সকাল ৭টায় ঘড়ির অ্যালার্মে ঘুম ভাঙল, তড়িঘড়ি করে হালকা নাশতা সেরে বেরিয়ে পড়া। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যায় আবার ঘরে ফেরা। ব্যাগটা বিছানায় রেখে আবার ঘুম। কী ভাবছেন, ঢাকার কোনো চাকরিজীবীর কথা বলছি। না, আগামী এক মাস তো কাতার নিয়েই কথা হবে। জানেন তো কাতারেই এবার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহারণ। আর এমন রজনিতে ঘুমানোর তো জো নেই। শুধু কাতারের মানুষ কেন, সারাবিশ্বই জেগে থাকবে, চোখ থাকবে পারস্য উপসাগরের দেশটিতে। তখন বদলে যাবে দিনের রুটিনও, আগের মতো আর ঘরে ফিরে ব্যাগটা রেখে ঘুমানোর উপায় নেই। বসে পড়তে হবে টিভি সেটের সামনে, না হয় টিকিট হাতে মহামঞ্চের রঙিন কোনো গ্যালারির সিটে। এই অঞ্চলে থাকা মানুষের অবশ্য সেই সুযোগটা কম, তাদের টিভি বা অন্য মাধ্যম থেকেই উপভোগ করতে হবে ৩২ দলের লড়াইটা। যদি ম্যাচটি রাত ১০টায় শুরু হয় তাহলে শেষ দেখতে হলে থাকতে হবে প্রায় ১২টা পর্যন্ত। আবার যদি রাত ১টায় হয় তাহলে তো ভোররাতের কাছাকাছি। তাতেও বিরক্তি ধরবে না, চোখে আসবে না ঘুম। এরই নাম- দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। আজ থেকে শুরু হলো নতুন রুটিন। বিশ্বকাপই সাজিয়ে দেবে টাইমিংটা। যে অনুযায়ী গোটা বিশ্ব চলবে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এমন একটা দেশে ফুটবলের মহারণটা হচ্ছে যাদের নেই বিশ্বকাপের বা ফুটবলের ইতিহাস-ঐতিহ্য। ফুটবলকে কখনও আপন করেও নিতে পারেনি। নেওয়ার উপায়ও অবশ্য ছিল না। যেখানে ফুটবল খেলতে নামলে তপ্ত গরমে পুড়ে অঙ্গার হওয়ার ঝুঁকিটাই বেশি, সেই কাতারই পেল আয়োজনের দায়িত্ব। অথচ অনেক চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের বাছাই পর্বটা পেরোতে পারেনি কাতার। এবার আয়োজক হওয়ায় অটো চয়েসে খেলতে পারছে পারস্য উপসাগরের দেশটি। এটাই এখন তাদের গৌরবের বিষয়।

আসল বিতর্কটা হলো, যেখানে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, মেক্সিকো, জাপানের মতো দেশে বিশ্বকাপ হওয়ার কথা, সেখানে কাতার কেন? তেলের টাকায় নাকি সবই সম্ভব। শেষ পর্যন্ত তারাই হয়ে গেল আয়োজক। এর পর শ্রমিক নির্যাতন থেকে শুরু করে লাশের ওপর দিয়েই রাতারাতি হয়ে গেল আইকনিক সব স্টেডিয়াম। বদলে গেল কাতার। মরুতে ফুটল বিশ্বকাপের ফুল। অথচ বিতর্ক ছুঁয়ে আয়োজন হাতিয়ে নেওয়া দেশটির বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই নিরাপত্তার অভাব ও বাজে পরিবেশের কারণে কয়েকশ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগের আঙুল তোলে ইউরোপের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো। তাদের কথায় কানই দিলো না ফিফা। এরপর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ৫৬ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে দাবি করে, কাতারে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে বহু শ্রমিক বিশ্বকাপের অবকাঠামো তৈরিতে কাজ করেছিলেন। যাঁরা খুবই মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। অনেকে ঠিকঠাক বেতনটাও পাননি। এমনকি যাঁদের বৈধ ভিসা নেই, তাঁদের ক্রীতদাসের মতো খাটিয়েছে দেশটি। তবু ফিফার ঘুরেফিরে একই কথা, এবারের বিশ্বকাপ হবে আগের সব আসরের চেয়ে সেরা।

এই সেরার আঙিনাটা ঠিক করতে কাতার উড়িয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার। বদলেছে নিজেদের ঐতিহ্যও। চার বছর পরপর বিশ্বকাপ। আর বিশ্বকাপ মানেই জুন-জুলাই। কিন্তু এবার কাতারের কন্ডিশন বিবেচনায় ফিফা নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়টাকে বেচে নিয়েছে এই বড় টুর্নামেন্টের জন্য। তাতে অনেকেই বলছেন কন্ডিশনটা চ্যালেঞ্জের হতে পারে। বিশেষ করে কাতারে সাধারণত তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেও পৌঁছাতে পারে। যে পরিবেশে খোলা জায়গায় মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন। নভেম্বর-ডিসেম্বরেও তাপমাত্রা কম থাকে না; প্রায় ৩০ ডিগ্রির ওপরে। যার সমাধানে কাতার দ্বারস্থ হয় নানা রকম প্রযুক্তির। স্টেডিয়াম ও ফ্যানজোনগুলোকে শীতল রাখার ব্যবস্থা করে। বলতে পারেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মতো একটা ব্যাপার। তাতে কি আর প্রাকৃতিক স্বাদটা মিলবে! এ নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। ডাচ কোচ লুইস ফন গাল তো রেগেমেগে আগুন। তিনি ফিফাকে তুলেছেন কাঠগড়ায়। জানিয়েছেন ফুটবলের উন্নতি নয়, মোটা অর্থের জন্যই কাতারে বিশ্বকাপ দেওয়া হলো। এরই মধ্যে ইংল্যান্ড দল অনুশীলনে নেমে গরমে জেরবার অবস্থা। রাতে নাকি উটের ডাকে ঘুমাতে পারছে না। অন্যদিকে, এক শহরের বিশ্বকাপে সমর্থকদেরও জ্বালাতনের শেষ নেই। থাকার জায়গার অভাব, আবার হোটেল পেলেও রাজ্যের দাম।

যাদের শুরুটাই হয়েছিল বিতর্ক দিয়ে তাদের আবার গর্ব কিসের-অনেকটা দু:খ করেই এমন মন্তব্য করেছেন হোসে পালাসিও নামেন এক পোলিশ সমর্থক। বাস্তবেও তা-ই বিতর্ক আর বিতর্ক। আয়োজনের খাতায় নামটা উঠানোর পর থেকেই কথার বানে পড়ে কাতার। অবশ্য এর কারণও রয়েছে একশ একটা। যার বড় কারণটাই জানিয়েছেন কদিন আগে সাবেক ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার। কীভাবে কাতারকে আয়োজক বানানো হয়েছিল সেটাই ফাঁস করেন তিনি। ২০১০ সালের দিকে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি, উয়েফার সে সময়কার প্রধান মিশেল প্লাতিনি ও ব্লাটার মিলেই মূল কলকাঠি নেড়েছিলেন। তিনজনে বেচে দেন ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশের টিকিটটা। সম্প্রতি সুইস সংবাদমাধ্যম তাগেস-আন্তসাইগারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দোষটা নিজের ঘাড়েই নেন ব্লাটার। ২০১০ সালে ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজন হতে লড়েছিল পাঁচটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। যেহেতু ফিফাপ্রধানের হাতে থাকে চারটি ভোট, তাই তাঁকে হাত করতে পারলেই বড় কিছু সম্ভব হবে বলে ধরে নেয় কাতার। সে সময় কাতারের প্রিন্স ও বর্তমান আমির শেখ তামিম নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে লবিং করতে থাকেন। ভৌগোলিক রাজনীতিকেও হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগায় কাতার। যেখানে কাতারের বাক্সে পড়ে ১১ ভোট আর যুক্তরাষ্ট্রের বাক্সে মাত্র ৮ ভোট।