'একই গ্রামে বাড়ি হওয়ায় বিদ্যালয়ে একসঙ্গে আসা-যাওয়ার করত ওরা। পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখত। তাদের মৃত্যু কীভাবে ভুলে যাব? ক্লাসের হাজিরা খাতা হাতে নিলেই মনে হয় ওদের কথা।' কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলছিলেন কথাগুলো। গত ৯ মার্চ বিদ্যালয়ের পাশের অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায় তাঁর বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির তিন ছাত্রী তাসফিয়া আক্তার, মিম আক্তার ও রিমা আক্তার লিমা।
তাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ ছুঁয়ে যায় শিক্ষককে।
সাদেকুর রহমান বলেন, 'এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। বিদ্যালয়ের পাশে রেলে কাটা পড়ে আমার তিন শিক্ষার্থী মারা গেল, সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের স্মৃতি আজও ভুলতে পারি না।'
তিনি আরও বলেন, রেল সড়কের পাশেই বিদ্যালয়টির অবস্থান। এখানে হাঁটার যে রাস্তাটি রয়েছে, তা ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছেন। স্থায়ীভাবে রাস্তাটি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও করেছেন।
ওই তিন শিশুর বাড়িই ছিল উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামে। ওই গ্রামের রিপন হোসেন ভুট্টু হারিয়েছেন মেয়ে রিমা আক্তার লিমাকে। এখনও আদরের মেয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারেন না তিনি। পাশের বিজয়পুর বাজারে ছোট ব্যবসা রয়েছে তাঁর। রিপন বলেন, 'বাজার থেকে বিদ্যালয় দেখা যায়, ঘণ্টা বাজলে মনে হয়- এই বুঝি আমার রিমা আসতেছে।' কখনও কখনও তিনি বিদ্যালয়ের সামনে গিয়েও দাঁড়িয়ে থাকেন। মেয়ের শোকে তাঁর স্ত্রীও সারারাত ধরে কাঁদেন এখনও।
নিহত মিমের বাবা মাসুম মিয়ার ভাষ্য, কখনও স্কুল কামাই করত না মেয়ে। প্রতিদিন যাওয়ার সময় ১০ টাকা নিয়ে যেত সে, বেশি দিলেও নিত না। এখনও মেয়ের বই-খাতা সাজানো রয়েছে টেবিলে। মাসুম বলেন, 'জানি সেই বই আর পড়া হবে না, তবু মেয়ের স্মৃতি রেখে দিয়েছি।'
এ বিষয়ে রেলওয়ে কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) লিয়াকত আলী মজুমদার জানান, ওই দুর্ঘটনাস্থলে রেলওয়ের অনুমোদিত কোনো রাস্তা ছিল না। দুর্ঘটনা রোধে সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
রেল সূত্র জানায়, তাদের হিসাবে কুমিল্লা জেলায় রেলপথের ওপর অবৈধ এমন লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা শতাধিক। যদিও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। সাড়ে ৫ বছরে কুমিল্লা অঞ্চলে রেলপথে দুর্ঘটনায় ৩৩৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। জেলায় বর্তমানে রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার। লাকসাম থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটারে বৈধ ক্রসিং মাত্র ১৪টি। অনুমোদনহীন ক্রসিং ৬৫টি। এগুলোর মধ্যে ২০টি ক্রসিং বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লাকসাম-চাঁদপুর রুটে বৈধ ২০টি ক্রসিংয়ের বিপরীতে অবৈধ ২৬টি। এর মধ্যে কয়েকটি শিগগির বৈধ হবে। এ ছাড়া লাকসাম-নোয়াখালী পথে বৈধতা রয়েছে ২০টি ক্রসিংয়ের। যে ২৭টি অবৈধ, তার ১৬টি বৈধ করা হবে বলে জানা গেছে।
লাকসাম রেলওয়ে থানার আওতায় রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গঙ্গাসাগর স্টেশন থেকে ফেনীর ফাজিলপুর ও লাকসাম-চাঁদপুর, লাকসাম-নোয়াখালী রুট। ওসি জসিম উদ্দিন খন্দকার বলেন, চলতি বছরে তাঁদের কাছে থাকা হিসাব অনুয়ায়ী, এই এলাকায় ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৪৭ জন। এর আগে ২০২১ সালে ৪২ জন, ২০২০ সালে ৩৭ জন, ২০১৯ সালে ৬৬ জন, ২০১৮ সালে ৬৮ জন ও ২০১৭ সালে ৭৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
কুমিল্লা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী মজুমদার বলেন, সওজ, এলজিইডি ছাড়াও স্থানীয় জনসাধারণ নিজেদের প্রয়োজনে ক্রসিং তৈরি করে। এতে দুর্ঘটনা বাড়ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি ক্রসিংয়ে ১০০ ফুট করে ফ্যান্সিং (বেড়া) করা হবে। জনসাধারণকেও সচেতন হতে হবে।