বগুড়া শহরের গোদারপাড়ায় ছয়পুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ইটপাড়া সড়কের মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন শিক্ষক ওয়ালিউল ইসলাম বিটুল। ঢাকা থেকে রওনা হওয়া বড় ভাই, ভাবীসহ তাদের দুই সন্তানকে এগিয়ে নিতেই তার অপেক্ষা। রাজধানী থেকে ছেড়ে আসা নওগাঁগামী বাসটি শনিবার দুপুর ১টার দিকে গোদারপাড়া বাজারে থামার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে যান বিটুল।

বড় ভাই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শাহ বায়েজিদ রব্বানী বাহালুল, ভাবী মাসুদা আকতার এবং বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তাদের দুই সন্তান অঙ্কন ও চিত্রণকে নিয়ে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ছুটে যান বিটুলের স্ত্রী মাদ্রাসা শিক্ষক মায়ফুল আকতার। পেছনে ছুটছে তার ছোট্ট দুই ছেলে বিমূর্ত ও বিদিত। পরের দৃশ্যটি সিনেমার মতো। দুই জা মাসুদা আকতার ও মায়ফুল আকতার একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। ওদিকে অঙ্কন ও চিত্রণও তাদের চাচাতো দুই ভাই আট বছর বয়সী বিমূর্ত ও পাঁচ বছরের বিদিতকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর শুরু হয় সঙ্গে থাকা দুটি লাগেজ নিয়ে টানাটানি। দীর্ঘদিন পর দুই ভাইয়ের পরিবারের একত্র হওয়ার আনন্দঘন ওই মুহূর্তটি দেখে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ঢাকার উপপরিচালক শাহ বায়েজিদ রব্বানী বাহালুল জানান, আগে প্রতিবছর ঈদ করতে তিনি নিজ শহর বগুড়ায় আসতেন। ঈদের আগের দিন শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে জেলার কাহালু উপজেলার বীরকেদার মীরপাড়ায় গ্রামের বাড়ি যেতেন। সেখানে আত্মীয়স্বজন এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে ঈদগাহে নামাজ আদায় হতো। পরে ছেলেমেয়েদের নিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরতেন। পরদিন আবার বগুড়া শহরের বাড়িতে ফিরতেন।  


তিনি বলেন, 'ঢাকা থেকে আসা-যাওয়ার পথে যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হতো। তার পরও নাড়ির টানে ছুটে আসতাম। তবে ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর গত দুই বছর আসতে পারেননি। দুটি বছর ঢাকায় চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকতে হয়েছে। যে কারণে ঈদে কোনো আনন্দও ছিল না। কিন্তু এবারের ঈদটা আনন্দময় হবে। কারণ, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে। সমবয়সী আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হবে বলে ছেলেমেয়েরাও আনন্দিত।'

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া মহিলা কলেজের প্রভাষক ওয়ালিউল ইসলাম বিটুল জানান, ঈদ উপলক্ষে প্রতিবছর দুই ভাই, তিন বোনসহ তাদের ১১ ছেলেমেয়ে গ্রামের বাড়িতে একত্র হতো। ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেওয়ার জন্য ঈদের দিন সাধারণ জ্ঞানবিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকত। কুইজের পুরস্কার কেনার জন্য আমার স্ত্রী ও ভাবী ঈদের আগের দিন নিউমার্কেটে যেতেন। দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে প্রায় অর্ধশত পুরস্কার কিনতে গিয়ে অনেক সময় মার্কেটের ভেতরেই তাদের ইফতারি করতে হতো। করোনা পরিস্থিতির কারণে গত দুই বছর সেই আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে এবার হবে। আমার বোনেরাও তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসছেন। ঈদের দিন আমার বাড়িতেই সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে আগের মতোই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

শাহ বায়েজিদ রব্বানী বাহালুল ও মাসুদা আকতার দম্পতির কন্যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী চিত্রণ জানান, দাদার বাড়িতে ঈদ করা মানে যেন ছোটখাটো একটা আনন্দমেলায় হাজির হওয়া। কাজিনরা মিলে নাচ, গান ও কবিতা আবৃত্তি করা। সাধারণ জ্ঞানবিষয়ক কুইজে অংশ নেওয়া। তিনি বলেন, 'যদিও অংশগ্রহণকারী সবার জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার থাকত; কিন্তু প্রতিযোগিতায় যারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হতো, তাদের জন্য আব্বু আর চাচার পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হতো। আর পুরস্কারের লোভে আমরা ঈদের আগে প্রস্তুতি নিয়ে আসতাম। দুই বছর পর এবার চাচার বাসায় সেই আয়োজন হতে যাচ্ছে। ভাবতেই খুব ভালো লাগছে।' 

তার ভাই ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অঙ্কন জানান, দুই বছর পর স্কুল-কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গে একত্র হতে পারব- এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের। 

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শাহ বায়েজিদ রব্বানী বাহালুলের স্ত্রী মাসুদা আকতার জানান, আগে মহাসড়কে যানজটের কারণে ঢাকা থেকে বগুড়া আসতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লেগে যেত। কিন্তু এবার মহাসড়কে যানজট ছিল না। তবে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকায় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল ও বগুড়ার শেরপুরে প্রবেশের মুখে আমাদের বাসটি কিছুক্ষণ আটকে ছিল। তারপরও আমরা মাত্র ছয় ঘণ্টায় ঢাকা থেকে বগুড়ায় পৌঁছেছি। সে কারণে এবারের যাত্রাপথে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।