করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলছে 'কঠোর' লকডাউন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুই নৌরুট শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে ফেরিসহ যাত্রী পারাপারের সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে দু'দিন ধরে ঈদে ঘরমুখো লাখো মানুষের ঢল নেমেছে পদ্মার এই দুই পাড়ে। সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা, কর্পূরের মতো উবে গেছে সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি। এমন পরিস্থিতিতে জনস্রোত নিয়ন্ত্রণে শনিবার সন্ধ্যা থেকে দুই ঘাটে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। বিজিবির পাহারাকে ফাঁকি দিয়েই যে যেভাবে পেরেছে, পদ্মা পাড়ি দিয়েছে। কখনও অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার ফেরিতে হুড়মুড় করে উঠে পড়ছেন যাত্রীরা, আবার কখনও ঘাট থেকে অনেকটা দূরে ট্রলার, বালুবাহী বাল্ক্কহেড ও মাছ ধরার নৌকায় করে নদী পার হওয়ার খবর জানা গেছে। রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে নৌ পুলিশ যাত্রী পারাপারের ১৮টি ট্রলার জব্দও করেছে। তার পরও মানুষের স্রোত থামানো যায়নি।

শিমুলিয়া ঘাট থেকে কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু ও মিজানুর রহমান ঝিলু জানিয়েছেন, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাট এলাকা, শিমুলিয়া ট্রাফিক পুলিশ বপের সামনে এবং নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর টোল প্লাজার কাছে বিজিবি সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। সকাল ৯টায় দেখা গেছে, বিজিবি সদস্যরা শিমুলিয়া ঘাটের প্রবেশমুখে যাত্রী ও যানবাহন প্রবেশ রোধ করে তাদের ফেরত পাঠাচ্ছেন। বিজিবির পাশাপাশি পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনও কাজ করে যাচ্ছে। এতসবের পরও নদী পারাপারের জন্য ঘাট এলাকায় জড়ো হন হাজার হাজার যাত্রী। বিজিবি সদস্যদের চেকপোস্ট ভেদ করেই ফেরিঘাটে ভিড় করছেন তারা। এর আগে সকাল ৮টার দিকে বাংলাবাজার ঘাট থেকে কুঞ্জলতা নামে একটি ফেরি শিমুলিয়া ঘাটে নোঙর করতেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন শত শত মানুষ। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করেও মানুষের স্রোত ঠেকাতে পারেনি। মুহূর্তেই ফেরি ভরে যায়। পরে ফেরিটি ছেড়ে মাঝ পদ্মায় নিয়ে নোঙর করে রাখে। কিছুক্ষণ পর ফেরিটি আবারও শিমুলিয়া ঘাটে নোঙর করে। কিন্তু সেখান থেকে যাত্রীরা না নামায় তাদের নিয়ে ফেরিটি বাংলাবাজার ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় থাকা অ্যাম্বুলেন্স যাত্রী অশোক কুমার দুপুরে বলেন, আমার বাবা মারা গেছেন শনিবার রাত ১টার দিকে। ঘাটে আসছি ভোর বেলায়; কিন্তু এখনও ফেরিতে উঠতে পারিনি। বাবার লাশ নিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না। লাশ ফুলে যাচ্ছে। এসিও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আরেক যাত্রী জানান, তার ভাইয়ের অপারেশন হয়েছে। ডাক্তার রিলিজ দিয়ে দিয়েছেন। এখন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টার ঘাটে বসে থেকেও ফেরি পাচ্ছেন না।

ভোর রাত থেকে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা ঘাট এলাকায় প্রখর রোদে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে মানবিক কারণে দুটি ফেরি দিয়ে কয়েক হাজার যাত্রী পার করা হয়। 'আর কোনো ফেরি ছাড়া হবে না' কর্তৃপক্ষ এমন ঘোষণা দিলেও দুপুরে আবারও ঘাট এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পরে রাতের পাশাপাশি রোববার বিকেল ৫টা থেকে দিনের বেলায়ও পাঁচটি ফেরি চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয় বিআইডব্লিউটিসি।

বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, ঈদে ঘরমুখো মানুষের অত্যধিক চাপ বাড়তে থাকায় মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলোচনা করে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাতের পাশাপাশি দিনের বেলায়ও ৫টি ফেরি দিয়ে জরুরি যানবাহন পারাপার করা হবে।

এদিকে সব ধরনের নৌযান বন্ধ থাকায় ঢাকা থেকে বিভিন্ন উপায়ে আসা যাত্রীরা শ্রীনগরের কবুতরখোলা, লৌহজংয়ের কান্দিপাড়া, যশলদিয়া, শিমুলিয়া বাজার ও পদ্মার চর, মাওয়া পুরাতন ফেরিঘাট এবং মাওয়া মৎস্য আড়ত সংলগ্ন নদীতীরবর্তী স্থান দিয়ে ট্রলারে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছেন। শুধু যাত্রীবাহী ট্রলারই নয়; বালুবাহী বাল্কহেড ও মাছ ধরার ট্রলারেও মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। এ সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি তিনশ থেকে পাঁচশ টাকা আদায় করছেন এসব নৌযানের চালক। পরে অভিযান চালিয়ে ১৮টি ট্রলার জব্দ করেছে নৌ পুলিশ। মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সিরাজুল কবির জানিয়েছেন, লোকজন শিমুলিয়া ঘাটে না গিয়ে মাওয়া পুরাতন ফেরিঘাটের দিকে চলে যাওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে পুলিশ। এখানে একটি সিন্ডিকেট ট্রলার ও স্পিডবোট দিয়ে নৌ রুটের চরজানাজাত ঘাট ও আশপাশ এলাকায় পারাপার করে দিচ্ছে। খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে ১৮টি ট্রলার জব্দ করা হয়।

অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে পদ্মার অপর ঘাট মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া। সেখান থেকে সমকালের প্রতিনিধি বিপ্লব চক্রবর্তী ও নিরঞ্জন সূত্রধর জানিয়েছেন, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে দুপুর পর্যন্ত পাটুরিয়া ঘাট ছিল অনেকটা যাত্রীশূন্য। কিন্তু বিকেল থেকে এ চিত্র পাল্টে যায়। একটা সময় ঘাট এলাকা জনস্রোতে পরিণত হয়। হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। আগে চারটি ফেরিতে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যান পারাপার করা হচ্ছিল। বিকেলের পর যাত্রীদের চাপ সামলাতে না পেরে বিআইডব্লিউটিসি বাড়তি আরও ৮টি ফেরি সচল করে। এসব ফেরিতে দু'একটা যানবাহন পার হলেও ভিড় ছিল হাজারো যাত্রীর। ফেরি ছাড়াও ঘাট থেকে দূরে বিভিন্ন স্থান দিয়ে ট্রলারে পদ্মা ও যমুনা নদী পাড়ি দিতে দেখা গেছে যাত্রীদের। গাদাগাদি করে এসব ট্রলার ছেড়ে গেলেও যাত্রীদের কাছ থেকে কয়েক গুণ বাড়তি ভাড়া আদায়ের খবর পাওয়া গেছে।

বিআইডব্লিটিসির উপব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমান জানান, ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত পাটুরিয়া ঘাটে কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স, কিছু পণ্যবাহী ট্রাক ও বেশ কিছু যাত্রী পারাপারের জন্য আসেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চারটি ফেরি ছাড়া হয়েছে। কিন্তু বেলা ৩টার পর যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় আরও আটটি ফেরি পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া গেছে।

সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন পদ্মার ওই পাড় মাদারীপুরের শিবচরে বাংলাবাজার ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রাকচালকরা। বাংলাবাজর ঘাট থেকে প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী মৃধা জানিয়েছেন, বেলা বাড়ার সঙ্গে যাত্রী ও যানবাহনে ভরে যায় ঘাট এলাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষা করেছেন তারা। জরুরি সার্ভিস পারাপারে বিলম্ব হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি রোগীরাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফেরিতে উঠতে না পেরে দুপুরের দিকে ট্রাকচালকদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। পরে পুলিশ সন্ধ্যার পর ট্রাক পারাপারের আশ্বাস দিলে তারা শান্ত হন।

ট্রাকচালক হায়দার আলী বলেন, চারদিন ধরে তরমুজ নিয়ে ঘাটে বসে আছি। পকেটে খাবার টাকা নেই। রাতে কাঁচামাল পার করার কথা, কিন্তু তাও পার হতে পারছি না। সারারাত ট্রাকগুলো এক পাশে রেখে প্রাইভেটকার ও যাত্রী পার করেছে ফেরি কর্তৃপক্ষ। পুলিশও আমাদের সিরিয়াল দিচ্ছে না।

খুলনা থেকে বাংলাবাজার ঘাটে আসা যাত্রী আয়শা বেগম বলেন, এক আত্মীয় হাসপাতালে ভর্তি। জরুরি কারণে ঢাকা যাব। সেহরি খেয়ে রওনা দিয়েছি। প্রায় দেড় হাজার টাকা ব্যয় করে বাংলাবাজার ঘাটে এসে দেখি, ফেরি বন্ধ। কখন ওপারে যেতে পারব, জানি না!