'গুরুদেব', 'কবিগুরু', 'বিশ্বকবি' ইত্যাদি বিশেষণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ-সংস্কারক। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত। সেই স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯১৩ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তবে জীবনের পরতে পরতে তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা ও সাহিত্যাদর্শের পরিবর্তন ঘটেছে। জীবনশিল্পী রবীন্দ্রনাথ যা কবির চোখে দেখেছেন, অনুভব করেছেন, ব্যবহারিক জীবনে মানুষের মাঝে তার বিকাশ দেখতে চেয়েছেন বারবার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর অভিজাত ঠাকুরপরিবারে। বাবা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মা সারদাসুন্দরী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁদের চতুর্দশ সন্তান। ছোটবেলায় প্রথাগত বিদ্যালয় শিক্ষা তিনি নেননি। বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। স্কুলের বাঁধাধরার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর অনাগ্রহ। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বা কলকাতার বাইরে পারিবারিক বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন রবি।

রবীন্দ্রনাথ মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে 'ভানুসিংহ' ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রথম ছোটগল্প ও নাটক রচনা করেন এ বছরেই। তবে বাবা চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ আইনজ্ঞ হন। তাই ব্যারিস্টারি পড়তে ১৮৭৮ সালে ১৭ বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডে যান। কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৮৮৩ সালে বিয়ে করেন ১০ বছরের কিশোরী মৃণালিনী দেবীকে।
বাবার আদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০-৯১ সাল থেকে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, সেইসঙ্গে পাবনা, রাজশাহী ও উড়িষ্যায় পৈতৃক জমিদারিগুলোর তদারকি শুরু করেন। এর মধ্যে শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে পরিবার নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন। সেখানে বসেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সোনার তরী, চিত্রা, ক্ষণিকা ও চৈতালির অসংখ্য কবিতা। গীতাঞ্জলি কাব্যের অনুবাদের কাজও শুরু করেছিলেন শিলাইদহে। ওই সময় তাঁর গল্পগুচ্ছ বইয়ের প্রায় ৫০টির মতো গল্পও লেখেন, যেগুলোতে তিনি মূলত গ্রামবাংলা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চিত্র তুলে আনেন।

রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে যান পশ্চিমবঙ্গে বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের কাছে শান্তিনিকেতনে। প্রতিষ্ঠা করেন ব্রহ্মবিদ্যালয় বা ব্রহ্মচর্যাশ্রম নামে একটি স্কুল, যা কালক্রমে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। এসবের মধ্যেই জড়িয়ে পড়েছিলেন বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকেও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর বিচিত্র ও বিপুল সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে। নানান রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিষয়কে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে তাঁর উপন্যাস, ছোটগল্প, সংগীত, নৃত্যনাট্য, পত্রসাহিত্য ও প্রবন্ধগুলো। রবীন্দ্রনাথের কাব্য, ছোটগল্প ও উপন্যাস গীতিধর্মিতা, সহজবোধ্যতা, ধ্যানগম্ভীর প্রকৃতিবাদ ও দার্শনিক চিন্তাধারার জন্য প্রসিদ্ধ। বৃদ্ধ বয়সে চিত্রচর্চাও শুরু করেন। লেখার কাটাকুটি থেকেই তাঁর এ চর্চার সূচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র সৃষ্টির অন্যতম ধারা তাঁর অসাধারণ গান। এই সংগীতপ্রতিভা পারিবারিক সূত্রেই অঙ্কুরিত ও বিকশিত হয়। তাঁর রচিত গান আমার সোনার বাংলা ও জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারত রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত। জীবনসায়াহ্নে এসে বিজ্ঞানের নানা জটিল তত্ত্ব নিয়েও ভেবেছেন। ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরে কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮) জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [৭ মে, ১৮৬১-৭ আগস্ট, ১৯৪১]