শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলার বন্ধু, বাঙালির পিতা! শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বাংলা ভাষার ও বাঙালি জীবনবোধের প্রতিভূ, নেতা, বন্ধু-তিনি বঙ্গবন্ধু। অসীম ত্যাগ, তিতিক্ষা, সাহস, প্রজ্ঞা, বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে যিনি গড়ে দিয়েছেন বাঙালির ভিত। তিনিই সেই মানুষ, যিনি বলেছিলেন-'ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও বলবো আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে।' তাঁর ছিল আত্মত্যাগের সাহস, এমনকি দুঃসাহস! মানুষকে অনুপ্রাণিত করে তোলার মতো অনমনীয় ব্যক্তিত্বের জোর ছিল। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার আগেই তিনি এই নামটির সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব এক করেছিলেন। বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশ। এ কারণেই তিনি অবিসংবাদিত নেতা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি স্বাধীন দেশের, যে দেশের শাসনকর্তা হবেন বাঙালি, রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। জন্মের পর থেকেই জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজেকে চিনিয়েছেন। গেয়েছেন শিকল ভাঙার গান। দেশের মানুষকে শিখিয়েছেন মুক্তির মূলমন্ত্র।

১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন সাত বছর বয়সে, তখন তিনি খোকা নামেই পরিচিত ছিলেন। পরে ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে এবং ম্যাট্রিক পাস করেন গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে। ১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স পাস করার পর শেখ মুজিবুর রহমান ভর্তি হন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে, যেটির বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ। তখন থেকেই সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। আর রাজনৈতিক জীবনে শেখ মুজিবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরে তিনি সোহরাওয়ার্দীর সহকারী নিযুক্ত হন। থাকতেন কলকাতায় সরকারি বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর ঘরে। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৩ সালে যোগ দিয়েছিলেন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। তিনি আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে দলটির হয়ে সক্রিয় আন্দোলনেও অংশ নেন। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে ওই বছরই কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য সক্রিয় আন্দোলন করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করার পর তিনি মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে নতুন দলে যোগ দেন এবং পূর্ব পাকিস্তান অংশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টবিরোধী রাজনৈতিক জোটের টিকিটে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে গোপালগঞ্জ আসন থেকে বিজয়ী হন শেখ মুজিব। দায়িত্ব নেন কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের। ওই জোটের মূল দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন। ১৯৫৫ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সরকারে মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আতাউর রহমান খান। তবে দলের সাধারণ সম্পাদক পদে কাজ অব্যাহত রাখার জন্য মন্ত্রী পদ থেকে পরের বছরই ইস্তফা দেন।

পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাই অন্য সাধারণ ছাত্রনেতাদের নিয়ে শেখ মুজিব ১৯৬১ সালে গোপনে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে এক সংগঠন গড়ে তোলেন, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করা। বিভিন্ন জনসভায় আইয়ুব খানের শাসনের বিরোধিতা করে ভাষণ দিতে থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাই ১৯৬২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন সরকার।
১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'ছয় দফা' দাবি পেশ করেন। এর ফলে ১৯৬৮ সালে হওয়া আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে এক নম্বর আসামি করা হয়। তাতে অভিযোগ আনা হয়, শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগী বাঙালি কর্মকর্তারা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরে ভারত সরকারের সঙ্গে এক বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছে। ওই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপী যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, তা এক সময় গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান চরম রূপ ধারণ করলে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয় এবং শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়। রেসকোর্স ময়দানে ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান পান 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি।

১৯৭০-এর নির্বাচনে নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু দেশের জনগণকে ছয় দফার ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। দলের প্রতীক হিসেবে বেছে নেন 'নৌকা'। তাঁর নেতৃত্বে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দুই অংশের মধ্যে তৈরি হয় মেরূকরণ। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো তখন শেখ মুজিবের স্বায়ত্তশাসনের নীতির প্রবল বিরোধিতা করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন স্থগিত করলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হবে না।

পরিস্থিতি বুঝে রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ এক জনসভায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সর্বাত্মক হামলা চালালে শুরু হয় বাংলাদেশের ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। তবে তার আগেই নিজের বাসভবন ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন 'জাতির পিতা' হয়ে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত নতুন দেশকে গড়ে তুলতে বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্রে ভ্রমণ শুরু করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের পর তিনি ওআইসি, জাতিসংঘ ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিশ্চিত করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের প্রিয় বাড়িতেই সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।