গত ১৯ মার্চ থাইল্যান্ডের ফুকেটে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং স্টেজ ওয়ান আরচারি টুর্নামেন্টে প্রথম বাংলাদেশের আরচার হিসেবে একসঙ্গে তিন সোনা জিতে রেকর্ড গড়েন নাসরিন আক্তার। থাইল্যান্ডের ফুকেটে গত মার্চে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপের 'রিকার্ভ মিশ্র দলগত' ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছেন বাংলাদেশের আরচার রোমান সানা ও নাসরিন আক্তার জুটি। ১৯ মার্চ দুপুরে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ভারতের পার্থ সালুঙ্খে ও রিধি ফোরকে ৫-৩ সেট পয়েন্টে হারিয়ে স্বর্ণ জেতেন বাংলাদেশের দুই আরচার। প্রথম সেটে রিধি ও সালুঙ্খের কাছে ৩৭-৩৪ ব্যবধানে হেরে যান রোমান-নাসরিন। ভারত পায় ২ পয়েন্ট। তবে পরের সেটে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩৭-৩৭ পয়েন্টে ড্র করেন বাংলাদেশের এই দুই আরচার। তাতে ১ পয়েন্ট আসে বাংলাদেশের ঝুলিতে। তৃতীয় সেটে ভারতের আরচারদের ৩৮-৩৫ ব্যবধানে হারিয়ে ২ পয়েন্ট অর্জন করে বাংলাদেশ। আর চতুর্থ সেটে ৩৭-৩৬ ব্যবধানে হারিয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে ৫-৩ সেট পয়েন্ট স্বর্ণ জিতে নেন রোমান ও নাসরিন। এর আগে কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক থাইল্যান্ড ও সেমিফাইনালে কাজাখস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশ দল রিকার্ভ মিশ্র দলগত ইভেন্টের ফাইনালে উঠেছিল।

র‌্যাঙ্কিং রাউন্ডে নাসরিনের চমক
এশিয়া কাপ-ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং আরচারির স্টেজ ওয়ানের মেয়েদের রিকার্ভ এককের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডেও চমক দেখিয়েছেন নাসরিন আক্তার। থাইল্যান্ডের ফুকেটে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে অংশ নেওয়া ১৮ জন আরচারের মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছেন বাংলাদেশের এই আরচার। ৭২০ পয়েন্টের মধ্যে নাসরিন পেয়েছেন ৬৪২ পয়েন্ট। এ রাউন্ডে ৬৪৭ পয়েন্ট পেয়ে প্রথম হয়েছেন ভারতীয় আরচার রিধি। বাংলাদেশের মেয়েদের রিকার্ভের অন্যতম সেরা আরচার দিয়া সিদ্দিকীকেও টপকে গেছেন নাসরিন। ৬১৬ পয়েন্ট পেয়ে এই রাউন্ডে দিয়ার অবস্থান অষ্টম। ৬০৮ পয়েন্ট পেয়ে নবম হয়েছেন এই টুর্নামেন্টে প্রথম খেলতে যাওয়া বিকেএসপির দশম শ্রেণির ছাত্রী ফাহমিদা সুলতানা। গত নভেম্বরে ঢাকায় হয়ে যাওয়া এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপের তুলনায় পারফরম্যান্সে অনেক উন্নতি হয়েছে নাসরিনের। ঢাকায় বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে এশিয়ান আরচারি চ্যাম্পিয়নশিপে নাসরিনের স্কোর ছিল ৬২৯। এবার থাইল্যান্ডে তা ১৩ পয়েন্ট বেড়েছে নাসরিনের।

একটু পেছনে ফিরে
নাসরিন আক্তারের আরচারিতে আসাটাও হুট করে। ২০১৪ সালের কথা। তখন তিনি মিরপুর সরকারি বাঙ্‌লা কলেজে পড়তেন। ছিলেন বিএনসিসির ক্যাডেটও। বাঙ্‌লা কলেজের তৎকালীন ক্রীড়া শিক্ষক ফারুক ঢালী আবার আরচারি ফেডারেশনের সদস্য। ২০১৪ সালে এই স্যারের হাত ধরেই আরচারিতে আসা নাসরিনের। যদিও এর আগে কোনো খেলাধুলায় অংশ নেননি নাসরিন। ফারুক স্যার বিভিন্ন সময় নাসরিনকে অনুপ্রাণিত করেন। এরই মধ্যে কলেজে বিএনসিসি থেকে ঘোষণা আসে- যারা আরচারি খেলতে চাও নাম লেখাও। পরদিন থেকে কলেজ মাঠেই শুরু হবে অনুশীলন। পরদিন নাসরিন চুপি চুপি গিয়ে দেখেন, সিনিয়ররা অনুশীলন করছে। অনুশীলন ভালো লাগলে তিনিও নাম লেখাতে চাইলেন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে বিষয়টা আলোচনা করতেই বিগড়ে বসেন মা। মা রাজি না হলেও নাসরিন নিজের সিদ্ধান্তে অটুট। ঠিকই নাম লেখালেন এবং রোজ কলেজে গিয়ে অনুশীলন করতেন।
বাঙ্‌লা ক্লাবের সেরা খেলোয়াড় হয়ে সেনাবাহিনীতে

মিরপুর সরকারি বাঙ্‌লা কলেজে একসঙ্গে বেশ কয়েকজন অনুশীলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা কাপ আরচারির প্রতিযোগিতার জন্য শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন কেবল নাসরিনসহ দু'জন। অনুশীলনের পর মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কাঙ্ক্ষিত টুর্নামেন্টে বাঙ্‌লা ক্লাবের হয়ে খেলেন নাসরিন আক্তার। তখন খেলার অত নিয়ম-কানুন বুঝতেন না নাসরিন। ফারুক স্যার বলেছিলেন, নিশানা ঠিক রেখে তীরটা মারলেই হবে। সেটাই করেছিলেন নাসরিন। ফলে প্রথমবারেই কিস্তিমাত! বাঙ্‌লা ক্লাবের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন নাসরিন। ভালো খেলার সুবাদেই সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে যান নাসরিন।

যেভাবে জাতীয় দলের ক্যাম্পে
এরপর প্রায় এক বছর নেন আরচারির মৌলিক প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৬ সাল থেকে আবার আরচারিতে মনোযোগ দিলেন। রিকার্ভে টানা অনুশীলনের পর নিজের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস জন্মে যে, জাতীয় দলের জন্য ট্রায়াল দিলে তিনি সুযোগ পেয়ে যাবেন। অনুশীলন শেষে ফেরার পথে সিনিয়রদের কাছ থেকে প্রায়ই জাতীয় দলের ট্রায়ালের খোঁজ-খবর নিতেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালের জুনে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের দল গঠনের জন্য ওপেন ট্রায়াল হলো। ট্রায়ালের সুযোগ পান নাসরিন। ট্রায়াল স্কোরিংয়ে প্রথম আটজনের মধ্যে সপ্তম স্থান অর্জন করেন নাসরিন। এই আটজন সুযোগ পেল পরবর্তী ম্যাচে খেলার। পরবর্তী ম্যাচে চতুর্থ হয়ে ন্যাশনাল ক্যাম্পে সুযোগ পেয়ে যান নাসরিন। সুযোগ পেয়েই ২০১৭ সালে অংশ নিয়েছিলেন এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। ২০১৮ সালে জাতীয় আরচারিতে সোনা জিতেন তিনি।

ইনজুরি থেকে ফিরেই রেকর্ড
এরপর একে একে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে দলগতভাবে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেন। ২০১৯ সালে কিরগিজস্তান দলগত মিশ্র রৌপ্যপদক জিতেন। ২০২১ সালের জাতীয় আরচারিতেও সোনা জেতেন নাসরিন। জেতেন বাংলাদেশ গেমসও। তবে গত বছর সুইজারল্যান্ডে বিশ্বকাপের ট্রায়াল থেকে অল্পের জন্য ছিটকে পড়েন। ২০২২ সালে এসে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং স্টেজ ওয়ান আরচারি টুর্নামেন্টে আর সেই ভুল করেননি। গত ১৯ মার্চ তিনটি স্বর্ণপদক জয় করেন নাসরিন। অথচ এই আসরের আগে লম্বা সময় খেলার বাইরে ছিলেন কাঁধের ইনজুরির কারণে। এক পর্যায়ে খেলায় অংশ নেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল নাসরিনের। কিন্তু কঠোর অনুশীলন এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথে নামেন নাসরিন। সেই সঙ্গে মায়ের দোয়াও ছিল। দেশ ছাড়ার আগে মেয়ের মাথায় হাত রেখে মাও মেয়ের প্রতি নিজের বিশ্বাসের কথা বলে দোয়া করে দিয়েছিলেন। আর তাতে ভর করেই নিজের দক্ষতায় ঝুড়িতে পুরেছেন তিনটি স্বর্ণ। তীর-ধনুক ঘিরে এগিয়ে চলা নাসরিন আক্তারও স্বপ্ন দেখেন অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের। ২০২৪ সালের অলিম্পিকে আরচারিতে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে আনবেন রোমান, নাসরিন ও দিয়ারা; এমন স্বপ্ন তো আমরা দেখতেই পারি।