'আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন মুক্ত সীমারেখা'- এমন অনুভবই তো জেগে ওঠে আমাদের মধ্যে আজকের এই দিনে; এই পহেলা বৈশাখে। কবি জীবনানন্দ দাশের মগ্ন চৈতন্যে দুলে ওঠা ওই মৃত্যুবিহীন মুক্ত সীমারেখায় আমরা দাঁড়িয়ে থাকি মুক্ত মায়া নিয়ে, মুগ্ধ-হৃদয় চেয়ে। আকাশে-বাতাসে আন্দোলিত হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের এই আহ্বান, 'তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে'। কালবৈশাখীতেও হৃদয়ে তরঙ্গিত হয় বিদ্রোহী নজরুলের উজ্জ্বল উল্লাস, 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর'।

এবার এই নতুন বাংলা সনে, ১৪২৯ বঙ্গাব্দের নতুন সূর্যোদয়ে এসে মিশেছে দেশের মানুষের প্রতিবাদী জাগরণের ঢেউ। নতুন সূর্যোদয়পূর্ব তীব্র ঝঞ্ঝামুখর কয়েকটি সপ্তাহে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও অনুভব করেছি, বাংলা নববর্ষ বাধাবন্ধনহীনভাবে উদযাপনের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। সংহতি, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুগভীর লৌকিক আদল নির্মাণের পরও এ দেশের জনগোষ্ঠীগুলোকে লড়াই করতে হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, অজ্ঞানতা, মৌলবাদিতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে। লড়াই করতে হচ্ছে প্রগতির ছদ্মাবরণে থেকে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় মত্ত শক্তির বিরুদ্ধেও।

মুন্সীগঞ্জে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কারাগারে পাঠানো কিংবা নওগাঁয় স্কুলশিক্ষক আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে হিজাব পরা ছাত্রীদের মারধরের অভিযোগ তোলার ঘটনাগুলো আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- এসব ঘটনা নোংরা শিক্ষক রাজনীতির স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহারের অপপ্রয়াস, লুটপাটতন্ত্রকে নির্বিঘ্ন করার উদ্দেশ্যে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকে বিভেদের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপপ্রয়াস। একইভাবে টিপ পরা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার ঘটনা কেবল অজ্ঞানতার নয়, প্রতিক্রিয়াশীলতারও ফসল। এসব ঘটনার পথ ধরে এবারও নববর্ষ উদযাপনের বিরুদ্ধে আটঘাট বেঁধে অপপ্রচারে নামতে দেখা গেছে প্রতিক্রিয়াশীলদের। যদিও এটি সুবিদিত, অন্ত্যজ বাঙালি জনগোষ্ঠী দূর অতীতকাল থেকে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের লৌকিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে চৈত্রসংক্রান্তি, হালখাতা উদযাপনের মধ্য দিয়ে। আর ভারত বিভক্তির পর ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের জনজাগরণকালে নববর্ষের উদযাপন পরিব্যাপ্ত হয়েছে নগর-পরিমণ্ডলেও।

বিশেষত ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বিষয়টিকে পাকিস্তানবাদী বুদ্ধিজীবীরা 'অখণ্ড বাংলার আড়ালে তামদ্দুনিক জীবনের বিপদ' হিসেবে দেখার পর পূর্ব বাংলার জনগণের ঐক্য ও সংহতির নতুন সাংস্কৃতিক বৃত্ত হয়ে ওঠে নববর্ষ উদযাপন। ১৯৬৪ সালে বা ১৩৭২ বঙ্গাব্দে এসে বিভিন্ন শহরাঞ্চলেও বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে। প্রাদেশিক সরকার এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করায় জনজীবনেও দেখা দেয় নবতরঙ্গ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওই সময় বন্ধ ছিল। কিন্তু তার পরও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সেবারের অনুষ্ঠানে দর্শক-শ্রোতার ব্যাপক উপস্থিতিতে তখন কোনো কোনো পত্রিকায় বিস্ময়ও প্রকাশ করা হয়।

পূর্ব বাংলায় উঠতি, শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই বিকাশপর্বে নববর্ষ উদযাপন ঐক্য ও সংহতির নতুন এক পরিসর সৃষ্টি করে- যার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা। উঠতি নব্য শিক্ষিত এই বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির গভীর সম্পৃক্তি ছিল কৃষক ও কৃষি সমাজের সঙ্গে। ফলে বাংলা নববর্ষ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মিথস্ট্ক্রিয়ার ক্ষেত্রে এবং ঐক্যবন্ধন তৈরির ক্ষেত্রে শুধু সাংস্কৃতিক নয়- রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লেখাই বাহুল্য, মিথস্ট্ক্রিয়া ও ঐক্যবন্ধনের এই দিকটিকে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এই বিষয়টিকে দুর্বল করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এখনও তৎপর রয়েছে।

এই সংগ্রামশীলতা ও সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতায় বঙ্গাব্দ এ দেশের মানুষের জীবনে নির্মাণ করতে পারে আরও নতুন সোপান- যদি এই রাষ্ট্রের অর্থবছরটি শুরু করা যায় বৈশাখ মাস থেকে। এতে শুধু প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গেই নয়, আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গেও বাংলা পঞ্জিকার সংযোগ হবে আরও নিবিড়। প্রসঙ্গত, বাংলা সনের শুরুই হয়েছিল ফসলি সন হিসেবে। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায়ের উপলক্ষের মধ্য দিয়ে বাংলা বর্ষ সম্পৃক্ত হয়েছিল দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক ও উৎপাদক গোষ্ঠী কৃষকের সঙ্গে, কৃষি সমাজের সঙ্গে। অথচ এ দেশের মৌসুমি আবহাওয়া, অর্থনৈতিক কার্যক্রম, উৎপাদন মৌসুম ইত্যাদি বিবেচনায় একেবারে অযৌক্তিক হওয়ার পরও জুলাই থেকে জুন ক্যাটাগরির অর্থবছর দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে বহাল রাখা হয়েছে।

এ দেশে বাংলা সন অনুযায়ী অর্থবছর প্রচলনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আসলে নীতিনির্ধারকদের মানসিকতা। প্রসঙ্গত, পৃথিবীর একেক দেশ অর্থবছর নির্ধারণের ক্ষেত্রে একেক সময় অনুসরণ করে থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালী দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর, শেষ হয় ৩ সেপ্টেম্বর। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অর্থবছর শুরু হয় জানুয়ারি থেকে। যুক্তরাজ্যে অর্থবছর শুরু হয় এপ্রিল মাস থেকে। অর্থাৎ বৈশাখ থেকে চৈত্র মাসে বা ১৪ থেকে ১৩ এপ্রিলের অর্থবছর প্রচলন করা মোটেও অযৌক্তিক কিছু হবে না। আমাদের পাশের রাষ্ট্র ভারতে বাংলা সন কার্যকর নয়, কিন্তু সেখানে নানা বিবেচনায় অর্থবছর হিসেবে এপ্রিল-মার্চ সময়কালকেই ব্যবহার করা হয়।

বাংলা বর্ষকে যদি বাংলাদেশের অর্থবছরে পরিণত করার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তা হলে এ দেশের মানুষেরও নতুন এক উদ্বোধন দেখতে পাব আমরা। ধর্মনিরপেক্ষতার ও অসাম্প্রদায়িকতার যে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বাংলা নববর্ষ ইতোমধ্যেই নির্মাণ করেছে, বাংলা বা বৈসাবি অর্থবছরের প্রচলন সেই প্রেক্ষাপটকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত করে এ জনপদের জীবনকে করে তুলবে আরও সংহত ও সমন্বিত। এবারের বৈশাখ আমাদের ঐক্যবদ্ধ করুক সংহতির ও সমন্বয়ের তেমন অঙ্গীকারে, উজ্জীবন ঘটাক মানবিক বোধে, যৌক্তিক বোধে। শুভ নববর্ষ ১৪২৯।

বিষয় : শুভ নববর্ষ ১৪২৯ শুভ নববর্ষ

মন্তব্য করুন