মুহূর্তেই দ্রিম দ্রিম কান ফাটানো বিকট শব্দ, এরপর আরও কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কিছু বোঝার আগেই দেখতে পাই, রক্তে ভেসে যাচ্ছে মঞ্চের আশপাশ। আমার ডান পাশে থাকা আইভি আপার দু'পা নেই। তাঁর শরীরের নিচে শুধু রক্ত আর রক্ত। আর বাঁ পাশে থাকা আদা চাচাকে কিছুক্ষণ আগেও দেখেছি, নেতাকর্মীদের হাতে আদা দিচ্ছেন। সেই আদা চাচাও মঞ্চের সামনে পড়ে আছেন রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন অবস্থায়। আহাজারি ও ছোটাছুটি চলছে মঞ্চের নিচে ও আশপাশ এলাকায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখার আড়াই দিন পর নিজেকে খুঁজে পাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বেডে। তাকিয়ে দেখি দু'পায়ে কোমর পর্যন্ত, মাথায় ও হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। শরীরে দেওয়া হচ্ছে স্যালাইন ও রক্ত। কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীর মুখে শুনলাম গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হয়েছি।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অজস্র স্প্লিন্টারের আঘাতে পঙ্গুত্ববরণ করা মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সহসভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মিজি মো. মনির হোসেন সেই ভয়াবহতার কথাগুলো যখন বলছিলেন, বারবার শিউরে উঠছিল তাঁর শরীর। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার শিলই গ্রামের সন্তান মুক্তিযোদ্ধা মিজি মো. মনির হোসেন পঙ্গুত্ববরণ করে গত ১৮ বছর ধরে সেই বিকেলের ভয়াবহতার চিহ্ন ও অজস্র স্প্লিন্টার এখনও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। হারিয়ে ফেলেছেন দু'পায়ে হাঁটার শক্তি।

মিজি মনির হোসেন বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় আধা ঘণ্টা পড়ে থাকার পর কয়েকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসকরা তাঁর বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে ক্ষতবিক্ষত একটি পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে পাঠিয়ে দেন পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে পায়ের অস্ত্রোপচার হলেও দিন দিন অবস্থার অবনতি হতে থাকলে এক মাস পর আমাকে ধানমন্ডির ট্রমা সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দেড় বছর চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও হারিয়ে ফেলেছি কর্মক্ষমতা ও চলার শক্তি, যা এই জীবনে আর ফিরে পাব না। আমৃত্যু হাঁটতে হবে লাঠিতে ভর করেই।