পূজার মানসি (মানত) করা হয়। দণ্ডিখাটি বা দণ্ডিখাটা, ধুনা পোড়ানো, বাতাসা লুট, বুক চিরে রক্ত বের করা, হাতে আগুন নেওয়া, যার জন্য মানত তার শরীরের ওজনে ভোগ দেওয়া, শীতলাতলার বৃক্ষকে দুধ-ডাবের জল দিয়ে স্নান করানো এ রকম নানান মানত পর্ব ঘিরেই জমে ওঠে দক্ষিণাঞ্চলের শীতলা পরব। মাটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে শরীর টেনে টেনে শীতলাতলার চারধারে ঘোরাকেই দণ্ডিখাটি বলে। কেউ একবার কেউ সাতবার বা তারও কমবেশি যার যেমন মানত ততবার দণ্ড খাটে। পুকুরে স্নান করে এসে ভিজা শরীর ও কাপড়ে এই দণ্ড খাটতে হয়। সাধারণত নারীরাই তার নিজের বা পরিবারের কারও সন্তানের জন্য এই দণ্ড খাটেন। এর ফলে নাক-মুখ, শরীর মাটির ঘষা খেয়ে ছুলে যায়। ধুনোপুড়ি পর্বে ভেজা কাপড়ে পদ্মাসনে বসতে হয়। দু'হাতে মাথা এবং মুখে মাটির সরায় নারিকেল ছোবড়া দিয়ে লাগানো আগুন ধরে রাখতে হয় কয়েক মিনিট পর্যন্ত। এটিও নারীরা করেন। গাছকে দুধ ও ডাবের জল দিয়ে স্নান করান নারীরাই। রোগ ভালো হলে বা রোগ ভালো হওয়ার জন্য এসব মানত করা হয় এবং কোনো না কোনো বছর যখন সাধ্যে কুলায় তখন তা পালন করা হয়। শীতলা পূজার সময় সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে বিবাহিত মেয়েরা মা-বাবার বাড়িতে নাইয়র আসে। শীতলাকে ঘিরে তখন শীতলাতলাসহ গ্রামজুড়ে এক উৎসবমুখরতা তৈরি হয়, যা বসন্তসহ মহামারিকালের অসুখ ও রোগের বিরুদ্ধে গ্রামীণ জনপদের এক জনস্বাস্থ্য কৃত্য।

লেখক
গবেষক
প্রাবন্ধিক