দেশবাসীর সহযোগিতা ও সাহসে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে- সেতুটি উদ্বোধনের পর অপর প্রান্তে গিয়ে জনসভায় এ কথাই বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'সাহস দিয়েছেন আপনারা। শক্তি দিয়েছেন আপনারা। আমিও আপনাদের পাশে আছি। এই দেশ আপনাদের, এই দেশ আমাদের। জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। আমরা এই দেশকে গড়ে তুলব। মানুষকে উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দেব।'

গতকাল শনিবার মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ঘাটের পদ্মাপাড়ে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই সেতু নির্মাণে যাঁরা বাধা দিয়েছেন, উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে তাঁদের একটা সমুচিত জবাব দিতে পেরেছি। জাতির পিতা বলেছেন, 'কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।' আসলেই দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে তাঁর সরকারই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। খালেদা জিয়া এসে তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার আবার পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। তখন তাঁরা কী বলেছিলেন? বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ কোনোদিনই নাকি পদ্মা সেতু করতে পারবে না। খালেদা জিয়াকে বলব, আসুন, দেখে যান পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে কিনা?

দেশবাসীর উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'আমাদের অঙ্গীকার ছিল মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব। আমরা করেছি। আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। ওয়াদা করলাম, আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমি যে কোনো ত্যাগ করতে প্রস্তুত। নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি, দেওয়ার কিছু নেই। আছে শুধু ভালোবাসা, দিয়ে গেলাম তাই।'

পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, 'আজ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মানুষের জন্য বিশেষ দিন। কিছুক্ষণ আগে এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন করে এলাম। আলহামদুলিল্লাহ।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'একটা কথা মনে রাখবেন, এই দেশের মানুষের জন্য আমার বাবা-মা-ভাইয়েরা জীবন দিয়ে গেছেন। আমি ও আমার ছোট বোন বেঁচে আছি। আমাদের পদ্মা সেতু করতে গিয়ে অনেক অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের উপদেষ্টা, আবুল হোসেন, সচিব মোশাররফ হোসেনসহ অনেককে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অপমান করা হয়েছে। আমার ছেলেমেয়ে জয়-পুতুল, আমার বোনের ছেলে ববিসহ অনেককে কত মানসিক যন্ত্রণা তারা দিয়েছে। কিন্তু আমরা পিছু হঠিনি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল- এই সেতু নির্মাণ করব। আমাদের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব। আমরা তা করতে পেরেছি।'

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্বে খাদ্যের অভাব। বাংলাদেশে যেন খাদ্যের অভাব না হয়, যে যা পারেন খাদ্য উৎপাদন করবেন। কারও এক ইঞ্চি জমিও যেন বাদ না যায়। সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলবেন। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলব। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা আমরা করে দেব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমার ওয়াদা ছিল প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলবে। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে আমরা বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ। সকলের হাতে মোবাইল ফোন। সকলে আজ অনলাইনে কেনাবেচা করতে পারেন- সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি। মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'

জনসভার আগে সকাল ১০টায় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশ এবং পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে টোলপ্লাজায় টোল প্রদান ও ডিজিটাল ডিসপ্লে প্রদর্শনী উপভোগ শেষে পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে পদ্মা সেতুর আরেকটি নামফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করেন তিনি। এ সময় সেখানে মোনাজাতও অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন প্রমুখ।

এরপর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে জনসভার মঞ্চে উপস্থিত হন শেখ হাসিনা। এ সময় লাখো মানুষ স্লোগানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে স্বাগত জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চ থেকে হাত নাড়িয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর লক্ষ্য জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করা, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। তাদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করা।

পদ্মা সেতু নির্মাণে বাধা প্রদানের কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, দেশের অনেক জ্ঞানীগুণী লোক ছিলেন, অর্থনীতিবিদ ও বড় বড় আমলা ছিলেন। সবাই বলেছেন, নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করা সম্ভব নয়। আজ নিজেদের টাকায় কীভাবে করতে পারলাম? যখন ওই ড. ইউনূসকে তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি থেকে চলে যেতে হলো, তখন বিশ্বব্যাংকে তদবির করে, আমেরিকায় তদবির করে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দিলেন। বললো, 'দুর্নীতি হয়েছে।'

তিনি বলেন, কে দুর্নীতি করেছেন? যে সেতু আমাদের প্রাণের সেতু। যে সেতুর সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য জড়িত- সেই সেতু করতে গিয়ে কেন দুর্নীতি হবে? তারা (বিশ্বব্যাংক) টাকা দেয়নি, অথচ দুর্নীতির ষড়যন্ত্র বলে টাকা বন্ধ করে দিল। আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম, টাকা বন্ধ করেছ ঠিক আছে। বাংলাদেশ বসে থাকবে না। আমরা নিজেদের টাকায় এই পদ্মা সেতু তৈরি করব। অনেকে অনেকভাবে চেষ্টা করেছে। অনেক কথা বলেছে, এই সেতু নাকি আমরা করতেই পারব না। আমরা কিন্তু পেরেছি।

শেখ হাসিনা বলেন, এই পদ্মা নদী খরস্রোতা। এই নদী পার হতে গিয়ে আর কাউকে সন্তান হারাতে হবে না। বাবা-মাকে হারাতে হবে না। ভাইবোনকে হারাতে হবে না। সবাই নির্বিঘ্নে চলতে পারবেন। সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। যারা বাধা দিয়েছিল- তাদের একটা জবাব আমরা দিয়েছি। তাদের উপযুক্ত একটা জবাব- এই পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে আমরা দিতে পারলাম, বাংলাদেশ পারে।

সবাইকে করোনার টিকা গ্রহণ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বন্যার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, এখন বর্ষাকাল, এই অঞ্চলে বন্যা হতে পারে। এখন থেকে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। জনগণকেও প্রস্তুতি নিতে হবে। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তি বাংলাদেশ রাখে, এদেশের জনগণ রাখে।

জনসভাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে প্রাণের উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছিল। শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ জনসভাস্থলে এসেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থক ছাড়াও সারাদেশ থেকে এমনকি দেশের বাইরে থেকেও অনেক প্রবাসী শামিল হয়েছিলেন। সকালের আগেই বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে করে মানুষ সেখানে সমবেত হন। কয়েকশ লঞ্চ ও অর্ধশতাধিক নৌকায় করে মানুষ পদ্মা নদীতে অবস্থান নিয়ে জনসভাসহ পদ্মা সেতুর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের দৃশ্য অবলোকন করেন।

জনসভার মঞ্চ ও আশপাশের এলাকাজুড়েও বর্ণিল সাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল। রংবেরঙের ব্যানার, বেলুন, পতাকা, ফেস্টুন ও তোরণ স্থাপন করা হয়েছিল জনসভার স্থল ও আশপাশের সড়কে। জনসভার মূল মঞ্চকে পদ্মা সেতুর আদলে গড়ে তোলা হয়েছিল। সৃষ্টি করা হয়েছিল পদ্মা নদীর আবহ। জনসভাকে ঘিরে আশপাশের কয়েক বর্গকিলোমিটারজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল।

মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লার সভাপতিত্বে জনসভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, আবদুর রহমান, মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজল কৃষ্ণ দে।

সন্ধ্যায় জনসভা মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। দেশের খ্যাতনামা শিল্পীরা সেখানে সংগীত, নৃত্য ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন। এ সময় আতশবাজি উৎসবও হয়।