ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

হাথুরিসিংহের সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশে যেতে চাই তবে...

বাংলাদেশে যেতে চাই তবে...

চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। ছবি- ফাইল

সেকান্দার আলী, সিডনি থেকে

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২২ | ০১:৫৫

বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এখন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ক্রিকেট একাডেমির কোচ। অথচ গত বছর বিসিবির কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে চাকরিতে যোগ দিতে রাজি হননি। তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কাজ করতে চান তিনি। জাতীয় দলের সাবেক এ কোচ জানান, সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। কোচিং ক্যারিয়ার, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও টি২০ বিশ্বকাপের সম্ভাবনা নিয়ে চন্ডিকা হাথুরুসিংহে সিডনিতে কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে

সমকাল :আপনি কি বাংলাদেশে কোচের চাকরি নিচ্ছেন?

হাথুরু :হাসি...। আমি তো চাই, তবে এখন না।

সমকাল :আগামী বছর হতে পারে?

হাথুরু :হতে পারে, নাও হতে পারে। কারণ এখনও আমার ছেলেরা ছোট। ছোট ছেলের বয়স ১৫ বছর। আমাকে আরও কিছুটা সময় দিতে হবে। সে ক্রিকেট ভালোবাসে। তাকে তৈরি করার ব্যাপার আছে। আমি বিসিবিকে হয়তো না বলব না। কারণ আমি ওখানে (বাংলাদেশে) যেতে চাই। দুই পক্ষের জন্যই উপযুক্ত সময়ে যেতে চাই।

সমকাল :সঠিক সময়টা কখন আসবে?

হাথুরু :সঠিক সময় বলতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সময়কে বোঝাচ্ছি। উভয় পক্ষের লাভ হবে, সেভাবে সময় বেছে নেব। এটা সঠিক সময় না। কমিটমেন্ট বলতে বড় কিছুকে বোঝাচ্ছি। কারণ প্রতিশ্রুতি দিলে সেটাকে পুরোপুরি পূরণ করতে হয়। বাংলাদেশ অন্যতম সেরা ক্রিকেট নেশন। ক্রিকেট নিয়ে ওখানে কতটা আবেগ, তা জানি। শতভাগ দিতে না পারলে অন্যায় করা হবে।

সমকাল :আগামী বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে বিসিবি তো আপনাকে চাইতে পারে?

হাথুরু :আমার মনে হয় না এটা সম্ভব। সেটেল কোচিং ইউনিট রয়েছে। নতুন যোগ হয়েছে টি২০ বিশ্বকাপের জন্য। ওয়ানডে বিশ্বকাপের মাত্র ১০ থেকে ১২ মাস বাকি আছে। এত কম সময়ে যে কারও জন্য বড় পরিবর্তন করা কঠিন। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ওয়ানডে দলটা ভালো করছে। আশা করি, ভারত বিশ্বকাপে ভালো করবে। কারণ কন্ডিশন বাংলাদেশের মতোই।

সমকাল :আপনার সময়ে বাংলাদেশ তিন সংস্করণেই ভালো করেছে। ২০১৬ সালের টি২০ এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছে। আপনি চলে গেলেও ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফিতে ভালো করেছে। ওই মুহূর্তগুলো মিস করেন?

হাথুরু :ওহ। আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মিস করি। আমার সময়ে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছে। সে মুহূর্তগুলো আমি মিস করি তা বলব না। কারণ আমি এখানে কোচিং করাই। অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার এখানে আসে। এই ছেলেগুলোকে নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসি। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছি। আমি যেটা এখানে করতে চাই, সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি। যেটা আমি খুব উপভোগ করি।

সমকাল :বিসিবি কেন আপনাকে এত পছন্দ করে?

হাথুরু :সত্যি বলতে আমি জানি না। তারা প্রথম যখন বলল জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে যোগ দিতে আমি খুবই খুশি ছিলাম। তখন আমি বড় কিছু ছিলাম না। আমাকে সেভাবে প্রমাণ করতে হয়নি। হ্যাঁ, আমি শ্রীলঙ্কা 'এ' দলের কোচ ছিলাম। জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেছি। বাংলাদেশের কোচ হওয়ার পর কিছু সাফল্য আমাকে সাহস দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আমি কৃতজ্ঞ এজন্য, আমার মতো একজন অপরিচিত কোচকে নিয়োগ দিয়েছিল।

সমকাল :সৌম্য, লিটন, মুস্তাফিজের মতো বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে আপনি দলে নিয়েছিলেন। তাঁরাই এখন লিড করছে। কাজটা কি কঠিন ছিল তখন?

হাথুরু :তোমার মনে আছে। হাসি..। আমার বিপক্ষে ছিল অনেকেই। এর পরও এই ছেলেগুলোকে নিয়েছিলাম। এই খেলোয়াড়রা খুবই প্রতিভাবান, সে কারণে নিয়েছিলাম। তখন বলেছিলাম, তারা সুপারস্টার হবে। সত্যিই কিন্তু লিটন, মুস্তাফিজরা সুপারস্টার হওয়ার পথে।

সমকাল :এবার টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কত দূর যাওয়ার সম্ভাবনা দেখেন?

হাথুরু :বিশ্বকাপ নিয়ে জানতে চাইলে সেটা একরকম। অন্যটা হলো টি২০ তে কেন প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বিশ্বকাপটা চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ টি২০ ক্রিকেটে তাদের সাফল্য নেই। এখানে কন্ডিশন কঠিন। অন্য দলগুলো স্কিল এবং গেমের মেজাজ বুঝে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো খেলতে পারে। তবে টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোন স্টাইলে খেলা উচিত সেটা বুঝতে হবে। নিজেদের সামর্থ্য বুঝে খেলার কৌশল বেছে নেবে। কারণ টি২০ ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। আইপিএল ভারতের টি২০ দলটাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা আইপিএল খেলে। তারা ঘরোয়া টি২০ টুর্নামেন্ট বিগ ব্যাশ, ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতেও ভালো খেলে। এখান থেকে তারা আত্মবিশ্বাস পায়। তারা জানে কীভাবে টি২০ ক্রিকেট খেলতে হয়। জিনিসগুলো ধরতে বাংলাদেশের কিছুটা সময় প্রয়োজন।

সমকাল :সাকিব আল হাসানই কি বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার না অন্য কারও মাঝে সেটা দেখতে পান?

হাথুরু :কঠিন প্রশ্ন। সাকিব আল হাসান একটাই তৈরি হয়েছে। তার জেনারেশনের সেরা ক্রিকেটার। বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার। লম্বা সময় ধরে খেলছে। সাকিবের মতো আর একজনকে খুঁজে পেতে বাংলাদেশকে কাঠখড় পোড়াতে হবে। সাকিবের মতো কেউ হবে না। তারা হয়তো ভিন্ন সুপারস্টার পাবে, কিন্তু সাকিবের মতো কাউকে পাবে না। ২০০৭ সালের দিকে লক্ষ্য করেন, কত জন ক্রিকেটার এসেছিল বাংলাদেশ দলে। মুশফিক, তামিম, সাকিব একসঙ্গে খেলেছে। পাঁচ থেকে সাত বছর লেগেছে এই ক্রিকেটারদের কাছ থেকে ফল পেতে। এখন যেমন লিটন, মুস্তাফিজ, তাসকিন ভালো করছে। তারা আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলে। সে কারণেই বলছি বাংলাদেশ সুপারস্টার ক্রিকেটার পাবে কিন্তু সাকিবের মতো কাউকে পাবে না।

সমকাল :আপনার সময়ের ক্রিকেটাররা ফোন করেন?

হাথুরু :তারা সবাই মাঝেমধ্যেই যোগাযোগ করে। তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে।

সমকাল :তাঁরা কি কোনো পরামর্শ চান?

হাথুরু :অনেক কথাই হয়। তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার নিয়ে কথা হয়। মাঝেমধ্যে ক্রিকেট নিয়েও এটা-ওটা জানতে চায়। আমি কী করছি সেটাও জানতে চায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

সমকাল :আপনাকে তো গত বছর বিসিবি থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কেন গ্রহণ করেননি। এ ছাড়া কেনই বা ২০১৭ সালে বিসিবির চাকরি ছেড়েছিলেন?

হাথুরু :আমরা সব সময় রেজাল্ট দিতে পারব না। আমরা প্রসেস শেখাতে পারি। কোচরা সিস্টেম গড়ে তোলা এবং সেরা সুযোগ-সুবিধা ক্রিকেটারদের জন্য নিশ্চিত করতে পারেন। যাতে তারা সেরাটা করতে পারে। আমি তখন চাকরি ছেড়েছিলাম চুক্তির শেষের দিকে পৌঁছে গিয়েছিলাম। এ ছাড়া আমার দেশের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলাম। সে কারণেই চাকরিটা ছেড়েছিলাম। এ ছাড়া কিছু ছিল না। আর এখন চাকরি নিতে পারিনি উপযুক্ত সময় না আসায়।

সমকাল :আপনি তো বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেমন- মাশরাফির টি২০ ছেড়ে দেওয়া, মুশফিকের টেস্ট কিপিং থেকে সরিয়ে ব্যাটার হিসেবে খেলানো। লিটনকে কিপিংয়ে আনা।

হাথুরু :কোনো সিদ্ধান্তই আমি একা নিইনি। নির্বাচক, খেলোয়াড় এবং বিসিবি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হতো। সবার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হতো। আমি নির্বাচকদের ব্যাখ্যা করতাম- কেন পরিবর্তনগুলো করতে চাই। তাঁরা বোর্ডকে বোঝাতেন। কিছু সিদ্ধান্ত তাঁরা সাপোর্ট করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে করেননি।

সমকাল :আপনার সময়ে বলেছিলেন মুমিনুল হক দেশের মাটিতে ভালো খেলোয়াড়। বিদেশে ভালো করবে না। শততম টেস্টে বাদ দিয়েছিলেন। এর পর সে অধিনায়ক হয়েছে, এখন আবার বাইরে। এখন সবাই বলছে হাথুরু ঠিক বলেছিলেন।

হাথুরু :তার সামর্থ্য নিয়ে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। শততম টেস্টের আগে সে ছন্দে ছিল না। আমরা যেভাবে খেলতে চেয়েছিলাম সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মুমিনুলকে বিশ্রাম দিতে হয়েছিল। এটা ছিল টেকটিক্যাল সিদ্ধান্ত। মোসাদ্দেক, সাব্বির রহমান তখন ভালো করছিল। মুমিনুল সত্যিই খুব ভালো ক্রিকেটার। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশকে সে লম্বা সময় সার্ভিস দেবে।

সমকাল :বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান কে?

হাথুরু :খুবই কঠিন প্রশ্ন। রেকর্ডের দিকে তাকালে তামিম, সাকিব সবার ওপরে। মুশফিকও ভালো করছে। শেষ ৫ বছরে ওয়ানডে এবং টেস্ট ক্রিকেটে তার গড় ৫০। তারা সব দলের বিপক্ষে খেলেছে। খুবই কোয়ালিটি ক্রিকেটার তারা। যে কোনো দলের বিপক্ষে ভালো খেলতে পারে তারা। আত্মবিশ্বাস খুবই উঁচুতে।

সমকাল :৭ বছর আগে বাংলাদেশ ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার খেলেছিল। ৭ বছর পরে টি২০ বিশ্বকাপে খেলছে বাংলাদেশ। খেলা দেখতে যাবেন?

হাথুরু :প্রথমত, আমার অনেক সময় নেই। পরশু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলার দিন আমাকে একাডেমিতে অনুশীলন করাতে হবে। কাল (আজ) অনুশীলন করিয়ে একটা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করব। আর এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ২-৩টা ম্যাচ জিততে পারলেই দারুণ কিছু অর্জন হবে। তাদের ফর্ম এবং টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্স খুব বেশি ভালো না। তবে তাদের স্বাধীনতা নিয়ে খেলতে হবে পরের দুই ম্যাচে।

আরও পড়ুন

×