আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংলাপে অংশ নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা পরস্পরবিরোধী মত দিয়েছেন। বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনতে ইসির উদ্যোগের ইস্যুতে রীতিমতো বিতর্কে অংশ নিয়েছেন তারা।

সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এই সংলাপে অনলাইন ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, হেড অব নিউজ, প্রধান বার্তা সম্পাদক, বার্তা সম্পাদকসহ ৩৮ জন সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ২৭ জন অংশ নেন। এর আগে শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক, পত্রিকার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে ইসি সংলাপ করেছে।

সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনার ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা নিয়ে দুই ধরনের মত উঠে আসে। কেউ কেউ বলেছেন, সব দলকে নির্বাচনে আনতে সচেষ্ট হতে হবে। আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর আস্থার সংকটই ইসির মূল চ্যালেঞ্জ। আবার কেউ কেউ বলেছেন, কোনো দল নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটা সেই দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সেখানে ইসির কিছু করণীয় নেই।

 বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) আবুল কালাম আজাদ বলেন, কথায় কথায় ইসিকে পদত্যাগের কথা বলা হয়। কিন্তু পদত্যাগের পরামর্শ শুভ চিন্তা নয়। ভোটে আসা-না আসা দলগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। জামাই আদর করে কাউকে নির্বাচনে আনতে হবে না। যে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, তারা ভোটে আসবে না, তাদের কী করে ভোটে আনা হবে?

সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বর্তমান ইসিকে নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। তাই ভালো নির্বাচন করা ছাড়া তাদের সামনে কিছু নেই। তিনি ইসিকে হতভাগা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করে বলেন, নির্বাচনে যারাই হেরেছে, তারাই ইসিকে দোষ দিয়েছে। তারপরও নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা এই হতভাগা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন। এটা একটা সাহসের জায়গা।

একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু বলেন, কাউকে নির্বাচনে আনা-না আনা কিংবা দল ভাঙার কাজ ইসির নয়। তাদের চোখ-কান বন্ধ করে সোজা হাঁটতে হবে। আর ইসি ঠিকভাবে কাজ করলে যে যাই বলুক, কিছুই ধোপে টিকবে না। তিনি ড. শামসুল হুদা কমিশনের সমালোচনা এবং ওই কমিশনকে জঘন্যতম হিসেবে অভিহিত করেন।

গ্লোবাল টিভির সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, নিজেদের ভেতরে সংহতি এবং ঐক্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিগত কমিশনের একজন কমিশনার সব সময় বাইরে কথা বলেছেন। কিন্তু এ ধরনের বিষয় ইসি সম্পর্কে মানুষের মনে ভালো বার্তা দেয় না। তিনি বলেন, বেশ কিছু নির্বাচন সহিংসতার মধ্যে হয়েছে। আর ক্ষমতা প্রয়োগে দৃঢ়তার অভাবও দেখা গেছে।

নিউজ টোয়েন্টিফোরের রাহুল রাহা বলেন, নির্বাচনকালীন মিথ্যা প্রচার ও অপপ্রচার রোধে নজরদারি করতে হবে। তিনি ভোট নিয়ে আস্থা ফেরাতে বড় দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এটিএন বাংলার জ. ই. মামুন বলেন, রাতে ভোটের বাক্স ভরে রাখা হয়েছিল। ফলাফল ঘোষণা হয়েছে পরের দিন। এগুলোই ঘটেছে বাংলাদেশে। এই কথাগুলো জেনেশুনেও বলা হয় না। কারণ, বলতে ও লিখতে ভয় লাগে। তিনি বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে আস্থার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীনভাবে কথা ও কাজ করতে চাইলে ইসির পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব। কমিশনের মেরুদণ্ড শক্ত থাকলে সরকারের খুব বেশি কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। তিনি বলেন, আজকের সংলাপে সহকর্মী, বন্ধু ও ভাইদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি চলছে। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে। এই বিভক্তি থাকবে। কিন্তু এ নিয়ে ইসির মধ্যে কোনো বিভক্তি কাম্য নয়।

নাগরিক টিভির দীপ আজাদ বলেন, ইসি চাইলেই সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে। তবে তারা তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন? তিনি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণই বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের পেশাগত জীবনের শেষ অ্যাসাইনমেন্ট। এরপর হয়তো তারা আর কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পাবেন না। এটা মাথায় রেখে কাজ করলে তারা ভালো কিছু করতে পারবেন।

বাংলা ট্রিবিউনের মাসুদ কামাল ইসির উদ্দেশে বলেন, সৎ সাহস থাকলে ২০১৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা মূল্যায়ন করতে হবে। এটা করার মেরুদ থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব।
মাছরাঙা টেলিভিশনের রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, ইসির ক্ষমতা দৃশ্যমান হতে হবে।

ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের আশিষ সৈকত বলেন, ইভিএম জাল ভোট কমিয়েছে। তবে ইভিএম নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক দূর করতে হবে। প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিদের সামনে ইভিএম কাস্টমাইজ করতে হবে।

এনটিভির জহুরুল আলম বলেন, ভোটাররা এখন নির্বাচন-বিমুখ। এ জন্য কমিশন সাংঘাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা এলে পদত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ইসির প্রতি আহ্বান জানান।

জোর করে নির্বাচনে আনা ইসির দায়িত্ব নয়- সিইসি :এই সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে না। গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। তবে জোর করে কাউকে নির্বাচনে আনা ইসির কাজ নয়। কাউকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে ফোর্স করানো ইসির পক্ষে অসম্ভব। অবশ্য সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সবাইকে চেষ্টা করতে হবে।

কাজী হাবিবুল আউয়াল আরও বলেন, ইসি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ এবং তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাবে। কেননা নির্বাচনে অংশ না নিলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। সিইসি আরও বলেন, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সবাইকে চেষ্টা করতে হবে। নির্বাচন কমিশন অর্থহীন সংলাপ করছে না বলে মন্তব্য করেন সিইসি।