প্রকৃতি কি প্রতিশোধ নিচ্ছে? নাকি ম্যালথাসের তত্ত্ব অনুযায়ী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনেই নভেল করোনা নামের ভাইরাসের প্রভাবে এই মহামারি! সে যাই হোক, গোটা পৃথিবী এই ভাইরাসের কাছে নাজেহাল হয়ে পড়েছে। চরম ছোঁয়াচে অদৃশ্য এই ঘাতকের ভয়ে যুদ্ধাবস্থার চেয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মানুষ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই সোনালি সময়ে এতটুকুন ভাইরাসের কাছে এভাবে মানবজাতির বিপর্যস্ত হওয়াটা আসলেই একপ্রকার বিস্ময়।

আমেরিকা, চীন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালির মতো পরাশক্তি অসহায়ের মতো দেখছে বিনা চিকিৎসায় হাজার হাজার নাগরিকের মৃত্যু। তবে এই তাণ্ডবের অবসান অবশ্যই একদিন হবে। অবশ্যই মানুষ এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করবে। সে জন্য লাগতে পারে এক মাস, দুই মাস, তিন মাস কিংবা ছয় মাস বা তারও বেশি সময়। বর্তমানে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্যবিষয়ক সাধারণ কিছু বিধিনিষেধ।

এই যেমন হাত ধোয়া, করমর্দন না করা, হাঁচি শিষ্টাচার, যেখানে-সেখানে থুথু না ফেলা। কভিড-১৯ প্রতিরোধে ভীষণ কার্যকর এই স্বাস্থ্যবিধিগুলো ভবিষ্যতে ক্রীড়া ক্ষেত্রেও অনেক বড় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। বিভিন্ন খেলার কিছু প্রচলিত অভ্যাসে পরিবর্তনটা হয়তো সময়ের ব্যাপার। তেমনি কিছু অভ্যাস, যেগুলো ভবিষ্যতে বদলে যেতে পারে- বিশ্নেষণ করেছেন নাজমুল হক নোবেল

ক্রিকেট বলে থুথু দেওয়া

ক্রিকেট খেলায় বোলিং করার সময় থুথু দিয়ে ঘষে বলের ঔজ্জ্বল্য রক্ষা করাটা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। পেস বোলারদের জন্য এটি অত্যাবশকীয়। দেড়শ' বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কোনো ম্যাচ দেখা যাবে না, যেখানে ফিল্ডাররা মুখের লালা দিয়ে বল ঘষেননি। না হলে যে পেস বোলাররা সুইং পাবেন না! কিন্তু করোনাভাইরাস ক্রিকেটের নিত্য এ অভ্যাসে লাগাম পরাতে যাচ্ছে। কারণ মুখের লালা যে কভিড-১৯ রোগটি বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার। আক্রান্ত ব্যক্তির মুখের লালা থেকেই যে ছড়ায় রোগটি।

এরই মধ্যে ক্রিকেট মহলও ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছে বিষয়টি নিয়ে। করোনা-পরবর্তী ক্রিকেটে বলে থুথু দেওয়া নিষিদ্ধ হতে পারে বলে এখনই জোর আলোচনা চলছে। আর এ সম্ভাবনা দেখেই হতাশা ব্যক্ত করেছেন অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলার প্যাট কামিন্স, 'একজন বোলার হিসেবে আমার মনে হচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেটে যদি আমরা বলের ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখতে না পারি তাহলে বোলিং করাটাই আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে যাবে। সত্যিই যদি এমন কিছু (থুথু দেওয়া বন্ধ) হয়, তাহলে সেটা আমাদের জন্য ভীষণ উদ্বেগের।'

টেনিসে তোয়ালের ব্যবহার

ক্রিকেট বলে থুথু দেওয়াটা যেমন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, ঠিক তেমনি টেনিসে ফেদেরার-নাদালদের ঘাম মুছে বলবয়দের কাছে তোয়ালে ছুড়ে মারাটাও নৈমিত্তিক ঘটনা। ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে দর্শকদের উদ্দেশে রিস্ট ব্যান্ড, হেড ব্যান্ড ছুড়ে মারাটাও নিত্য ব্যাপার। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এসব অভ্যাসে পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। মুখ মোছার সময় ঘামের সঙ্গে তোয়ালেতে জীবাণুও প্রবাহিত হয়। আর খেলোয়াড়দের হাত থেকে তোয়ালে নেওয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে কভিড-১৯ রোগ।

গত মার্চে করোনার দাপট শুরু হওয়ার পর ডেভিস কাপে এই বিষয়টি এড়ানোর চেষ্টা করে টেনিস কর্তৃপক্ষ। মিকিতে দর্শকশূন্য গ্যালারিতে জাপানের সঙ্গে ইকুয়েডরের ডেভিস কাপের ম্যাচে বলবয় ও গার্লদের দায়িত্ব পালনের সময় গ্লাভস পরতে দেখা যায়। ২০১৮ সালে এটিপি ট্যুরে তোয়ালে রাখার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে কোর্টের পাশে র‌্যাক রাখা হয়েছিল। পরে এ বিষয়টি তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি।

তবে করোনার কারণে এখন মনে হচ্ছে এই পথে হাঁটতে পারে টেনিস কর্তৃপক্ষ। অবশ্য করোনার ভয়াবহতা দেখে তোয়ালের ব্যবহার উঠিয়ে দেওয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ। আর এতে বেশ হতাশই হয়েছেন গ্রিসের টেনিস তারকা সিসিপাস, 'টেনিস খেলার সময় তোয়ালে ভীষণ প্রয়োজন। এটা বাদ দিতে হলে অনেক কিছু ভাবতে হবে। বলবয়দের কাজই তো হলো তোয়ালে রাখা।' বাস্কেটবলসহ আরও কিছু খেলায় তোয়ালের ব্যবহার দেখা যায়। সেগুলোতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

সৌজন্যতার করমর্দন

ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল, বেসবলসহ প্রায় সব খেলাতেই শুরু বা শেষে করমর্দন করাটা একটা শিষ্টাচার। সেই প্রাচীন অলিম্পিকের সময় থেকে ক্রীড়াকে মনে করা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ও সমতার বাহন। করমর্দন সেই সমতা ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের নির্দশন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে ক্রিকেট ও ফুটবলে করমর্দন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। করোনার প্রভাবে ইউরোপের ফুটবল লিগগুলো বন্ধ হওয়ার আগেই ম্যাচ শুরুর আগে করমর্দন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে থাকা লিভারপুল শেষদিকে অটোগ্রাফ ও সেলফিও নিষিদ্ধ করেছিল। ইংলিশ ক্রিকেট দল শ্রীলংকার বিপক্ষে বাতিল হওয়া সিরিজে করমর্দনের বদলে 'এলবো শেক'-এর প্রচলনের চেষ্টা হচ্ছে। মুষ্টিবদ্ধ হাতের উল্টো পিঠ ছোঁয়ানোর প্রচলনের চেষ্টাও হচ্ছে।

হাইফাইভ ও জড়িয়ে ধরে উদযাপন

ফুটবলে গোল করার পর উদযাপনের সময় হাইফাইভ বা জড়িয়ে ধরাটা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। ক্রিকেটেরও উইকেট পাওয়ার পর হাইফাইভ করতে দেখা যায়। কিন্তু করোনার কারণেই এভাবে হাত মেলানোতেও রয়েছে ঝুঁকি। হাইফাইভের প্রচলনটা বেশি বাস্কেটবলে। এরই মধ্যে এনবিএতে হাইফাইভের বদলে কোমরের সঙ্গে কোমর ছোঁয়ানোতে খেলোয়াড়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। করোনার ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে বিষয়টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বাস্কেটবল সুপারস্টার লেব্রন জেমস, 'আমি আর জীবনেও কারও সঙ্গে হাইফাইভ করব না। এমনকি করমর্দনও করব না।'

এমনকি বাস্কেটবল তারকাদের জার্সি খুলে দর্শকদের মাঝে ছুড়ে মারা কিংবা অটোগ্রাফ দেওয়াতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফুটবলেও হাইফাইভ বা জড়িয়ে ধরার বদলে অন্য কোনো উপায়ে উদযাপন করা উচিত বলে মনে করছেন আমেরিকার নারী ফুটবল তারকা মেগার রাপিনো, 'ফুটবল খেলার সময় আমরা ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যাই। তাই উদযাপনের এসব প্রচলিত পদ্ধতির অবশ্যই বিকল্প ভাবা উচিত আমাদের।'

মন্তব্য করুন