তিন দিন ধরে বৃষ্টি কিছুতেই থামছে না। বাড়ির চারপাশের পানি এখন আয়েশাদের ঘর দখল করতে যাচ্ছে। আয়েশার এই প্রথম এত পানি দেখা। বিগত পাঁচ-ছয় বছরে এত পানি হয়নি বিধায় বন্যার সঙ্গে আয়েশার এই প্রথম পরিচয়। আয়েশা কেবল নার্সারিতে পড়ে। চারদিকে হাওরবেষ্টনীর ভেতর নিভৃত একটি গ্রামে আয়েশাদের বাড়ি। যে দিকে দৃষ্টি যায় শুধু পানি আর পানি। আয়েশার আম্মু সবসময় চিন্তিত থাকে। কারণ ও সাঁতার জানে না। আয়েশার দাদুর একটি ডিঙি নৌকা আছে সে এটাতে উঠতে ভালোবাসে। নৌকাটি আগে দূরে বাঁধা থাকত কিন্তু এখন আয়েশাদের ঘরের সামনে। কারণ ইতোমধ্যে বাড়ির উঠোনে হাঁটুপানি হয়ে গেছে। চারদিকে হাহাকার ঘরবাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে। রান্না করার চুলা এখন পানির নিচে। আয়েশার দাদিমা টেবিলের ওপর চুলার আগুনে ডালভাত রেঁধে কোনো রকম দিন পার করছেন। আয়েশাদের কয়েকটি গরু আছে, সেগুলো পানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে এবং পানির ওপরে মাঝে মধ্যে গরুগুলোকে শুতে দেখে আয়েশার খুব কষ্ট হয়। হাঁসগুলো নিয়ে আয়েশার চিন্তা নেই কারণ ওরা পানির ওপর ভেসে ভেসে ঘুরে বেড়ায়।
কিন্তু মুরগিগুলোর মাটির ঘরে পানি ঢোকাতে তাদের দিনের পর দিন বন্দি করে রাখা হয়েছে তাদেরই ঘরের ওপরে।
আয়েশা একদিন তার দাদুকে বলে, আচ্ছা দাদু- বন্যা হলে হাঁসদের কোনো সমস্যা হয় না।
কেবল গরু-মুরগিদের সঙ্গে আমি ও আমার মতো যারা সাঁতার জানে না তারাই বেশি অসহায় হয়ে পড়ে।
এই কথা শুনে আয়েশার দাদুর চোখে জল এসে গেল।
আচ্ছা তুমি কি ওই হাঁসগুলোর মতো সাঁতার শিখতে চাও। আয়েশা মাথা নাড়িয়ে বলল জ্বি,
ঠিক আছে কাল থেকে আমি তোমাকে সাঁতার শেখাব কেমন।
আয়েশা তার দাদুর প্রশিক্ষণে নিয়মিত সাঁতার শিখে উঠানে নিজে নিজে চর্চা করে যা অকল্পনীয় এবং হৃদয়বিদারক।
কারণ যে উঠানে আয়েশা নিয়মিত খেলাধুলা করত তার সাথীদের নিয়ে আজ এই উঠোনেই অথৈ জল।
এদিকে পানি কিছুতেই কমছে না; এভাবে আর কতদিন।
আয়েশার নানার বাড়ি উজান এলাকায়; সেখানে পানি থাকলেও বাড়িতে ওঠেনি। আয়েশা ও তার আম্মুকে তার নানা নিতে এসেছে। বরাবরের মতো নানার বাড়িতে যাওয়ার সময় যে খুশির রূপ আয়েশার মুখে ফুটে ওঠে আজ তা নেই। সে বাড়ি থেকে যেতে চাচ্ছে না তার দাদা এবং দাদিমাকে রেখে। আয়েশা তার আব্বুকে ফোন করে কেঁদে কেঁদে বলছে, না যাওয়ার ইচ্ছেগুলো- শোনো আব্বু, হাঁস-মুরগি এবং আমাদের গরুগুলোকে তুমি এসে দেখে যাও; ওরা কীভাবে পানির ওপর গৃহবন্দি হয়ে আছে।
আয়েশার এ কথাগুলো শুনে সে তার ছোট্ট মেয়েকে নানার বাড়িতে যাওয়ার জন্য সান্ত্বতনা দিয়ে ফোনটা রেখে নিস্তব্ধ হয়ে ভাবছে; ওরা তো বন্যার কবলে পড়ে গৃহবন্দি হয়েছে।
আর আমি কর্মের জালে আটকে আছি এই নিষ্ঠুর ঢাকা শহরে।
সে চোখের জল মুছে অপলক দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে।
সুহৃদ নেত্রকোনা

বিষয় : জলমগ্ন ছোট গল্প

মন্তব্য করুন