অপর্যাপ্ত সেবা, বারবার সংক্রমণের প্রভাব ও পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়ার কারণে অপুষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এটি বৃদ্ধি ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে মানুষকে প্রতিবন্ধিত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অপুষ্টি কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশেষ অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও উল্নেখযোগ্য মাত্রায় শিশুর অপুষ্টি রয়েছে। অপুষ্টির কারণে শিশুদের খর্বাকৃতির হার ২০১৩ সালে ছিল ৪২ শতাংশ, ২০১৯ সালে তা কমে ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ২২ মে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের (বিআইসিসি) কার্নিভাল হলে 'বাংলাদেশের অপুষ্টি মানচিত্র ২০১৯' প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওই প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শিশুদের অপুষ্টির অবস্থা নির্দেশে তিনটি পরিমাপক ব্যবহার করা হয়েছে- উচ্চতা, ওজন ও বয়স। প্রতিবেদনে ৬০ মাসের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে ২৮ শতাংশ খর্বকায় এবং ১০ শতাংশ কৃশকায়তায় ভোগে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরিদ্র পরিবারে শিশু অপুষ্টির হার বেশি হলেও মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারেও শিশু অপুষ্টি উল্নেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে। তবে ভয়াবহ অপুষ্টি (সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশন) অতিদরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। শিশুর বৃদ্ধি সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তা বুঝতে হলে নিয়মিত ওজন, উচ্চতা নিয়ে তাকে গ্রোথ চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রোথ চার্টটি সর্বজনস্বীকৃত। জন্মের পরপর প্রথম সপ্তাহে শিশু ওজন হারায় এবং দুই থেকে তিন দিন এ ওজন স্থির থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে। প্রথম তিন মাসে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম করে ওজন বাড়ে। পরের মাসগুলোতে ওজন বৃদ্ধির হার খানিক কমে আসে। তিন থেকে ১২ মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৪০ গ্রাম ওজন বাড়ে। পাঁচ থেকে ছয় মাসে শিশুর ওজন জন্মকালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। এক বছরে তিন গুণ, দুই বছরে চার গুণ, তিন বছরে পাঁচ গুণ, পাঁচ বছরে ছয় গুণ এবং ১০ বছরে ১০ গুণ হয়। জন্মের সময় শিশুর দৈর্ঘ্য থাকে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার, তিন মাসে তা হয় ৬০ সেন্টিমিটার, ৯ মাসে হয় ৭০ সেন্টিমিটার, এক বছরে ৭৫ সেন্টিমিটার, দুই বছরে ৮৫ সেন্টিমিটার, তিন বছরে ৯৫ সেন্টিমিটার এবং চার বছরে ১০০ সেন্টিমিটার। তারপর প্রতি বছর ৫ সেন্টিমিটার করে বাড়তে থাকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর একটি সামাজিক শ্রেণীকরণ উঠে এসেছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানজিম রেবিকা দীপ্তির ভাষ্যে। তিনি বলেন, 'হাসপাতালে আমরা এক ধরনের অপুষ্টির রোগী পাই; চেম্বারে আরেক ধরনের। সরকারি হাসপাতালে আউটডোর বা ইমারজেন্সিতে যারা আসে, তাদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাদের মধ্যে ব্যাপক অপুষ্টিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অপুষ্টির সঙ্গে রয়েছে শারীরিক নানা জটিলতা। সাধারণত তাদের বয়স ছয় মাস থেকে দুই বছর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব রোগীর মায়েরা কিশোরী; যাঁরা নিজেরাও রক্তশূন্যতা, অপুষ্টিতে ভুগছেন। চেম্বারে যে রোগীরা আসে, তারা মূলত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের। এ রোগীরা ব্যাপক অপুষ্টিতে না ভুগলেও অনেকের মধ্যে মাঝারি মানের অপুষ্টি দেখা যায়। এ রোগীদের হয়তো শরীরে পানি আসে না, চামড়ার রং বিবর্ণ হয়ে যায় না; তবে ওজন-উচ্চতা মাপলে দেখা যাবে তারা মাঝারি ধরনের অপুষ্টির শিকার। এর কারণ হলো- কোন খাবারটা কখন দেব, কতটুকু দেব- এসব বিষয়ে আমাদের জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। আবার জাঙ্ক ফুডের একটা প্রভাব আছে- সন্তান চাইল আর তাকে চিপস, জুস কিনে দিলাম- এসবই শিশুকে পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে রাখে। এই মাঝারি ধরনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কম নয়। এ রোগী আউটডোরেও পাওয়া যায়, চেম্বারেও।' অপুষ্টির চিকিৎসার বিষয়ে ডা. তানজিম রেবিকা দীপ্তি বলেন, 'ভয়াবহ অপুষ্টির সঙ্গে শারীরিক জটিলতা নিয়ে যে রোগীরা আসে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হবেই। এ সম্পর্কে একটি জাতীয় গাইডলাইন আছে বাংলাদেশে। তাদের উচ্চতা-ওজন পরিমাপ করে নির্দিষ্ট ডায়েট দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। তাদের ফর্মুলা খাওয়ানো হয়। ফর্মুলা-৭৫ দিয়ে শুরু করা হয়। পরে তা বাড়িয়ে ফর্মুলা-১০০ দেওয়া হয়। এ দুটি ফর্মুলা দুধ দিয়ে তাদের চিকিৎসা করা হয়। পাশাপাশি কোনো ইনফেকশন থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের ঢেকে রাখা হয়। ভিটামিন বা অন্য কোনো ঘাটতি থাকলে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।'

বিষয় : পুষ্টিহীনতার বাস্তবতা

মন্তব্য করুন