সেমিফাইনাল এবং বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা

প্রকাশ: ২২ মে ২০১৯     আপডেট: ২২ মে ২০১৯      

ফাহমিদ সৌরভ

ছবি: ফাইল

যতো দিন যাচ্ছে ক্রিকেটভক্তদের টেনশন আরো বাড়ছে। আর মাত্র দিন কয়েকপর ক্রিকেট বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মাঠে নামবে দলগুলো। কয়েক বছর ধরে অসাধারণ ক্রিকেট খেলে সমীহ আদায় করে নিয়েছে বাংলাদেশও। এবারের আসরের শেষ চারের হিসাবে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে মাশরাফির দল।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২ জুন মাঠে নামবে বাংলাদেশ। দুই দলেরই প্রথম ম্যাচ বলে সেরা একাদশই নামাবেন মাশরাফি ও ডু প্লেসিস। সব কিছু ঠিক থাকলে কাগিসো রাবাদা, ডেল স্টেইন, আন্দিলে ফেলুকায়ো, ইমরান তাহির, ক্রিস মরিসদের মোকাবেলা করতে হবে তামিম-লিটন-সাকিবদের। কেবল কাগজে কলমেই নয় ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যানে এই ম্যাচে বাংলাদেশের চেয়ে যোজন ব্যবধানে এগিয়ে প্রোটিয়ারা। তবে টাইগারভক্তদের সাহস যোগাচ্ছে গত দেড় বছরে ব্যাটসম্যানদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স।

২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৬ ওয়ানডেতে ৯৮২ রান করেছেন মুশফিকুর রহিম। এছাড়া তামিম, সৌম্য, সাকিব আল হাসানরা ব্যাট হাতে দারুণ ছন্দে রয়েছেন। এ বছর ৬ ওয়ানডে খেলে সৌম্য করেছেন ২৪৫ রান, ৭ ম্যাচে মুশির সংগ্রহ ২১২। আয়ারল্যান্ড সফরে টাইগার ব্যাটসম্যানরা যেভাবে ব্যাটিং তাণ্ডব চালিয়েছেন সেই ফর্মটা ইংল্যান্ডে ধরে রাখতে পারলে বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো প্রোটিয়াবধ অসম্ভব কিছু নয়।

২০১৯ সালে প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ফর্মটা দেখলে বাংলাদেশের জয়টাকে দূরের কোনো বস্তু মনে হবে। এ বছর ৮ ম্যাচে ৫৮ গড়ে ৪৬৯ করেছেন কুইন্টন ডি কক, ১০ ম্যাচে ৪২৭ রান করেছেন ফ্যাফ ডু প্লেসিস আর ৯ ম্যাচে ৩৫৩ রান করেছেন ভ্যান ডার ডুজেন। এছাড়া হাশিম আমলা ও ডেভিড মিলাররাও রয়েছেন দুরন্ত ফর্মে।

বোলিং ফর্ম বিবেচনায় নিলেও টাইগারদের চেয়ে প্রোটিয়াদের এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। এবছর আগুনে বোলিং করেছেন রাবাদা-তাহির-এনগিডিরা। ৯ ম্যাচে রাবাদা নিয়েছেন ১৩ উইকেট। ৭ ম্যাচে তাহির নিয়েছেন ১১ আর মাত্র ৫ ম্যাচে এনগিডির ঝুলিতে রয়েছে ৯ উইকেট। এছাড়া সদ্য সমাপ্ত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত বোলিং করেছেন রাবাদা-তাহির। ১৭ ম্যাচে তাহির নেন ২৬ উইকেট, সেখানে মাত্র ১২ ম্যাচে ২৫টি উইকেট দখল করেন রাবাদা। টি-টোয়েন্টিতে এমন বিস্ফোরক বোলিং করলে ওয়ানডেতে কি করবেন তারা! এই বছর ১০ ম্যাচ খেলে ৮টিতেই জিতেছে ফ্যাফ ডু প্লেসিসের দল। তাই সব দিক বিবেচনা করলে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের চেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে এগিয়ে রাখবেন ক্রিকেটবোদ্ধারা।

৫ জুন নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। লন্ডনের কেনিংটন ওভাল মাঠে বাংলাদেশের রেকর্ডটা একেবারে যাচ্ছেতাই। তিন ম্যাচের দুটিতেই বিশাল ব্যবধানে হার গুনতে হয়েছে টাইগারদের। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত না হলে সেই ম্যাচটাও হয়তো হারতো মাশরাফির দল।

অন্যদিকে কেনিংটন ওভালে কিউইদের রেকর্ডটা মন্দের ভালো। এখানে ৭ ম্যাচে ৩ জয়ের মুখ দেখেছে দলটি। ২০১৫ সালে এই মাঠে ইংল্যান্ডকে ১৩ রানের হারায় কিউইরা। সেই ম্যাচের বেশ ক'জন ক্রিকেটার আছেন এবারের বিশ্বকাপ দলে।

২০১৯ সালটা দুর্দান্ত কাটছে রস টেলরের। ১১ ম্যাচে চার অর্ধশতক ও এক শতকে করেছেন ৫৯৩ রান। মার্টিন গাপটিল, কেন উইলিয়ামসন, হেনরি নিকোলাসরাও দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। তিনজনেরই গড়টা ৪০ এর ওপর। এছাড়া কিউই বোলাররাও আছেন দারুণ ফর্মে। এ বছর সেরা উইকেট শিকারী বোলারের তালিকায় প্রথম নামটা ট্রেন্ট বোল্টের (১০ ম্যাচে ২১ উইকেট)। লকি ফার্গুসন (৮ম্যাচে ১৪), নিশাম ও হেনরি নিয়েছেন ১০টি করে উইকেট। বাংলোদেশের কোনো বোলারই এই বছর ৮ বা তার বেশি উইকেটের মুখ দেখেননি।

এই ম্যাচে জয়ের জন্য বাংলাদেশকে সাহস যোগাচ্ছে কেনিংটন ওভালের উইকেট। গত বছর এই মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয় ইংল্যান্ড। আদিল রশিদ ও মঈন আলি দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন সেই ম্যাচে। এর আগে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচে এই মাঠেই দুবার হারের স্বাদ পেয়েছিল ভারত। গ্রুপ পর্বে শ্রীলংকা আর ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে। তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের আশা করা যেতেই পারে। অবশ্য এই ইংল্যান্ডের মাটিতেই গত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডকে হারায় বাংলাদেশ। এই ম্যাচে সেই ম্যাচের মতো খেলতে পারলে কিউই বধ খুব বেশি দূরে নয়। বলাই বাহুল্য এই ম্যাচ জিততে হলে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে স্পিনার সাকিব, মিরাজ, মাহমুদউল্লাহদের। সেমিফাইনালে যেতে হলে এই ম্যাচে জেতা টাইগারদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মাশরাফির দল তৃতীয় ম্যাচে মাঠে নামবে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণ শক্তিমত্তা ও সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনা করলে এই ম্যাচে স্বাগতিকদের বিপক্ষে পেরে ওঠার কথা নয় বাংলাদেশের। সম্প্রতি অন্য গ্রহের ক্রিকেট খেলছে ইংল্যান্ড। গত দেড় বছরে জনি বেয়ারস্টো, জেসন রয়, ইয়ন মরগান, জস বাটলার, জো রুটদের ব্যাট প্রতিপক্ষ বোলারদের কচুকাটা করেছে। ওয়ানডেতে সাড়ে তিনশ রানের কম করা ভুলেই গেছে দলটি। তার ওপর মঈন আলী, বেন স্টোকস, লিয়াম ডসন, টম ক্যারেনদের মতো অলরাউন্ডার রয়েছেন দলটিতে। বোলিংয়ে যোগ হয়েছেন জোফরা আর্চারের মতো বোলার। সেই কারণে কেবল বাংলাদেশই নয়, অন্য যে কোনো দলের জন্যই এবারের আসরে সবচয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড।

স্বাগতিকদের বিপক্ষে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার নাম কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন। এই ভেন্যুতে এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচেও হারেনি বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে আশরাফুলের মহাবাব্যিক সেঞ্চুরিতে এই মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারায় বাংলাদেশ। গত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে এই সোফিয়া গার্ডেনে সাকিব-মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং বীরত্বে রচিত হয় কিউই বধ কাব্য। সোফিয়া গার্ডেন মানেই যেন বাংলাদেশের জয়। এবার কি এই মাঠে আরও একটি ইতিহাস গড়তে পারবে টিম লাল-সবুজ?

বাংলাদেশের পরের দুটি ম্যাচ শ্রীলংকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। আশা করা যাচ্ছে যে, লঙ্কানদের বিপক্ষে জয় পেতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না বাংলাদেশের। এবারের বিশ্বকাপে শক্তিশালী দল নিয়ে মাঠে নামলেও ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে জয়ের আশা করতে পারে টিম বাংলাদেশ। এই দলটির বিপক্ষে শেষ পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই জিতেছে মাশরাফি-সাকিবরা। স্বল্প দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে গেইল-হোপ-রাসেলরা পরিক্ষীত হলেও কম যান না সাকিব-তামিম-মুস্তাফিজরাও।

ষষ্ঠ ম্যাচে টাইগারদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আর কেউ কি হতে পারে? দুই যুগের ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশ কেবল একবারই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে, সেটাও এই ইংল্যান্ডের মাটিতে। ওয়ানডেতে এ বছরটা দারুণ কেটেছে অস্ট্রেলিয়ার। ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে দলটি।

অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা এই বছর দারুণ ছন্দে আছেন। মাত্র ৬ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে রীতিমতো বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন পেসার প্যাট কামিন্স। অ্যাডাম জাম্পার ঝুলিতে ১১ ম্যাচে ১৭ উইকেট। কোল্টার নাইলের সংগ্রহ ১০।

অন্যদিকে এ বছর সেরা রান সংগ্রাহকের তালিকায় প্রথম দুটি নামই অস্ট্রেলিয়ার। ১৩ ম্যাচে ৭৬৯ রান উসমান খাজার অন্যদিকে সমান সংখ্যক ম্যাচে অ্যারন ফিঞ্চের রান ৬৩৪। পিটার হ্যান্ডসকম্ব ও মার্কাস স্টয়নিস, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলরা রয়েছেন দারুণ ফর্মে। এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরে এসেছেন ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। আইপিএলে ওয়ার্নারের ব্যাটিং যারা দেখেন তাদের বুঝতে বাকি নেই যে, ষষ্ঠ শিরোপা জেতার মতোই দল নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে অস্ট্রেলিয়া। তাই প্রথম দুটি ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও আন্ডারডগ বাংলাদেশ।

সপ্তম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান। আফগানরা ভালো খেললেও এই ম্যাচটা জিততে খুব একটা সমস্যায় পড়ার কথা নয় বাংলাদেশের। অষ্টম ম্যাচে মাশরাফিদের প্রতিপক্ষ ভারত আর শেষ ম্যাচে পাকিস্তাসের বিপক্ষে মাঠে নামবেন মাশরাফিরা। শ্রীলংকা, আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রত্যাশিত জয় পেলে সেমিফাইনালে ওঠার আশা করতেই পারে বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে চেনা প্রতিপক্ষ ভারত ও পাকিস্তান যে কোনো দলের বিপক্ষে জিততে হবে টাইগারদের।

গত কয়েকটা মাস খুব একটা ভালো কাটছে না বিরাট কোহলিদের। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি হারার পরা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পর্যদুস্ত হতে হয়েছে দলটির। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজটাই খুইয়েছে ভারত। এবারের আইপিএলে ভারতীয় তারকা ব্যাটসম্যানরা আলো ছড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন। রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান, বিরাট কোহলি, দিনেশ কার্তিকরা চেনা ছন্দে ছিলেন না। ভারতের এই দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করতে হবে বাংলাদেশকে। ভালো বোলিং করে ব্যাটিং ত্রয়ী রোহিত, কোহলি, ধাওয়ানকে দ্রুত ফেরাতে হবে। সেটা করতে পারলে ভারতকে হারানো অসাধ্য হবে না।

২০১৯ সালটা যারপনাই খারাপ কেটেছে পাকিস্তানের। ১৫ ম্যাচ খেলে কেবল দুটিতে জয়ের মুখ দেখেছে সরফরাজ খানের দল। শোয়েব মালিক-হাফিজরা থাকলেও এবারের টুর্নামেন্ট একেবারে আনাড়ি টপ অর্ডার নিয়ে খেলতে নামবে পাকিস্তান। যদিও বাবর আজম, ফখর জামান, ইমাম উলরা এরই মধ্যে সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। অনভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণও বড় চিন্তার। পাকিস্তানের দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে সেমিফাইনালে উঠাটা দুঃসাধ্য হবে না টাইগারদের জন্য। এখন কেবল মাঠের লড়াইয়ের অপেক্ষা।