যেখানে রাত সেখানেই কাত। এর নামই দে-ছুট। গন্তব্য, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অপরূপ প্রকৃতির নান্দনিকতায় ভরপুর নয়নাভিরাম দ্বীপ কুতুবদিয়া। সঙ্গী অদম্য দামালের দল দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ। কক্সবাজারগামী রাতের গাড়িতে চড়ে ভোরের বদলে দুপুরে পৌঁছি চকরিয়া। ততক্ষণে ভ্রমণ পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে মস্তিস্কে বাড়তি চাপ। যানজট পূর্ব পরিকল্পনার অনেক কিছুই বানচাল করে দেয়। বাসস্ট্যান্ডের এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের আহার সেরে লেগুনায় চড়ে ছুটে যাই মগনামা ঘাট। এরপর বড়ঘোপ ঘাটগামী ট্রলারে উঠে বসি। অল্প সময়ের মধ্যে ট্রলার ছাড়ল। অনেক যাত্রী গাদাগাদি করে বসে আছি। মমতাময়ী মায়েরা তাঁদের কোলের সন্তানদের সঙ্গে আহদ্মাদে ব্যস্ত। অশীতিপররা বিড়ি টানায় মগ্ন। তরুণ-যুবাদের চোখ মোবাইল স্ট্ক্রিনে।

আমার মতো ভ্রমণপাগলুদের দৃষ্টি কুতুবদিয়া চ্যানেলের নজরকাড়া সৌন্দর্যের প্রতি। ট্রলারের সবাই যে লাইফ জ্যাকেট কিংবা বয়া ছাড়াই তরঙ্গ পারি দিচ্ছি, সেই ব্যাপারে কারও কোনো ভ্রূক্ষেপও নেই। এখানেই হয়তো আমাদের বাঙালির সাহসিকতার পরিচয়। তা যাই হোক ঘাট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আমাকে ভাবিয়েছে। ভাবতে ভাবতে ও দেখতে দেখতেই অসম্ভব সৌন্দর্যের কুতুবদিয়া চ্যানেল পাড়ি দিয়ে পৌঁছি বড়ঘোপ ঘাটে। সেখান থেকে অটোতে ছুটলাম হোটেল সমুদ্রবিলাস। অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছেই রুমে বাড়তি ব্যাগ রেখে তাঁবু নিয়ে বের হই সমুদ্রসৈকতের দিকে। জুতসই স্থান খুঁজতে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে হাঁটতে মাদবরপাড়া গিয়ে পেয়ে যাই মনমতো এক জায়গা। এ পাশটায় রয়েছে ঘন ঝাউবন। মানুষ দাহ করার শ্মশান। আছড়ে পড়া সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। তাঁবু খাটানোর জন্য সমান ভূমি। ভাগ্য ভালো হলে রাত-গভীরে ভৌতিক কোনো অনুভূতিও মিলতে পারে। তাহলে আর দেরি কেন?

শুরু হয়ে গেল তাঁবু টানানো। দে-ছুটের সঙ্গে যোগ দিল সাগরপাড়ের বাসিন্দা জায়েদ নামক এক কিশোরের বিন্দাস বন্ধুবান্ধব। তাদের সঙ্গে নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা মৃদু বাতাসে ফটোশুটের ছলে খেলছি, কেউ কেউ তাঁবু গাড়তে মহা ব্যস্ত, কেউবা আবার হ্যামোক ঝুলিয়ে দোল খেতে খেতে ক্যাম্প ফায়ারের জন্য লাকড়ি জোগানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। জ্বালিয়ে দেওয়া হলো আগুন। ছোট ছোট ভাগ করে বেশ কয়েক স্থানে ক্যাম্প ফায়ারের জন্য আগুন জ্বালানোর পর এক অন্যরকম পরিবেশের অবতারণা হলো। সেই সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে রাতটা ছিল ভরা পূর্ণিমা। মাথার ওপর থাকা নীল আকাশটায় চলছিল ফকফকা চান্দের আলো আর শুভ্র মেঘের দারুণ লুকোচুরি। সমুদ্রে তখন ভাটা। হেঁটে চলে যাওয়া যায় বহুদূর। আহ্‌ কী সুখ। মনের মাঝে খেলছিল ভাষায় প্রকাশ না করার মতো সামর্থ্যহীন সুন্দর অনুভূতি; যা শুধু আমৃত্যু স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করবে। ধীরে ধীরে রাতের গভীরতা নেমে এলো। চারপাশে আরও বেশি সুনসান নীরবতা ভর করল। আমরাও পরের দিনের প্রস্তুতির জন্য তাঁবুর ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়ি। তৃপ্তির এক ঘুমে ফজর।

তাঁবুর ফাঁক গলে মাথা বের করতেই স্নিগ্ধ ভোরের বাতাস দৈহিক চঞ্চলতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। দ্রুত বের হয়ে জলরাশির পানে এগোতে থাকি। চোখ আটকায় জমাট বাঁধা প্রবালে। বাহ্‌ এ রকমটা যে এখানে রয়েছে, তা আগে জানা ছিল না। চরম আহদ্মাদে পরম যতনে গুটি গুটি পায়ে প্রবালের ওপর হেঁটে বেড়াই। কারণ প্রবালের খাঁজে খাঁজে সামুদ্রিক ছোট প্রাণীগুলো বেশ আয়েশি মুডে বিচরণ করছিল। প্রকৃতি দেখে উচ্ছ্বসিত হবো। তবে সেই উচ্ছ্বাস যেন পরিবেশ ও প্রাণিকুলের ক্ষতির মাধ্যম না হয়; এসব ব্যাপারের প্রতি দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ যথাসাধ্য সতর্ক থাকার চেষ্টা করে। ঘড়ির কাঁটায় সময় বাড়ে। পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ জোয়ারের আগমনী বার্তা দেয়। ঝাউবনের পেছন থেকে উঁকি মেরে পুব আকাশটা লাল করে সূর্যটা তার অস্তিত্ব জানান দিলে, আমরাও তল্পিতল্পা গুটিয়ে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিদর্শনে আলী আকবর ডেইলের দিকে চলে যাই। যাওয়ার পথে অটোরিকশা ব্রেক দিয়ে লবণ ক্ষেত আহরণ ও লবণ সংরক্ষণ পদ্ধতি দেখে ভ্রমণে নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করি। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই আলী আকবর ডেইল পৌঁছে যাই।

এখানে রয়েছে ২০০৬ সালে স্থাপিত দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ [বায়ুকল] প্রকল্প। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কুতুবদিয়া দ্বীপবাসীর মধ্যে কিছুটা হলেও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছিল। কিন্তু তা কয়েক বছরের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে শুধু এর ৫০টি পাখা সংযুক্ত পিলার শোভাবর্ধন করে যাচ্ছে। প্রকল্পটি বেড়িবাঁধের কূলঘেঁষা। পর্যটকরা বায়ুকলের বিশালাকৃতির পাখার পিলার দেখে, সাগরতীরে বসানো সিসি ব্লকে দাঁড়িয়ে সুন্দর অনুভূতি নিয়ে ফিরতে পারবেন। কুতুবদিয়া দ্বীপ যেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, তেমনি রয়েছে এর ইতিহাস-ঐতিহ্য। প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস করা এই দ্বীপের বয়স ৬০০ বছরের ওপরে। দ্বীপটির আয়তন প্রায় ৮৩ দশমিক ৩২ বর্গমাইল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপে মানুষের পথচলা। হজরত কুতুবুদ্দীনের নামানুসারে এই অঞ্চলের মানুষরা এই দ্বীপের নাম রাখেন কুতুবুদ্দীনের ডিয়া। স্থানীয়রা দ্বীপকে ডিয়া/দিয়া বলে। কালের পরিক্রমায় কুতুবুদ্দিনের ডিয়া কুতুবদিয়া হিসেবে কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর সমাধি এখনও কুতুবদিয়াতে সংরক্ষিত রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপচারিতা ও উইকিপিডিয়া ঘেঁটে দ্বীপটির প্রসঙ্গে ধারণা পেতে অটোরিকশায় চেপে চলে যাই দক্ষিণ-পশ্চিম ধুরুং। এখানে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের তৈরি বাতিঘর।

এর নির্মাণকাল ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দ। ১২০ ফুট উচ্চতার টাওয়ারটি চালু করা হয়েছিল ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে। সে সময় জাহাজের নাবিকরা এর আলো প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখতে পারতেন। এখনও দেশের সাধারণ মানুষ ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কুতুবদিয়া বাতিঘরের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। কালের পরিক্রমায় পাকিস্তান আমলে এর সংস্কার করা হলেও তা এক সময় সাগর বিলীন হয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশ সরকার পুরোনোটার অদূরেই লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে আরেকটি বাতিঘর নির্মাণ করেছে; যা এখন অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। বাতিঘর দেখার জন্য যতটা আগ্রহ নিয়ে গিয়েছিলাম, ব্যক্তিগতভাবে আমি তার চেয়ে বেশি নিরাশ হয়েছি। তবে টাওয়ারলাগোয়া সৈকতের সৌন্দর্য অনন্য। বহুল পরিচিত কুতুবদিয়া বাতিঘর দেখে আসা পর্যটকদের নিরাশ মনটাকে নিমেষেই ফুরফুরে করে দিতে পারে সৈকতপাড়ের প্রাকৃতিক নান্দনিকতা। ঘুরতে ঘুরতে জুমার আজানের ধ্বনি। আমরাও অপার সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম কুতুবদিয়া দ্বীপ ছেড়ে ফিরতি ট্রলার ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
ছবির ছৈয়াল :দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

জেনে নিন
যাবেন কীভাবে: ঢাকা-কক্সবাজার রুটের যে কোনো পরিবহনে চড়ে চকরিয়া নামতে হবে। চকরিয়া থেকে সিএনজিতে মগনামা ঘাট। সেখান থেকে ট্রলার-স্পিডবোটে বড়ঘোপ ঘাট। ঘাট থেকে সিএনজি-মোটরবাইকে বড়ঘোপ বাজার-সৈকত।
থাকা-খাওয়া : আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। ইচ্ছে করলে সৈকত তীরে তাঁবু টানিয়েও থাকা যাবে।