কাতারে কার হাতে সোনালি ট্রফিটা উঠবে- বলা মুশকিল। তবে সর্বশেষ ২০০২ বিশ্বকাপে স্মৃতিটা মনে করা সত্যিই আবেগের। মানুষ জানে আমাদের গল্পটা, আমরা কেমন ফুটবল খেলি সেটাও এত দিনে তারা বুঝে ফেলেছে। এবারও নেইমার আমাদের ত্রাতা। সে এই সময়ের সেরা একজন। এরপর যদি আমি ভিনিসিয়ুসকে নিয়ে বলি, সে আমাদের আগামীর তারকা। তার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। এরই মধ্যে সে পরিণত হয়ে গেছে। দেখিয়েছে, কতটা কী করতে পারে। তার সঙ্গে রদ্রিগোকেও আমার ভালো মনে হয়। রিয়াল মাদ্রিদের কোচ আনচেলত্তি তাদের সেভাবেই দেখভাল করছে, যেটা সত্যিই আমাদের জন্য ইতিবাচক। তবে একটা জায়গায় আমার মনে হয় ব্রাজিল এখনও পিছিয়ে, দেশে অনেক নামকরা ক্লাব আছে। কিন্তু সেভাবে তরুণ খেলোয়াড়দের দ্রুত ইউরোপে বিক্রি করতে পারছে না। যখন আমি খেলেছিলাম, আমরা শিরোপা জিতেছিলাম দেশের হয়ে এবং দ্রুত ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছিলাম। এখনকার সময়টা অবশ্য ভিন্ন, অনেক প্রতিযোগিতা। তবে এর সঙ্গে আমাদেরও লড়তে হবে। আর সব সময় নিজেকে ফুরফুরে রাখতে হবে।

সর্বশেষ যখন আমরা বিশ্বকাপ জিতলাম, বিশেষ করে ফাইনালের আগের কথাটাই বলি। আগের রাতে আমি টিম হোটেলের আঙিনায় গলফ খেলছি। আমরা অনেকে মিলে গল্প করছিলাম, মজা করছিলাম। আমি সে সময় দলের অধিনায়ক। আমার মনে হয়েছিল, এ সময় চাঙ্গা থাকাটা কতটা জরুরি। স্কলারিকে ডেকে বললাম, সবাই এই সময়টা উপভোগ করতে চায়। কারণ, আগামীকাল আমরা দারুণ একটা ম্যাচ খেলতে যাচ্ছি। তিনি আমাদের ওপর আস্থা রাখলেন এবং ঠিকই আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। যখন আমি রুমে আসি, স্কলারি আমার সঙ্গে ঘণ্টাখানেক চ্যাটিং করে। পরদিন আমার নবউদ্যমে মাঠে নামি এবং প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিই। ফুটবলে এই ট্রফি জেতার চেয়ে বেশি আনন্দ আর কিছুতেই নেই। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, এটা (বিশ্বকাপ) নিয়ে কথা বলতে এখনও আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই। সব সময়ই যা আমার মনকেও প্রাণবন্ত রাখে।

দেখুন আমার জন্ম সাও পাওলোর ইতাকুয়ায়। যেখানে প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল। এখন যখন বাড়ির পাশ দিয়ে তেমন শিশুদের দেখি, মনে পড়ে নিজের শৈশবের কথাগুলো। মনে পড়ে, একদিন আমাকেও এভাবে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। যখন দেখি, তারা রাস্তার পাশে ফুটবল খেলছে; আমি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারি না। খালি পায়ে তাদের সঙ্গে নামি খেলতে। সে সময় তাদের আর আমার মাঝে কোনো তফাৎ থাকে না। সত্যিই খুব প্রশান্তি লাগে! আমার চেষ্টা থাকে, তাদের কোনো না কোনোভাবে অনুপ্রাণিত করা। তাদের কখনও বুঝতে দিই না যে আমি কে? তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি, একদিন তোমরাও অনেক কিছু করবে।

সমাজ থেকে আপনি যদি কোনোরকম সহযোগিতা না পান, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাটা কঠিনই হয়। আমার ছোটবেলার কথাই বলি, আমি তখন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতাম। এরপর কিছু একটা মুখে দিয়ে দ্রুত যেতাম বাস ধরার জন্য। আমাকে ৫টায় বাসস্টপে থাকতে হতো। কোনোদিন যদি দেরি হতো, ওই দিন আর অনুশীলন করতে পারতাম না। কারণ, ৫টায় বাসে ওঠার পর চার ঘণ্টার জার্নি শেষে আমাকে সেই অনুশীলন গ্রাউন্ডে যেতে হতো। ৯টা থেকে অনুশীলন শুরু করতাম। মাঝেমধ্যে অন্যদের চেয়ে আমি খারাপ খেলতাম। এর কারণ, তাদের বাসাটা ছিল প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডের কাছাকাছি এবং তারা বেশ আরাম করেই আগের রাতটা ঘুমাতে পারত। আজ যখন এমন শিশুদের দেখি, তখন পুরোনো সেই দিনের কথা মনে পড়ে। আসলে আমি মনে করি, গরিব অসহায় শিশুদের পথটা দু'রকম হতে পারে। এক. হয়তো তারা খারাপ পথ বেছে নেবে। দুই. না হয় তারা কঠিন পরিশ্রম করে বড় সফলতার দেখা পাবে। দ্বিতীয় অপশনের দেখা পেতে নিঃসন্দেহে তাদের অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়। যেটা বাইরে থেকে অনেকেই টের পান না। তা ছাড়া কোনো ফুটবলার কেবল তার নিজের সফলতার জন্যই এই যুদ্ধটা চালিয়ে যায় না; তার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, এমনকি দেশের জন্যই লড়াইটা করে।

বিষয় : এই ট্রফি জেতার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই

মন্তব্য করুন