কর্মজীবী মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। দিনের অনেকটা সময় বাসার বাইরে থাকার ফলে তাঁরা সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারেন না। আমাদের দেশে ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যাও নগণ্য। অনেক জায়গায় আবার ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা থাকলেও তার সুযোগ-সুবিধা নেই সেভাবে। এ অবস্থায় অনেকে অন্য দুধ খাওয়ানো শুরু করেন।
মায়ের বুকের দুধ পরিস্কার পাত্রে সংরক্ষণ করলে তা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৩ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। ফ্রিজে রাখলে ১২ থেকে ৭২ ঘণ্টা পরও গুণাগুণ অক্ষত থাকে। ফ্রিজে রাখা দুধ অবশ্যই স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এনে খাওয়াতে হবে।
ডে-কেয়ারের অপ্রতুলতা প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, 'কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের দেখাশোনার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু দু-একটা জায়গা ছাড়া এমন ব্যবস্থা নেই। মাতৃত্বকালীন ছুটিও কিন্তু কম। এ ছুটি যদি আরও বাড়ানো যায়, তাহলে শিশুকে প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। ছয় মাসের পরও তো শিশুকে দেখাশোনার দরকার আছে। অনেক দেশ ডে-কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করেছে, যা আমাদের দেশে নগণ্য পরিমাণ রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী কাজে গেলে সন্তানের পরিচর্যার জন্য হয়তো কাউকে রেখে যাচ্ছেন। সন্তানকে তো খাওয়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর কাছে যা সবচেয়ে সহজলভ্য, বাজারের ফর্মুলাই সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন। আমাদের দেশে গার্মেন্টকর্মীর বেশিরভাগই নারী। তাঁদের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। এই শিশুরাই ভবিষ্যতের সম্পদ। এসব বিষয় মাথায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে হয়তো অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব।'
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আবদুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, 'নারীরা এখন অধিক সংখ্যায় বাইরের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এখন কর্মজীবী মায়েরা কিন্তু সব ক্ষেত্রে শিশুকে নিয়ে কর্মস্থলে যেতে পারেন না। বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। আবার ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যাও খুব কম। এমন পরিস্থিতিতে ওই মা হয়তো তাঁর সন্তানকে কারও কাছে রেখে এসেছেন। এখন শিশুকে খাবার তো দিতে হবে! তাই সহজ সমাধান হিসেবে অনেকে বাজার থেকে ফর্মুলা কিনে নিচ্ছেন। তবে পরিস্থিতির কারণে ফর্মুলা খাওয়ালেও মা যখন শিশুর সঙ্গে থাকবেন, তখন শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করতে হবে।'
শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার সবচেয়ে বেশি আপন হলেন মা-বাবা। এ ক্ষেত্রে প্যারেন্টিং শেখার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দেশে সে সুযোগ নেই বললেই চলে।
শিশুর বেড়ে ওঠা ও মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবারের প্রয়োজন। প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে এটিই হলো মা-বাবার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। এ ছাড়া আরও বিষয় প্যারেন্টিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। শিশু নরম কাদা-মাটির মতো। আপনি তাকে যে ছাঁচে তৈরি করবেন, সেভাবেই সে গড়ে উঠবে। ভালো মা-বাবা হতে হলে নিখুঁত হতে হয় না। তবে সন্তানকে যা শেখাতে চান, সে কাজটি আপনার কাজে যেন প্রকাশ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সন্তান মা-বাবার কথা শুনছে না মনে হলেও, কার্যত সে কিন্তু মা-বাবাকে অনুকরণ করেই শেখে। আপনার মধ্যে যদি কোনো খারাপ অভ্যাস থাকে, যেমন- ঝগড়া করার প্রবণতা, গালাগাল করা, রাগ, জেদ বা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা- এসব অভ্যাস আপনার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যেও চলে আসবে। এ প্রসঙ্গে ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, 'আমাদের দেশে একটা বিষয় সেভাবে নেই। তা হলো- প্যারেন্টিং। এটা উন্নত দেশগুলোয় আছে। আমাদের দেশেও কোনো কোনো জায়গায় আছে। এখানে শিশুর জন্মের আগেই মা-বাবাকে শেখানো হয়- কীভাবে সন্তানকে সুস্থভাবে বড় করবেন; কীভাবে শিশুকে সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে শেখাবেন। শিশুকে যদি চিনি দিয়ে দুধ খাওয়ানো হয়, এমনকি ছয় মাসের পরেও যদি তাকে পায়েস বা সুজি খেতে শেখানো হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে মায়ের বুকের দুধ খেতে চাইবে না। কারণ মায়ের দুধের চেয়ে মিষ্টি স্বাদ সে পেয়ে গেছে। এ কারণে শিশুর খাবারে অরুচি আসে, বুকের দুধ খেতে চায় না। ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি। অথচ দেখা গেছে, যে শিশুরা মায়ের দুধ খায়, তাদের ক্ষেত্রে এ হার সবচেয়ে কম।' শিশুর শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্যারেন্টিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে আনন্দের মাঝে রেখে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। মূলত কঠিন ধৈর্য ও পরিশ্রমের অপর নামই প্যারেন্টিং। এ ক্ষেত্রে প্রথমত যে বিষয়টি আমলে নিতে হয়, তা হলো- শিশুর পুষ্টি। শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই পুষ্টির ওপরই নির্ভর করে শিশুর সুন্দর-সাবলীল আগামী।

বিষয় : অপ্রতুল ডে-কেয়ার

মন্তব্য করুন