যুদ্ধের শত আঘাত শরীরে নিয়ে, নির্মম মূর্তি হয়ে প্রাচীন সত্যতার দুর্গগুলো টিকে আছে। ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়া ওই সব যুদ্ধ, দুর্গের গল্পের সঙ্গে ফুটবলের ময়দানি লড়াই মিলেমিশে একাকার। ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের এই যুদ্ধ ১১ সেনাপতির। যার দুর্গ গোলবার। আর শেষ সেনাপতি গোলরক্ষক। দুর্গের মুখে দাঁড়িয়ে যাকে সবটা তীক্ষষ্ট দৃষ্টিতে দেখতে হয়, নির্দেশনা দিতে হয়, ফেরাতে হয় প্রতিপক্ষের প্রতিটি চূড়ান্ত আক্রমণ। তার ভুলের সুযোগ নেই, ক্ষমা নেই। তিনি ভুল করলেই লেখা হতে পাতে 'ট্রয়' সিনেমার বিখ্যাত উক্তি 'দ্য সিটি হ্যাজ বার্ন'ময় ম্যাচ রিপোর্ট।

ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো দল সেরা গোলরক্ষক ছাড়া বিশ্বকাপ জেতেনি। প্রথম বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ের গোলরক্ষক এনরিক পেদ্রো ব্যালেস্তেরোস থেকে সর্বশেষ বিশ্বজয়ী হুগো লরিস সবাই কিংবদন্তি। এর মধ্যে বিশ্ব ব্রাজিলের গিলমার দস সান্তোস, ইতালির জিয়ানলুইজি বুফন ও স্পেনের ইকার ক্যাসিয়াসকে দেখেছে। আবার ব্রাজিলের মোয়াসির বারবোসা, ইংল্যান্ডের রব গ্রিন বা আর্জেন্টিনার উইলি কাবায়েরো বিশ্বমঞ্চে ভুল করে 'খলনায়ক' বনে গেছেন। এক ভুলে মারাকানা ট্র্যাজেডি (১৯৫০ বিশ্বকাপ) প্লট লিখেছেন ব্রাজিলের গোলরক্ষক বারবোসা। আমৃত্যু (২০০০) ভোগ করেছেন মৃত্যু-যন্ত্রণা।

কাতার বিশ্বকাপেও শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর আছে দুর্দান্ত গোলরক্ষক। ফ্রান্স, ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেনের জন্য গোলবারে 'কাকে রেখে কাকে নেব' অবস্থা। ফ্রান্সের হুগো লরিস নেতৃত্ব দিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। এবারও টটেনহাম-কিপার ছন্দে আছেন। চলতি মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ২০ ম্যাচে ২৪ গোল খেলেও ম্যাচপ্রতি তিনটি সেভ দিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী এই তারকা। বাদ পড়া এসি মিলানের মাইক মেইগন্যান ইনজুরির আগে ভালো শেপে ছিলেন। তবে ওয়েস্টহ্যামে খেলা ফ্রান্সের আলফনাসো আরিওলা বিকল্প হিসেবে বেশ ভালো। তিনি সব মিলিয়ে মৌসুমে ১২ ম্যাচ খেলে পাঁচটিতে গোল খাননি।

বায়ার্ন মিউনিখে খেলা জার্মানির ম্যানুয়েল নুয়ার ও বার্সেলোনায় খেলা মার্ক টের স্টেগানের বিষয়ও একই। নুয়ার বিশ্বকাপজয়ী এবং অভিজ্ঞ। সঙ্গে জার্মানির 'হাই লাইন' ডিফেন্স ট্যাকটিকসের সঙ্গে মানানসই। লিগে নুয়ার ১১ ম্যাচে ১১ গোল খেয়েছেন। স্টেগান ১৪ ম্যাচে জালে যেতে দিয়েছেন পাঁচটি গোল। তবে বার্সা গোলরক্ষক চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ৫ ম্যাচে ১০টি এবং নুয়ার তিন ম্যাচে গোল খাননি। নুয়ারের যুগে জন্মানোয় আক্ষেপ করা ছাড়া উপায় নেই স্টেগানের। গোলবারে দাঁড়ানোর ওই লড়াই ব্রাজিলের দুই গোলরক্ষক অ্যালিসন ও এদেরসনের মধ্যেও বিদ্যমান। ব্রাজিলের কোচও বোধহয় কে বেশি এগিয়ে তার জুতসই ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। চলতি মৌসুমে সব মিলিয়ে অ্যালিসন ৭৬টি এবং এদেরসন ৬০টি সেভ দিয়েছেন। অ্যালিসন ১৯ ক্লাব ম্যাচে ২২ গোল খেয়েছেন, সেভ দিয়েছেন ৫২টি। ম্যাচপ্রতি ২৬টি সফল পাস দিয়েছেন। এদেরসন ১৭ ম্যাচে ১৩ গোলের বিপরীতে সেভ দিয়েছেন ২৪টি। ম্যাচপ্রতি ২৭টি সফল পাস তাঁর।

বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট স্পেন। তাদের মূল গোলরক্ষক হওয়ার লড়াই অ্যাতলেটিকো বিলবাওয়ের উনাই সিমন ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডেভিড ডি গিয়ার। দৃষ্টিকটু ভুলের জন্য একাদশে জায়গা হারানো ডি গিয়া চলতি মৌসুমে রীতিমতো উড়ছেন। প্রিমিয়ার লিগে গোল ঠেকানোর তালিকায় দুইয়ে আছেন তিনি। চলতি মৌসুমে সব মিলিয়ে ১৩১টি শট ফিরিয়েছেন। ক্লাবের ১৯ ম্যাচে ২২ গোল খাওয়ার দায়ও তাঁর নয়। উনাই সিমন ক্লাবের ১৪ ম্যাচে ১৪ গোল খেলেও ছয়টি ক্লিনসিট দিয়েছেন। স্পেনের ছয় ম্যাচের তিনটিতে গোল খাননি। গত বিশ্বকাপের মতো এবারও গোল্ডেন গ্লাভসের বড় দাবিদার বেলজিয়ামের থিবো কুর্তোয়া। গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের অন্যতম নায়ক তিনি। চলতি মৌসুমে ভুল করে গোল খেয়েছেন মাত্র একটি। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার গোলবারের চিন্তা কমিয়েছেন এমি মার্টিনেজ। দেশের জার্সিতে ১৮ ম্যাচে পাঁচ গোল খেয়েছেন তিনি। ম্যাচপ্রতি সেভ দিয়েছেন প্রায় তিনটি করে। ক্লাবে মৌসুমে ১৪ ম্যাচে ১৭ গোল খেলেও ম্যাচপ্রতি ২.৭৯টি সেভ দিয়েছেন তিনি।

একইভাবে ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড ও অ্যারন রামসডেল ছন্দে আছেন। মৌসুমে সব মিলিয়ে ১১৭টি সেভ দিয়েছেন এভারটনের পিকফোর্ড। আর্সেনালের রামসডেল ফিরিয়েছেন ৯০টি শট। ডেনমার্কের গোলরক্ষক কাসপার স্মাইকেল জাতীয় দল ও ক্লাব মিলিয়ে শট ফিরিয়েছেন ১৩৫টি। পর্তুগালের আছেন রোমায় খেলা ৩৪ বছর বয়সী রুই প্যাট্রিক ও পোর্তয় খেলা ২৩ বছরের ডিয়াগো কস্তা। দু'জনই অর্জন করেছেন আস্থা। জার্মান লিগে খেলা সুইজারল্যান্ডের ইয়ান সমার বড় দলকে একাই আশাহত করতে পারেন। সর্বশেষ ইউরোয় যেমন ফ্রান্সকে হতাশ করেছেন। সেনেগালের আছে চেলসিতে খেলা এডওয়ার্ড মেন্ডি। আবার বিশ্ব আসর এলেই মেক্সিকোর ফ্রান্সিসকো ওচোয়ার মধ্যে লেভ ইয়াসিনের আত্মা ভর করে। কাতার বিশ্বকাপে তাঁদেরই কেউ হয়ে উঠতে পারেন নায়ক। তেমনি ভুল করলেই অভিশপ্ত করা হবে তাঁদের আত্মাকেও।