'সাবধান এই ক্রসিং গেটে গেটম্যান নাই, নিজ দায়িত্বে ও সাবধানে এই লেভেলক্রসিং পারাপার হইবেন' সাইনবোর্ডটি গাজীপুর মহানগরের কারখানা বাজার এলাকার। ছোট্ট একটি টং দোকানের পাশে অন্তত এক যুগ আগে স্থাপন করা হয়েছে এটি। এই সাইনবোর্ড দিয়েই যেন দায় সেরেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
সেখান দিয়ে নিয়মিত অটোরিকশা নিয়ে যাতায়াত করেন বনখড়িয়া এলাকার চালক আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলছিলেন, 'দিন-রাত রেললাইনের ওপর দিয়া অটোরিকশা চালাই। হুইসেল না দিলে অনেক সময় ট্রেন চলাচল বোঝার উপায় থাকে না।'
মহানগরসহ শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ ও টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা শতাধিক। এসব এলাকার রেলপথ ধরে দিনে ৮০টির বেশি ট্রেন চলাচল করে। ক্রসিংগুলোতে অসতর্ক মুহূর্তে ঘটে দুর্ঘটনা। তবে বছরে এসব ক্রসিংয়ে গড়ে কতজনের প্রাণ যাচ্ছে- সে হিসাব নেই রেল কর্মকর্তাদের কাছে।
টঙ্গী রেলওয়ে ফাঁড়ির সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণ গেছে। আরিচপুর বউ বাজার, মধুমতী রেলগেট, বনমালা রেলগেট ও হায়দাবাদ এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে বেশি।
২৩ জুলাই শ্রীপুরের মাইজপাড়ায় অরক্ষিত ক্রসিংয়ে বলাকা কমিউটারের ধাক্কায় দুর্ঘটনায় পড়ে শ্রমিকদের বহনকারী একটি বাস। এতে প্রাণ যায় পাঁচজনের। তাঁদের মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার চরমাদাখালী গ্রামের ইলিয়াস হোসেন ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করতেন। তাঁর মা, স্ত্রী ও দুই মেয়ের সংসার এখন অথৈ সাগরে পড়েছে।
২২ জুন কালীগঞ্জ উপজেলার নলছাটার অরক্ষিত ক্রসিংয়ে উঠে যাওয়া পিকআপে ধাক্কা দেয় ট্রেন। এতে নিহত হন তিনজন। ১৩ মার্চ টঙ্গীর বর্ণমালা রেলগেট পার হওয়ার সময় সুন্দরবন এক্সপ্রেসে কাটা পড়ে প্রাণ যায় আজহারুল ইসলামের।
২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে মধুমিতা ক্রসিং পার হচ্ছিল একটি অটোরিকশা। ঢাকা থেকে জয়দেবপুরগামী তুরাগ এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে সেটি। এতে নিহত হয় নূরে আলম নোমান নামের এক শিশু। চালক মফিজুল ইসলামসহ চারজন গুরুতর আহত হন। ৯ জানুয়ারি রাতে টঙ্গী নতুন বাজার গাজীবাড়ি ও মধুমিতা এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন অজ্ঞাতপরিচয় দুই নারী ও পুরুষ।
এসব দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনের আশপাশে বসবাসকারী জনসাধারণ ও পথচারীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন জয়দেবপুর জংশনের স্টেশন মাস্টার রেজাউল ইসলাম। তিনি বলেন, অরক্ষিত লেভেলক্রসিংগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবেন। তবে জেলায় কতগুলো এমন ক্রসিং রয়েছে, সে হিসাব তাঁর জানা নেই।
জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেয় অরক্ষিত লেভেলক্রসিংগুলো কত ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।