খৈয়াছড়ার ঝরনা দেখে ফিরছিলেন ১৭ কিশোর ও তরুণ। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া রেলক্রসিংয়ে ফেলা হয়নি ব্যারিয়ার। ১৭ জনকে নিয়ে রেললাইনে উঠে যায় মাইক্রোবাসটি। সঙ্গে সঙ্গে আঘাত হানে ঢাকাগামী আন্তঃনগর মহানগর প্রভাতী ট্রেন। এতে ঝরে যায় ১১ প্রাণ। গত ২৯ জুলাইয়ের এ ঘটনা ছুঁয়ে গেছে দেশবাসীকে। অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে এমন মৃত্যু ঘটছে প্রায়ই। গত কয়েক বছরে দেশের নানা স্থানে ঘটা কয়েকটি দুর্ঘটনা ও অরক্ষিত লেভেলক্রসিং নিয়ে এ বিশেষ আয়োজন। প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্নিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা
চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভোরে প্রাইভেটকারে চেপে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে জয়পুরহাট যাচ্ছিলেন হাফিজুর রহমান। সকাল পৌনে ৭টার দিকে দিনাজপুরের বিরামপুর ঘোড়াঘাট রেলগেটে পঞ্চগড়গামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেন ধাক্কা দেয় প্রাইভেটকারটিকে। ঘটনাস্থলেই আরও দু'জনের সঙ্গে প্রাণ হারান জেলার পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের খাগড়াবন্দের হাফিজুর। এ সময় মারা যাওয়া অন্য দু'জন হলেন আতিয়ার রহমান ও সুজন মিয়া।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গিয়েছিল, লেভেলক্রসিংটির লোহার পাইপ খোলা ছিল। যে কারণে ট্রেন চলাচলের সময় দড়ি বেঁধে রাখা হতো। প্রাইভেটকারটির চালক ঘন কুয়াশার কারণে সেই দড়িটি দেখতে পাননি। সরাসরি তিনি উঠে যান রেললাইনে। এ সময় ট্রেন গাড়িটিকে ৫০ গজ দূরে নিয়ে যায়। দুমড়েমুচড়ে যায় সেটি।
নিহত হাফিজুর রহমানের স্ত্রী জুঁই খাতুন বলেন, রেলগেটটি বন্ধ থাকলে গাড়িটি লাইনে উঠত না। প্রাণ হারাতে হতো না তাঁর স্বামীকেও। এ দুর্ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তাঁরা।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, রেলগেটের লোহার ব্যারিয়ার ৩-৪ দিন ধরে নষ্ট ছিল। দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেনটি গেটে আসার আগেই গেটম্যান দড়ি বেঁধে ক্রসিংয়ের দুই পাশের যানবাহন আটকান। তবে রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে আসা প্রাইভেটকারটি রেললাইনের ওপর ওঠার পর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বারিউল করিম খান বলেন, তাঁরা তদন্ত প্রতিবেদন কেবিনেট ডিভিশনে পাঠিয়েছেন। প্রাইভেটকারে ৪ জন ছিলেন। রেললাইনে ওঠার পর চাকা আটকে যায়। চালক মাসুম পালিয়ে যান। অন্য তিনজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারাতে হয়।
১৪ ফেব্রুয়ারি পার্বতীপুরের ঝাউপাড়ার ভেলাইপাড়ের অরক্ষিত রেলগেটে পিকআপকে ধাক্কা দেয় আন্তঃনগর তিতুমীর এক্সপ্রেস। এতে মিলন সরকার নামে একজন নিহত হন। আরও দু'জন আহত হন এ দুর্ঘটনায়।
৫ জানুয়ারি পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর আসছিল দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস। ভোর ৪টার দিকে মন্মথপুর-চিরিরবন্দর আউটার সিগন্যাল সংলগ্ন যশাই মোড় ৬ নম্বর রেলগেটে বিকল হয়ে পড়া বালুবোঝাই ডাম্প ট্রাককে ধাক্কা দেয় ট্রেনটি। এতে পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পাশের ভুট্টাক্ষেতে পড়ে। আহত হন ট্রেনের লোকোমাস্টার আব্দুর রশিদ ও সহকারী লোকোমাস্টার ইউনুস আলীসহ তিনজন।
২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পার্বতীপুর থেকে রাজশাহীগামী উত্তরা এক্সপ্রেস জয়পুরহাট সদরের পুরানাপৈল গেটে দুর্ঘটনায় পড়ে। সেখানে লাইনে উঠে পড়েছিল জয়পুরহাট থেকে পাঁচবিবিগামী বাঁধন পরিবহনের বাসটি। এ দুর্ঘটনায় ১৪ যাত্রী নিহত হন। ক্রসিংটি ছিল খোলা, দায়িত্বরত গেটম্যান ঘুমিয়ে ছিলেন বলে জানা যায়।
২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর পার্বতীপুর-সৈয়দপুর রেলপথের বেলাইচণ্ডির অরক্ষিত রেলগেটে নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী মোকছেদুল হক ও তহুরা বেগম। সৈয়দপুরগামী তিতুমীর এক্সপ্রেসের ধাক্কায় শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁদের।
মোকছেদুল হকের মা মাফিয়া বেগম বলেন, তাঁর ছেলে স্ত্রীসহ রেলগেটে মারা গেলেও রেলওয়ে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। তিনি শুনেছেন, অবৈধ রেলগেটে দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। তাঁর প্রশ্ন, কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ, তা সাধারণ মানুষ বুঝবে কী করে?
এ প্রশ্ন স্বজনহারা সব মানুষের। রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের বৈধ-অবৈধ সব রেলগেটই যেন মরণফাঁদ। আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে জনসাধারণকে। চালকদেরও ট্রেন চালাতে হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। এ অঞ্চলের পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগে মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫৬৮ কিলোমিটার। এতে লেভেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৫৮৪টি, যার মধ্যে ৫৫০টিই অবৈধ। এসব রেলগেটের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের ২০৪টি ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) তৈরি করেছে ১৮৫টি। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের ৩২টি, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সাতটি ও উপজেলা পরিষদের ২টি। অন্যগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি করা।
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার বলেন, রেলের প্রয়োজনে এসব গেট তৈরি হয়নি। মানুষের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ গেটগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এরপরও রয়ে গেছে অবৈধ গেট। এর সংখ্যাও বাড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই এসব গেট তৈরিতে সহায়তা করছেন।
তিনি মনে করেন, রাতারাতি এত গেটে কিপার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমানে দুইশর মতো স্থায়ী কিপার নিয়োজিত আছেন। প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আরও ৭০০ জনকে।
এ অঞ্চলের রেলগেটগুলোর মধ্যে প্রায় ৭১৫টিতে কিপার নেই। স্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা দায়িত্ব পালনে মোটামুটি সক্রিয়। প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গেটম্যানদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ বেশি। অনেকেই কর্মস্থলে থাকেন না। তাঁদের দায়িত্ব অন্য কাউকে পালন করতে দেখা যায়। বিপুল সংখ্যক রেলগেটের সামনে নেই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও।
পার্বতীপুর রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পথ) তৌহিদুর রহমান বলেন, যানবাহন ও পথচারীরা আইন না মেনে রেললাইনে উঠে পড়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। বৈধ রেলগেটে দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি হয়। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ট্রেন দুর্ঘটনার তথ্য তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের আলোকে সংরক্ষণ করা হয় বলে জানান পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা (এটিও) সাজেদুল ইসলাম।
লালমনিরহাট বিভাগের ব্যবস্থাপক শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ বলেন, রেলগেটে যত লোক প্রয়োজন, তার তুলনায় কম রয়েছে।
পার্বতীপুর রেলওয়ে থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, রেললাইন সুরক্ষিত রাখতে দুই পাশে ১০ ফুট পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি থাকে। নিজস্ব জমি দিয়ে চলাচল করে রেল। যে কারণে রেলগেট এলাকায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিয়ম নেই।