রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম আট বছর আগে গিয়েছিলেন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে। এরপর আর যেতে পারেননি নানা কারণে। তবে ১৫ দিন আগে তিনি আবার গিয়েছিলেন সেখানে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে। বললেন, বিশাল ফারাক হয়ে গেছে। আট বছর আগের পরিবেশের সঙ্গে এবার বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সৌন্দর্য আর আগের মতো নেই।

তরিকুল সমকালকে বলেন, তখন দ্বীপের সৈকতে কচ্ছপের ডিমপাড়ার দৃশ্য উপভোগ করেছিলাম। আর এখন সৈকতজুড়ে মরা কচ্ছপের দুর্গন্ধ। দ্বীপের তিন দিকের সৈকতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাল শৈবাল, শামুক, ঝিনুকও আর তেমন নেই। শুধু তরিকুল নন; দিনে দিনে সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে দেখেছেন পরিবেশবিদ, সমুদ্র বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিজ্ঞানী ও সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারাও। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। দ্বীপটিতে প্রতিদিন অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকের যাতায়াত, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ, পর্যটকদের অসচেতনতায় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কয়েকটি গবেষণায় উঠে এসেছে হুমকিতে থাকা জীববৈচিত্র্যের ভয়াবহ চিত্র। এরই মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই সাতটি বড় জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভবন উচ্ছেদে হাইকোর্টের নির্দেশের পরও একের পর এক উঠছে নতুন স্থাপনা। নতুন ভবনের সংখ্যা এখন দেড়শতে ঠেকেছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য শূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

হুমকিতে জীববৈচিত্র্য, পানিতে ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়া :সম্প্রতি বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় সেন্টমার্টিনে সমুদ্রের পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ভয়াবহ পরিমাণ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিনোদনমূলক সৈকতের ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১ থেকে ১০ কলনি ফরমিং ইউনিট (সিএফইউ) ফিকাল কলিফর্মের উপস্থিতি পাওয়া গেলে সেই পানি ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত ধরা হয়। সেখানে সেন্টমার্টিনের সৈকতের পানিতে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ১ থেকে ২৭২ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম, অর্থাৎ ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন গবেষকরা। সৈকত থেকে ১ কিলোমিটার দূরে প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে সর্বনিম্ন ৩২ থেকে সর্বোচ্চ ২৮০ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের মান মাত্রায় ১০০ মিলিলিটার পানিতে ২০০ কলনি ফরমিং ইউনিট (সিএফইউ) টোটাল কলিফর্ম পাওয়া গেলে সেই পানিকে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত ধরা হয়। মালয়েশিয়ার পরিবেশ অধিদপ্তর একই পরিমাণ পানিতে ১০ থেকে ১০০ সিএফইউ হলে দূষিত বলে চিহ্নিত করে। সমুদ্রসৈকতের পানির ক্ষেত্রে ১০০ এর ওপরে হলে দূষিত বলে চিহ্নিত করে তারা। সেখানে সেন্টমার্টিনের সৈকতে প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে কলিফর্মের উপস্থিতি মিলেছে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ৬৫৭ সিএফইউ পর্যন্ত। সৈকত থেকে ১ কিলোমিটার দূরে এর পরিমাণ ছিল সর্বনিম্ন ২৬ থেকে ১৮১০ সিএফইউ পর্যন্ত। বছরব্যাপী এই গবেষণায় পর্যটন মৌসুমে অন্য সময়ের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি দূষণ মিলেছে। সেন্টমার্টিনের চারপাশের সৈকতের মধ্যে জেটি এবং সৈকতের উত্তর ও পশ্চিম মাথায় ফিকাল ও কলিফর্মের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি মিলেছে। সবচেয়ে কম মিলেছে গলাচিপা এলাকায়। সৈকত থেকে ১ কিলোমিটার দূরের ক্ষেত্রে পশ্চিম সৈকত এলাকায় কলিফর্মের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাকটেরিয়া জনস্বাস্থ্য ও সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা গবেষকদের।

গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মীর কাশেম। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনে নির্দিষ্ট কোনো স্যুয়ারেজ নেই। সমুদ্রে বা মিঠাপানির রিজার্ভারে পাইপ দিয়ে মলমূত্রগুলো ছাড়া হয়। পাইপগুলো এক কিলোমিটার পর্যন্ত পাঠিয়েছে। জাহাজগুলোও জেটিতে এসে তাদের স্যুয়ারেজের মলমূত্র সাগরে ছেড়ে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক ও এক শিক্ষার্থীর এক গবেষণায় বলা হয়, ২০১২ সালে সেন্টমার্টিনে ১৭টি হোটেল ছিল। ২০১৮ সালে তা ৪৮টিতে দাঁড়ায়। আর ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) হিসাব অনুযায়ী, এখন সেন্টমার্টিনে হোটেল, মোটেল ও কটেজের সংখ্যা দেড়শ।

৩৮ বছরে দ্বীপটিতে প্রবাল আচ্ছাদন ১ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে শূন্য দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। প্রবাল প্রজাতি ১৪১টি থেকে কমে ৪০টিতে নেমেছে। বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা সাড়ে ৪ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে নেমেছে ৩ বর্গকিলোমিটারে। ২০৪৫ সালের মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রবালশূন্য হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে ওই গবেষণায়। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, সেন্টমার্টিনের প্রবালগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। চার দশকে এ দ্বীপ উপকূল থেকে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার টন প্রবাল ও পাথর। অবিলম্বে পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে দ্বীপটি সাগরগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সমন্বয়হীনতা: অবৈধভাবে নির্মিত সব স্থাপনা অপসারণ, জলজ প্রাণীর অনিয়ন্ত্রিত আহরণ বন্ধ ও অবাধ পর্যটন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০০৯ সালে জনস্বার্থে হাইকোর্টে মামলা করে। মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর আদালত দ্বীপে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ভাঙার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি জলজ প্রাণী সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২০১৭ সালে হাইকোর্ট সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, কয়েক দফায় তারা সেন্টমার্টিনে পরিবেশ দূষণের দায়ে ৮০টি হোটেলের প্রত্যেকটিকে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নোটিশও দিয়েছে। কিন্তু অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সেন্টমার্টিনের এসব স্থাপনা উচ্ছেদে তারা কয়েক দফা অভিযানে গিয়ে দেখেছে, বেশিরভাগই আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নিয়েছে। এ কারণে অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ চেয়ে করা বিভিন্ন হোটেল মালিকদের করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে উচ্ছেদে আর বাধা নেই।

এদিকে, দ্বীপে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রায় ১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বাজেটের একটি প্রকল্প শেষ হয়েছে ২০২১ সালের জুনে। প্রকল্পের সময় শেষে ব্যয় করতে না পারায় প্রায় তিন কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। তবুও সেন্টমার্টিনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উল্টো পরিবেশ অধিদপ্তর নিজেই গড়েছে চারটি ভবনের একটি রিসোর্ট। যার নাম দেওয়া হয়েছে মেরিন পার্ক। এ ছাড়া পুলিশেরও রয়েছে ভবন।

এ বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক এবং পরিবেশ আধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার পরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, এ প্রকল্পের অধীনে সাত কোটি টাকা মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনে ব্যয় হয়েছে। বাকি টাকায় প্ল্যান্টেশন, বিচ প্রশিক্ষণ, ডাস্টবিন বসানো, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানসহ অনেক কাজ হয়েছে। সব উন্নয়ন দৃশ্যমান।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, সেন্টমার্টিনে প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল বাধা জনপ্রতিনিধি। দ্বীপ রক্ষায় কাজ করতে গেলেই তারা বাধা দেন। এ অভিযোগে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। স্থানীয়দের কাছেও দ্বীপ রক্ষার চেয়ে ব্যবসা বড়।

ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ মামুন সমকালকে বলেন, সরকার দ্বীপে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত করা চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সেন্টমার্টিনে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য জেলা প্রশাসন সাতটি জাহাজের অনুমোদন কীভাবে দেয়?

দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক যাত্রীদের আনা -নেয়ার বিষয়ে নৌ মন্ত্রণালয় ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হলেও এসব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি অভিযোগ করেন, পর্যটক নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরের সুপারিশ পর্যটন মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করেনি। একা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে সব করা সম্ভব নয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাবেদ আহমেদ সমকালকে বলেন, অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছি। দ্রুত এসব বাস্তবায়ন হবে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয় সুপারিশ করেছিল, কমপক্ষে তিন বছরের জন্য পর্যটক যাওয়া নিষিদ্ধ করে তারপর শুধু দিনের বেলায় পর্যটন চালু রাখা যায়। পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সরকারকে হোটেল-মোটেলের সব জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এ সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ বিষয়ে জাবেদ আহমেদ বলেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটক বন্ধের বিষয়ে সবাই একমত হলে আমারা সহায়তা করব। ইতোমধ্যে আমরা পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নিয়েছি, তা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সমকালকে বলেন, সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্তৃত্ব পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বাধার মুখে বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। কারণ, তারা সোনার ডিম পাড়া হাঁস একবারে কেটে সব ডিম বের করে আনতে চায়। তাদের কাছে পরিবেশের চেয়ে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সেন্টমার্টিনে রাত যাপন দ্রুত বন্ধ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, পুরোনো কয়েকটি ভবন রেখে সব ভেঙে দিতে হবে, আর কোনো স্থাপনা করতে দেওয়া যাবে না। লাইটিং ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে।

পর্যটক যাওয়া বন্ধে একটি উদাহরণ টেনে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ব্যাংককে সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট ফুকেটে করোনার আগে দুই বছরের জন্য পর্যটক যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই দেশের সরকার ফুকেটের পরিবেশ বাঁচিয়ে পর্যটনের কথা চিন্তা করে। আমাদেরও সেই রাস্তায় হাঁটতে হবে।