আগের দিন পায়ে টান পড়ায় কোর্টে কেঁদেছিলেন। রাত না যেতেই পুরোদস্তুর সুস্থ টেবিল টেনিস খেলোয়াড় সোনম সুলতানা সোমা! কমনওয়েলথ গেমসে ৫ আগস্ট মেয়েদের দ্বৈত ইভেন্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সাদিয়া রহমান মৌয়ের সঙ্গে তাঁর খেলা নিয়ে কেটে যায় সংশয়। বার্মিংহামের এনইসি হলে দুপুর ও বিকেলে শিডিউল অনুযায়ী সোমা ও মৌয়ের কোর্টে নামার কথা। কিন্তু ম্যাচ নেই বলে মিথ্যা কথা বলার সঙ্গে লন্ডনে ঘুরতে যাওয়ার জন্য স্বয়ং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলমকে অফার করেন তাঁরা।

বেপরোয়া হয়ে ওঠা এ দুই নারী টিটি খেলোয়াড়কে নিজেরা সামলাতে না পেরে গেমসের সেফ দ্য মিশন আবদুর রকিব মন্টুর দ্বারস্থ হয়েছিলেন টেবিল টেনিসের কর্তারাও। তিনিও তাঁদের পাচ্ছিলেন না। একসময় সবাই ধরে নিয়েছিল, অনুমতি না নিয়ে গেমস ভিলেজ থেকে চলে যাওয়া সোমা ও মৌ পালিয়েছেন। তখন পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার চিন্তাও করছিলেন বলে বার্মিংহাম গেমসে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত সেদিন রাত সাড়ে ৮টায় ভিলেজে ফেরেন সোমা ও মৌ। কমনওয়েলথ গেমসে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দু'জনকে ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় দুই এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হবে তাঁদের। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে আসবে নিষিদ্ধের ঘোষণা।

ভরাডুবির কমনওয়েলথ গেমসে শুধু ব্যতিক্রম ছিল টেবিল টেনিস। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে বার্মিংহাম গেমসে উত্থানের যে গল্প লিখেছিল টিটি, তাতে এই ইভেন্ট নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখছিলেন ক্রীড়াবোদ্ধারা। হৃদয়-রাহমিমরা চারদিক থেকে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছিলেন। অথচ সেই টিটি কিনা লজ্জায় ডুবিয়েছে বাংলাদেশকে। ইনজুরির নাটক সাজিয়ে না খেলে লন্ডনে এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যান টিটির দুই নারী তারকা, যা জঘন্য অপরাধ বলেই বিবেচিত। না খেলে প্রতিপক্ষকে ওয়াকওভার দিয়ে দেশকে কলঙ্কিত করেছেন তাঁরা। যাঁদের গায়ে ছিল লাল-সবুজের পতাকা, তাঁরাই কিনা দেশের সঙ্গে করলেন বেইমানি!

সেই কর্মকর্তা মঙ্গলবার সমকালের সঙ্গে জানিয়েছেন কতটা উগ্র ছিলেন সোমা ও মৌ, 'তাদের আচরণ দেখে মনে হয়েছে, তারা যেন ব্যক্তিগত টাকায় গেছে, ঘুরতে গেছে। দেশের টাকায় গেছে, এটা অলিম্পিক; তারা কিন্তু তা মনে করেনি। তারা তাদের বসদের কথা শোনে না। সেফ দ্য মিশনের অনুমতি ছাড়া বাইরে চলে গিয়েছে। আগের দিন তারা যে ইনজুরি দেখিয়েছে, খেলার সময় তারা চলে গেছে বাইরে। এটা শিষ্টাচারবহির্ভূত।'

ঘটনার দিনই বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজাকে অবহিত করা হয় সবকিছু। কিন্তু তুরস্কের কোনিয়ায় ইসলামিক সলিডারিটি গেমস আছে বলে সবাই মুখ কলুপ এঁটেছিল। ফেডারেশনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবাই শতচেষ্টা করেও যখন সোমা ও মৌয়ের খবর পাচ্ছিল না, তখন অনেকেরই অতীতের কেলেঙ্কারির কথা মনে পড়েছিল।

কারণ, অতীতে গেমস খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের অ্যাথলেটের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল, তা ফুটে উঠেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তার কণ্ঠে, 'বিকেলে খেলা আছে, অথচ তারা বলেছে খেলা নেই। দুপুরে ভিলেজ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া দুই অ্যাথলেটের জন্য রাত ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন কর্মকর্তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ছবি দেখে এতটুকু নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে, তারা লন্ডনে আছে। কিন্তু রাতেও ভিলেজে তারা না আসায় এমনও কথা উঠেছিল- তারা পালিয়ে গেছে। এমনকি সোমা ও মৌ পালিয়ে গেছে- এমন খবরটি বিওএ মহাসচিবকে জানানোর কথাও বলেছিলেন ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা।'

নিষেধাজ্ঞাটা চাইলে বার্মিংহামেই দিতে পারত ফেডারেশন। কিন্তু তুরস্কের কোনিয়ায় ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে সোমা ও মৌয়ের খেলা আছে বলেই চুপ ছিল সবাই। তাই দেশে এসে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিল টিটি ফেডারেশন। তবে বার্মিংহামে টিটির কর্মকর্তাদের গাফিলতিও ছিল মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। কারও কারও ধারণা, কর্মকর্তাদের অনুমতি না পেলে খেলা রেখে লন্ডনে ঘুরতে যেতে পারত না সোমা ও মৌ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিটি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাখ্যা, 'তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি। আমাদের কিছুই করার ছিল না।' যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, সেই সোমা ও মৌকে ফোন দিলেও তাঁরা রিসিভ করেননি।