ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

বিপদের বন্ধু বীমা

বিপদের বন্ধু বীমা

প্রতীকী ছবি

আনোয়ার ইব্রাহীম 

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ০০:১৩ | আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৪ | ১১:০৩

একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ সহসাই ছাই করে দিতে পারে বহু জীবন ও সম্পদসহ বড় জনপদ। উত্তাল সাগরের ঢেউ ডুবিয়ে দিতে পারে বিশালাকার জাহাজ, যার কারণে ডুবতে পারে বহু ব্যবসায়ীর পুঁজির সঙ্গে বড় স্বপ্নও। জীবন ও সম্পদ ক্ষয়ের বিপদে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো বন্ধু পাওয়া হয়তো যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ত্রাতা হিসেবে কাউকে পাওয়া কঠিন। আকস্মিক এমন বিপদে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হয় আর্থিক সহায়তার। অকৃত্রিম বন্ধুই পারে এমন সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে। বিশ্বব্যাপী বীমা ব্যবস্থাকেই এমন বিপদের পরম ও অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে দাঁড়াতে দেখা যায়। অনেকের মধ্যে এমন ভুল ধারণা আছে যে, বীমা করে খুব বেশি লাভ হয় না। কারণ সবাই দুর্ঘটনায় পড়েন না বা অকালে মৃত্যু হয় না। এমনটি না হলে মেয়াদান্তে টাকাই ‘লস’। তার থেকে বরং ব্যাংকে ‘ফিক্সড ডিপোজিট’ করা ভালো, বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। 

ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান আদিবা রহমান বলেন, এটা ঠিক, বীমাগ্রহীতাদের সবাই দুর্ঘটনায় পড়েন না। হয়তো ৫ থেকে ১০ শতাংশ বীমাগ্রহীতা বিপদে পড়েন।  কখনও এ হার আরও কম। তবে এমন বিপদে পড়া দু’জন ব্যক্তির মধ্যে যার বীমা করা থাকে এবং যার থাকে না, তারাই বুঝতে পারেন যে বীমা কতটা সহায়ক,  আর বীমা না করা কতটা ভুল। তাঁর মতে,  বীমাগ্রহীতা সবাইকেই যদি বড় অঙ্কের সহায়তা দিতে হতো, তাহলে বীমা ব্যবসাই থাকত না। কারণ প্রিমিয়ামের টাকা বিনিয়োগ করে অত মুনাফা হবে না। প্রতি ১০০ জনে যে দশজন বিপদে পড়েন, তাদের বাকি নব্বইজনের প্রিমিয়ামের টাকা থেকে বীমা কোম্পানি বড় অঙ্কের সহায়তা দেয় এবং নিজেও মুনাফা করে। এভাবে অনেকের মধ্যে ঝুঁকি বণ্টন করে দেওয়ার ধারণা থেকেই বীমার ধারণার সৃষ্টি।

কাদের জন্য বীমা

বীমার ধারণা সর্বজনীন। দুর্ঘটনায় সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ধারণা থেকেই বীমার সৃষ্টি। দরিদ্র কৃষকের ফসলহানি বা অকাল মৃত্যু অথবা পেশাজীবীর দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে তাদের পরিবার যেমন অকূল পাথারে পড়তে পারে, তেমনি হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়ী বা সমাজের সবচেয়ে ধনী মানুষেরও আর্থিক ঝুঁকি থাকে। দুর্ঘটনার কারণে পুরো ব্যবসা ক্ষতিতে পড়তে পারে। দুর্ঘটনায় কেবল ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন না, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মী ও তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে একমাত্র বীমাই পারে সবচেয়ে ভালো সহায়ক হতে। তাই বীমা শুধু দরিদ্র বা ধনীর বিষয় নয়, সবার জন্যই বীমা জরুরি। 

অর্থনীতিতে বীমা খাতের ভূমিকা 

বীমা প্রধানত প্রত্যক্ষভাবে ব্যক্তি ও পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুরক্ষা দেয়। দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অঙ্গহানি বা মৃত্যুতে ওই পরিবারে হঠাৎ করে আর্থিক সংকট দূর করতে পারে বীমা। আবার অগ্নি বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পাশে থাকে। এভাবে হাজারো কর্মীর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দূর হয়। কর্মক্ষম ব্যক্তি বা সচল কোম্পানি কেবল তার জন্য নয়, নিজে সক্রিয় থেকে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে অবদান রাখেন।

উন্নত বিশ্বের উন্নত হওয়ার নেপথ্যের চাবিকাঠি হলো– শিল্পে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ। উন্নত বিশ্বে ব্যাংকের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ তহবিল জোগান দেয় পুঁজিবাজার এবং বীমা খাত। কারণ এই দুই খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পাওয়া যায়। তুলনামূলক খরচও কম। ফলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ থেকে মুনাফা করে সহজে অর্থ ফেরত দিতে পারেন। এতে কোম্পানি তথা দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। অথচ পুঁজির জোগানের সবচেয়ে বড় দুই খাতই বাংলাদেশে রুগ্ণ দশায়।

বীমা যে শুধু ব্যক্তি বা একক কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সহায়তা করে, তা নয়। পরোক্ষভাবেও বৃহত্তর অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়কে একত্রিত করে অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ তহবিলের জোগান দেয় এ খাত। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজারের পর বীমার তহবিলকে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বীমা খাতের অবদানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

বাংলাদেশে বীমার আওতা কেমন

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি, প্রাকৃতিক ঝড়-ঝঞ্ঝার সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ বহুকালের– সেখানে বীমা কোম্পানি হতে পারত সবার প্রধান আশ্রয়স্থল। তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে বীমার হার খুবই কম। দেশের ১০ শতাংশ মানুষও বীমার আওতায় নেই। এর প্রধান কারণ আর্থিক ও আইনি দুর্বলতা। তবে আর্থিক দুর্বলতার থেকেও আইনি বাধ্যবাধকতার ঘাটতি বীমা না করার বড় কারণ। এ বাধ্যবাধকতা না থাকলে উন্নত দেশেও বীমার হার বেশি হতো না। সাম্প্রতিক সময়ের মোটর বীমা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যখন আইন ছিল অন্তত ‘থার্ডপার্টি’ বীমা করতে হবে, তখন সবাই এ বীমা পলিসি নিত। যখন এ বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হলো তখন এ বীমা কেউই করছে না।

বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে জীবন বীমা পলিসির সংখ্যা মাত্র ৭৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩টি। সংস্থার দাবি এসব পলিসির অধীনে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশও বীমার আওতায় নেই। যদিও সরকারি ও বিদেশি মিলে এখন দেশে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ ছাড়া হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে চালু সাধারণ বীমা পলিসি রয়েছে ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৬টি। যদিও এ খাতের ৪৬টি কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সমান প্রতিবেশী ভারতের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ জীবন বীমার আওতায় রয়েছে। ফোর্বসের তথ্যানুযায়ী, ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এ দেশটিতে এখন ৫১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যবীমা রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক মানুষের জীবন বীমা পলিসি আছে। তবে দেশটির সর্বশেষ জরিপের তথ্য হলো– স্বাস্থ্যবীমা রয়েছে প্রায় ৯২ দশমিক ১০ শতাংশের। অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালের বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের চলতি জাতীয় বাজেটের তুলনায় ২১ গুণ বড়। দেশটির বীমা খাতের পেনিট্রেশন ১২ শতাংশের সমান। বীমা পেনিট্রেশন হলো কোনো দেশের জিডিপির তুলনায় ওই দেশের নিট বীমা প্রিমিয়াম অনুপাত বা কত শতাংশ। 

আইডিআরএর ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রতিবেশী ভারতের বীমা পেনিট্রেশন ছিল ৪ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৫ শতাংশ। ফিলিপাইনে এ হার ছিল ১ দশমিক ৯০ এবং ভিয়েতনামে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। অথচ একই বছরে বাংলাদেশে বীমা পেনিট্রেশন ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ, যা ২০১৮ সালেও ছিল শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৮ সালে জিডিপির তুলনায় প্রিমিয়াম আয় ক্রমাগত কমছে। ২০২২ সালে জীবন বীমা খাতে গ্রস প্রিমিয়াম আয় ছিল ১১ হাজার ৪০১ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমায় প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।

অন্যান্য দেশের তুলনায় বীমা বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে, তা আইডিআরএর আরেকটি পরিসংখ্যান থেকেও পরিষ্কার হয়। ২০২২ সালের হিসাবে বিশ্বে জিডিপির আকারে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম হলেও বীমা পেনিট্রেশনে অবস্থান ৬০তম। অথচ একই বছর জিডিপিতে মালয়েশিয়ার বিশ্ব অবস্থান ছিল ৪০তম, তবে প্রিমিয়াম আয়ে ৩১তম। জিডিপিতে ৩৭তম অবস্থানে থাকা প্রিমিয়াম আয়ে ভিয়েতনামের বিশ্ব অবস্থান ৪১তম।

আস্থার সংকটই মূল কারণ 

ঝুঁকি কমাতে বীমা করতে গিয়ে বছর বছর অর্থ খরচ করে বিপদের সময় প্রাপ্য বীমা দাবি না পাওয়ার অভিযোগ মানুষের। কোনো প্রকার দেনদরবার না করে বা হয়রানি ছাড়া বীমা দাবি পাওয়া মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বীমা করে সময়মতো সহায়তা না পাওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের জাল-জালিয়াতির কারণে বীমায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে না। 
বীমা খাতের এই আস্থার সংকটের কথা অকপটে স্বীকার করছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে বীমা খাতের কর্তাব্যক্তিরা। একই সঙ্গে কী কী কারণে এ আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেসব বিষয়ে নিজেরা আলোচনা শুরু করেছেন। এ নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে। সরকার এবং বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সমস্যাগুলো কমিয়ে এনে এ খাতের উন্নয়নে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

জীবন বীমা খাতের এ অনাস্থার চিত্র বেসরকারি নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণামূলক জরিপেও উঠে এসেছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. নুরুল কবীর দেশের ৫০টি জেলায় জরিপের ফল প্রকাশ করতে গিয়ে জানান, বীমার কথা শুনলে মানুষের কাছে প্রতারিত হওয়ার ভয় প্রথম মনে আসে। আর সঞ্চয়ের কথা শুনলে অধিকাংশ মানুষ ফিক্সড ডিপোজিট করতে পছন্দ করে বেশি। এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ না থাকলে নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক মাসিক সঞ্চয় (ডিপিএস) করেন বা সরকারি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে।

এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, বীমা করে কোনো সুবিধা মেলে না। নানা অজুহাতে বীমা কোম্পানি বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্ব করে। বিশেষত অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় জীবন বা অঙ্গহানি হলে  মানুষ  বীমা দাবি পেতে নানা হয়রানির শিকার হন। এমন বিপদ হলে যাতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাওয়ার যায়, তার জন্য বীমা করা হলেও বীমা দাবি পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে দেখা যায়। বিপরীতে ব্যাংকে বা সরকারের কাছে সঞ্চয় রাখা বেশি নিরাপদ ও বেশি মুনাফা হয় বলে মনে করেন প্রায় সব মানুষ।

পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিএম ইউসুফ আলী বলেন, কিছু কোম্পানির আর্থিক দুর্নীতির কারণে পুরো খাতে বদনাম হয়েছে। তবে যত দুর্নাম হয়েছে, এ খাতের অবস্থা ততটা খারাপ নয়। মানুষ ভালোর থেকে খারাপটা বলতে ও শুনতে পছন্দ করে বেশি। ফলে কিছু মানুষ বীমা দাবি পেতে হয়রানির শিকার হয়–এটা যেমন সত্যি, তার থেকেও বেশিসংখ্যক মানুষ বেশি দাবি পাচ্ছে– এটিও সত্য। কোনো কোনো কোম্পানি নিজে থেকে বীমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা নিচ্ছে। এসবের প্রচার কম বলে মানুষ তা জানছে না।

সরকারের ভূমিকা কতটুকু 

বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণে ২০১০ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করে সরকার। প্রতিষ্ঠার এক যুগ পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় শীর্ষ পদে স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। সরকারের নানা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ‘ডেপুটেশনে’ এ সংস্থায় পাঠানো হয়। যখন দায়িত্বে আসেন, তখন তাঁর হয়তো বীমা নিয়ে অভিজ্ঞতা থাকে না। কয়েক বছর কাজ করে অভিজ্ঞতা হওয়ার পর যখন তিনি এ খাতের উন্নয়নে কাজ করতে পারার মতো অবস্থানে উন্নীত হন, তখন আবার স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ে ফিরে যান। এভাবেই এখন পর্যন্ত চলছে। অতি সম্প্রতি কর্মকর্তা পদে কিছু স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও পুরো খাতের নজরদারির জন্য তা খুবই অপ্রতুল। ফলে কোম্পানিগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, তা তদারক করার মতো যথেষ্ট দক্ষতা ও সামর্থ্য তৈরি হয়নি।

হতাশা ঝেড়ে বীমা খাতের উন্নয়নে এখন সরকার থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোও উদ্যমী হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। বীমা নিয়ে মানুষের মন্দ অভিজ্ঞতা দূর করতে যেসব কোম্পানি ঠিকমতো বীমা দাবি পরিশোধ করছে না, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে। অনিয়ম বন্ধে আইডিআরএ নজরদারি বাড়িয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ৮০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে অনলাইন মনিটরিংসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

২০২০ সাল থেকে ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবস পালন করে আসছে সরকার। ১৯৬০ সালের ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন পাকিস্তানের আলফা ইন্স্যুরেন্সে যোগদানকে স্মরণীয় করে রাখতে বীমা সংগঠকদের সুপারিশে সরকার এ দিবসটির প্রচলন করে সরকার। উদ্দেশ্য বীমা নিয়ে জনসাধারণে সচেতনতা বাড়ানো।
তবে শুধু কথায় মানুষের সচেতনতা বাড়ে না। বীমা করে সহজে বীমা দাবি না পাওয়ার যুগের পর যুগের যে ক্ষোভ-হতাশা জন্মেছে, তা দূর করতে এদিন দেশব্যাপী বীমা কোম্পানিগুলোকে বীমা দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করেছে সরকার এবং বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এদিন হাজার হাজার মানুষ তাদের বীমা দাবি পাচ্ছে।
বীমা দিবস পালন উপলক্ষে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, ২০২৩ সালে মোট বীমা দাবি ছিল ১২ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। কোম্পানিগুলো এ দাবির বিপরীতে মোট ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ গত বছর বীমা দাবির ৭২ শতাংশ পরিশোধ হয়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল ৬৭ শতাংশ।

নিজের ভালো নিজেরই বুঝতে হবে

বীমা করে ভালো অভিজ্ঞতা হয়নি এমন মানুষের সংখ্যা যেমন কম নয়, তেমনি বীমা করে বিপদে বড় আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বীমা করার শুরুতে যে কোম্পানির বীমা পলিসি আপনি কিনছেন, তার আর্থিক অবস্থা, আগের বীমাগ্রহীতারা টাকা পাচ্ছেন কিনা, তা জেনে নেওয়ার পরামর্শ গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও আমজাদ হোসেন খান চৌধুরীর।

তিনি বলেন, বীমা বলতে যে শুধু জীবন বীমাই হয়, তা নয়। এখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা বীমারও প্রচলন আছে। বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য আছে পেনশন বীমা। আগে সাধারণ বীমার বাইরে স্বাস্থ্যবীমা করা যেত না। এখন আইন বদলে জীবন বীমা ছাড়াই জীবন বীমা কোম্পানিগুলোও স্বাস্থ্যবীমার পলিসি বিক্রি করতে পারছে। বছরে হাজার টাকার স্বাস্থ্যবীমা করে চাইলে লাখ টাকার সুবিধা পাওয়া সম্ভব। একজন কৃষক চাইলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্যহানি ক্ষতি থেকে বাঁচতে শস্যবীমাও করতে পারেন। 

গোল্ডেন লাইফের সিইও বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো– নিজের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা নিতে সবার বীমা করা উচিত। বীমা তাৎক্ষণিক সঞ্চয় নয়। এটা ভবিষ্যতের জন্য। আবার বীমা শুধু বীমাগ্রহীতার আর্থিক নিরাপত্তা নয়, এটা তাঁর পুরো পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়। তবে সামর্থ্যের সঙ্গে মানানসই কিনা, তা দেখে নিয়ে উপযুক্ত পলিসি বাছাই করা এবং কোনো কারণে বীমা প্রিমিয়াম চালিয়ে নিতে না পারলে বা আর্থিক সুবিধা পেতে সর্বনিম্ন কতটি প্রিমিয়াম দিতে হবে, সে বিষয়ে বীমাগ্রহীতার নিজেরই জেনে নিতে পরামর্শ তাঁর।

আরও পড়ুন

×