ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

বিশ্বকাপের সাদাকালো ইতিহাস

বিশ্বকাপের সাদাকালো ইতিহাস

কাতার বিশ্বকাপের জন্য সেজেছে দেশটি। ছবি: ফাইল

...

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২২ | ০৫:৫১

উনিশ শতকের সেই ত্রিশের দশক- জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে খেলতে আসা থেকে শুরু। তার পর তো বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ব রাজনীতিতে মুসোলিনি-হিটলারের দাপট- সবই দেখেছে বিশ্বকাপ ফুটবল। সাক্ষী থেকেছে ফুটবলের কিংবদন্তি পুসকাস, ক্রুয়েফ, পেলে, ম্যারাডোনা, প্লাতিনি, জিদান হয়ে বড় রোনালদোর পায়ে এই খেলাটার শৈল্পিক রূপ পাওয়ার। আর এসব নিয়েই বিশ্বকাপের গত শতাব্দীর কিছু চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস তুলে আনার চেষ্টা করেছেন সঞ্জয় সাহা পিয়াল

বিশ্বকাপের ভাবনা লোহালক্কড় আর মেশিন নিয়ে পড়ে থাকা জার্মানদের আদি স্বভাবটা যেমন সত্য, তেমনি বাণিজ্য লক্ষ্মীর সন্ধানে বেরিয়ে ক্ষমতা হাতিয়ে নেওয়া ব্রিটিশদের স্বভাবটাও চিরস্বীকৃত! ইউরোপের মধ্যে শুধু ফরাসিরাই এসবের বাইরে গিয়ে কৃষ্টি, সংস্কৃতি আর নতুন নতুন উদ্ভাবনের চর্চা করে গেছে। সৃষ্টির এই মানসিকতা ফরাসিদের রক্তেই ছিল। ফুটবল নিয়ে ইংরেজদের একটা প্রবল জাত্যাভিমান ছিল উনিশ শতকের আগে থেকেই। তারা ফিফারও আগে নিজেদের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) গঠন করেছিল। কিন্তু ফরাসিরাই প্রথম এফএর বশ্যতা থেকে বেরিয়ে বিশ্ব ফুটবল সংস্থা (ফিফা) করতে চেয়েছিল। যার বিরোধিতা করে সরে দাঁড়িয়েছিল ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ।

ফরাসিরা যখন বিশ্বকাপ নিয়ে ভেবেছে, ইংরেজরা তখন নিজেদের এফএ নিয়েই গর্বিত থেকেছে। ব্রিটিশরা তখনও বুঝতে পারেনি তাদের জাত্যাভিমানে গড়া এফএ নয়, ফরাসিদের বৈশ্বিক ফিফা এবং ফিফা বিশ্বকাপই একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে এই বিশ্বব্রহ্মা। ব্রিটিশদের প্রবল আপত্তিতেও তাই প্যারিসে ফিফা প্রতিষ্ঠিত হয়, ২১ মে ১৯০৪। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড- সাত দেশ নিয়ে পথচলা শুরু হয় ফিফার। ইংরেজরা আসেননি সেখানে। তারা ধরেই নিয়েছিল নতুন ভুঁইফোঁড় এই সংস্থা কত দিন আর চলবে, ক'দিন পর সবাই সুর সুর করে এসে হাজির হবে এফএতে।

ইংল্যান্ডের বাইরে ফুটবল, সে আবার হয় নাকি কখনও! এমনই এক অন্ধ গরিমায় বুঁদ ছিল ইংরেজরা। ১৯২০ সালে ফিফা কংগ্রেসে প্রথম বিশ্বকাপের মতো একটি আসরের প্রয়োজনীয়তার কথা ওঠে। সেবার মুখে মুখেই ওই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল। চার বছর পর সেই সভায় আর বিষয়টি শুধু আলোচনার মধ্যে না থেকে প্রস্তাবনা আকারে জমা পড়েছিল। তত দিনে অলিম্পিক আসরে ফুটবল তার বাজার ধরে নিয়েছে। উরুগুয়ে অলিম্পিক ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন। ১৯২৪ অলিম্পিকে উরুগুয়ে-সুইজারল্যান্ড ফাইনাল দেখতে মাঠে হাজির প্রায় ৬০ হাজার দর্শক। বাজার বুঝে ফিফা শর্ত দিল অলিম্পিক সংস্থাকে। যদি অলিম্পিকের আসরেও ফুটবল হয় তাহলে সেটা ফিফার নিয়ম অনুযায়ীই হতে হবে। অলিম্পিক সংস্থা মাথা পেতেই মেনে নিয়েছিল সেই শর্ত।

১৯২৬ সালের ফিফা কংগ্রেসে জোরালো সাওয়াল তোলেন সচিব অঁরি দেলাউঁ। 'আজ আন্তর্জাতিক ফুটবল এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, অলিম্পিকের আসরে আর তার বিকাশের পক্ষে আদর্শ নয়। বহু দেশ যেখানে পেশাদারিত্ব স্বীকৃত এবং সর্বজনগ্রাহ্য সেসব দেশের ফুটবলাররা সবাই অলিম্পিকে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের জন্য এমন কোনো প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হোক।' ফিফা বুঝে যায়, অলিম্পিকের ছাতার নিচ থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে তাদের। ফিফার সভাপতি তখন জুলে রিমে, তিনি তাঁর সচিবকে নির্দেশ দিলেন ১৯২৮ সালের ফিফা কংগ্রেসে বিশ্বকাপের প্রস্তাবটি তুলতে। আপত্তি এলো পাঁচ দেশ থেকে- স্ক্যান্ডিনেভিয়ার চার দেশ (সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড) এবং এস্তোনিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২৫-৫ ভোটে জিতে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল, বিশ্বকাপ হবেই। তারিখটি ছিল- ২৮ মে, ১৯২৮। বিশ্বকাপের জন্মদিন!

কোথায় হবে প্রথম বিশ্বকাপ? ফিফা জানতে চাইল, প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজন করতে কোন কোন দেশ আগ্রহী, হাত তোল। দেখা গেল, বিশ্বকাপের বিপক্ষে ভোট দেওয়া সুইডেনই প্রথম আয়োজক হতে আগ্রহ প্রকাশ করল। একে একে ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং স্পেনও বলল; তারাও এই ইতিহাসের সাক্ষী হতে চায়। কিন্তু ইউরোপজুড়ে তখন ব্যাপক আর্থিক সংকট চলছে। সেখানে এমন একটি আসরের আয়োজন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য সবার ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত ইউরোপের কেউ নয়, আয়োজনের সুযোগ পেল উরুগুয়ে। যদিও তাদেরও আর্থিক সচ্ছলতা তেমন ছিল না। ওয়াল স্ট্রিট শেয়ারবাজারে ধস বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল তাদের। কিন্তু তখন তারা শেষ দুইবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে ইংরেজদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন শক্তির উন্মোচন করেছেন তারা লাতিন অঞ্চলে। তা ছাড়া ১৯৩০ সাল ছিল উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবার্ষিকী। তাই সব মিলিয়ে ফিফার ফরাসি সভাপতি জুলে রিমে উরুগুয়েকেই আয়োজক হিসেবে ঘোষণা করলেন। উরুগুয়েও ফিফাকে প্রতিশ্রুতি দিল তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দেবে। নতুন স্টেডিয়াম বানাবে তারা মন্তেভিদিওতে।

আরও পড়ুন

×