আগামী এক মাসের মধ্যে আপনার যদি এভারেস্ট জয়ের পরিকল্পনাও থাকে, তাড়াতাড়ি করে মাথা থেকে তা ঝেড়ে ফেলুন। দেশ, রাজনীতি, কূটনীতি, নির্বাচন- সবকিছু চুলোয় যাক, আগামী এক মাস বাঙালি মাতবে শুধুই ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায়। ফুটবল বিশ্বকাপ চার বছর পর পর পুরো এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়ে রীতিমতো এক উৎসবের উপলক্ষ এনে দেয়। বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে বাঙালির আবেগ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মজার একটি গল্প ভীষণ মনে পড়ছে। ১৯৯৪ সালে 'ফুটবল ও আমরা' শিরোনামে লেখা হুমায়ূন আহমেদের সেই লেখাটি সরাসরি তুলে দিচ্ছি।

"চার বছর আগের কথা। অয়োময় ধারাবাহিক নাটকের চিত্রায়ন হচ্ছে ময়মনসিংহের রাজবাড়িতে। ক্যামেরা নিয়ে সবাই বসে আছি। শিল্পীরা তৈরি। পরিচালক নওয়াজিশ আলী খান অ্যাকশান বললেই অভিনয় পর্ব শুরু হবে। এমন সময় ঝামেলা শুরু হলো। মিছিলের প্রচ স্লোগানে চারদিক কাঁপতে লাগল। আমাদের দেশটা মিটিং-মিছিলের দেশ। স্লোগান কোনো নতুন ব্যাপার না। কিন্তু সেদিনের মিছিলের স্লোগান অতি বিচিত্র। সাধু ভাষায় বলা যেতে পারে অশ্রুতপূর্ব। স্লোগান হচ্ছিল ওয়ার্ল্ড কাপ সিদ্ধান্ত! মানি না, মানি না। আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন! করতে হবে, করতে হবে।

নওয়াজিশ আলী খান বিস্মিত হয়ে বললেন, ব্যাপার কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি তাঁকে বললাম, লোকজন আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন না হওয়ায় ক্ষেপে গেছে। এই জন্যেই মিছিল, স্লোগান, আন্দোলন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, আন্দোলন করে লাভ কী? আমি বললাম, আমরা ময়মনসিংহের লোক, আমরা লাভ-লোকসান বিচার করে আন্দোলন করি না। আমাদের ফেভারিট টিম আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা হেরে যাবে আর আন্দোলন করব না, তা হয় না। নাটকের ইউনিটের সবাই কৌতূহলী হয়ে মিছিল দেখতে গেল। বিশাল জঙ্গি মিছিল। গলায় রুমাল বাঁধা এক যুবক আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করছে 'আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন না বানালে', বাকি সবাই ধুয়া ধরছে, 'জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।' নওয়াজিশ আলী খান বিনীত ভঙ্গিতে জানালেন যে, তিনি এই জীবনে অনেক পাগল দেখেছেন। ময়মনসিংহের লোকের মতো পাগল দেখেননি।"

শুধু ময়মনসিংহই না, ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে এই পাগলামো ছড়িয়ে যায় বাংলাদেশজুড়েই। বিশ্বকাপ আসা মানেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুই ভাগে বিভক্ত পুরো দেশ। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই বাসার খাওয়ার টেবিল, স্কুল-কলেজ, পাড়ার চায়ের দোকান, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ভক্তদের তর্কবিতর্ক আর খুনসুটি লেগে থাকে সবখানেই। আজ এক দল নিজের বাসার ছাদে বিশাল আকারের ব্রাজিলের পতাকা টাঙিয়েছে তো, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে হায় হায় পড়ে যায় অবস্থা। ব্রাজিলের চেয়েও বড় পতাকা না টাঙালে পাড়ায় মানসম্মান বলে কিছু তো আর থাকছে না। কেউ কেউ তো আরেক কাঠি সরেস, বিশ্বকাপের সময় পুরো বিল্ডিংই ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ অথবা আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে রাঙিয়ে ফেলেন।

নিজের পছন্দের দলের জার্সি পরে ঘোরাফেরা, এমনকি প্রিয় দলের খেলার দিনে রোজা পর্যন্ত রাখা, বিশ্বকাপ নিয়ে বাঙালির অদ্ভুতুড়ে সব পাগলামোর উদাহরণ আসলে বলে শেষ করা যাবে না? বিশ্বকাপ ফুটবল এলে আগে সেলুনগুলোতে রীতিমতো লাইন পড়ে যেত। নিজের প্রিয় ফুটবলারের একটা পেপার কাটিং সংগ্রহ করেই দে ছুট সেলুনে। নিজের চুলের কাট হওয়া চাই একদম ঠিক পছন্দের ফুটবলারের মতোই। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে, বিশ্বকাপের সময় দলবেঁধে সব মাথা ন্যাড়া করা তরুণদের ঘুরতে দেখা যেত। এদের কারও প্রিয় ফুটবলার রোনাল্ডো নাজারিও, কারও বা আবার জিনেদিন জিদান। প্রিয় তারকার জন্য নিজেদের মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হতো না তারা।

তবে এখনকার সময় বিশ্বকাপের উন্মাদনার অনেকটাই চলে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর দাপটে। ফেসবুক খুললেই একে অন্যকে খুঁচিয়ে ট্রল আর স্ট্যাটাসের বন্যা বইছে রীতিমতো। যুগ বদলেছে, নিজেদের আবেগ প্রকাশের মাধ্যমটাও বদলেছে। তবে বিশ্বকাপ ঘিরে বাঙালির আবেগে ভাটা পড়েনি ছিটেফোঁটাও। এত এত উৎসবের মাঝেও কান পাতলে কোথায় জানি গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। ইশ! বাংলাদেশও যদি বিশ্বকাপ খেলত। তবে নিজের দেশের অংশগ্রহণ ছাড়াই একটা পুরো দেশকে উৎসবে ভাসাতে পারে বলেই বোধ হয় ফুটবল খেলাটা এত বেশি সুন্দর। তবে আবেগের আতিশয্য কিংবা বাড়াবাড়ি নয় বরং কাতার বিশ্বকাপ নিখাঁদ আনন্দ আর উৎসবের উপলক্ষ নিয়ে আসুক প্রত্যেক বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে।