পঞ্চপ্রদীপে বাংলাদেশের স্বপ্ন

প্রকাশ: ২৬ মে ২০১৯      

ফাহমিদ সৌরভ

ছবি: ফাইল

'লাকড়ি ডান্ডা, ডান্ডা গুলি' শব্দযুগল এক সময় বেশ প্রচলিত ছিল। যারা বুঝতেন না তারা এভাবেই ক্রিকেট খেলাকে সম্বোধন করতেন। ডান্ডাগুলি, ডাঙ্গুলি ছেড়ে দুই তিন দশক আগে ক্রিকেট শব্দটি আপামর বাঙালীর শব্দভাণ্ডারে গেঁথে গেছে। অঁজপাড়ায়েও এখন দারুণ জনপ্রিয় বিলেতি সাহেবদের এই খেলা। বলতে গেলে ক্রিকেট এখন বাঙালির প্রাণের খেলা। কিশোর-তরুণ থেকে মধ্যবয়সীদের আলাপ-আলোচনায় ক্রিকেটের কথা আসবে না এমনটা হতেই পারে না। আর ক্রিকেট যারা বোঝে না এখন তাদেরই ব্যঙ্গ করে কূয়োর ব্যাঙ বা 'ক্ষ্যাত' বলে ডাকা হয়। ক্রিকেট বাংলাদেশে এখন এতোটাই জনপ্রিয় যে, একমাত্র এই এক বিষয়ে বাঙালী সকল ধর্ম-মত, জাত-পাত ভুলে এক কাতারে আসে।

ক্রিকেট প্রসঙ্গে এতো কিছু অবতারণার কারণ হচ্ছে আর কিছুদিন পর শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। রাত বিরাতে পাড়া-মহল্লায় শোরগোল, চিল্লা-হল্লা হলে বুঝে নিতে হবে সাকিব-তামিমরা চার ছয় মেরেছেন। নয়তো মাশরাফি-মুস্তাফিজরা প্রতিপক্ষের স্টাম্প উপড়ে দিয়েছেন।

গর্জে ওঠা বাংলাদেশের পঞ্চরত্ন। বিশ্বকাপে তাদের এমনই গর্জে ওঠা রূপ দেখতে মুখিয়ে আছেন ভক্তরা।ছবি: সংগৃহিত।

বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ যে পর্যায়ে এসেছে তাতে সবচেয়ে বেশি অবদান যাদের ভালোবেসে তাদের পঞ্চরত্নের সঙ্গে তুলনা করেন ভক্তরা। হীরক, মুক্তা, পদ্মরাগ, স্বর্ণ ও বিদ্রুমকে পঞ্চরত্ন বলা হয়। ঠিক তেমনি মাশরাফি বিন মতুর্জা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের 'পঞ্চরত্ন' বলে অভিহিত করা হয়। অনেকে মহাভারতের চরিত্র পঞ্চপান্ডবের সঙ্গেও তাদের তুলনা করেন। কেউ তাদের দেশের ক্রিকেট দেহের পঞ্চরত্ন তথা চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, ত্বক ও জিহ্বার সঙ্গেও তুলনা করে থাকেন।

দেশের ক্রিকেট নামক দেহটিকে পরিপূর্ণ আকার-অবয়ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পাঁচজনের অবদান সবচেয়ে বেশি। এবারের বিশ্বকাপে এই পঞ্চরত্নকে পূজার পঞ্চপ্রদীপের সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে। ভক্তরা বলছেন, এই পঞ্চপ্রদীপ জ্বললেই আলোকিত হবে বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপে টাইগারদের শেষ চারে উঠতে হলে সবচেয়ে গুরুদায়িত্বটা পালন করতে হবে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মতুর্জাকে। এবারের বিশ্বকাপে প্রস্তুতি ম্যাচসহ মোট নয়টি ভেন্যুতে খেলবে বাংলাদেশ। ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচ, কন্ডিশন, উইকেট ও পরিস্থিতিতে দল পরিচালনার ভারটা মিস্টার ক্যাপটেনের কাঁধে। মাশরাফির চওড়া কাঁধের ওপর অবলীলায় বিশ্বাস করা যায়।

এ পর্যন্ত ৭৭ ওয়ানডেতে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যাশ। যার ৪৪টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। জয়ের হার প্রায় ৫৯ শতাংশ। ওয়ানডেতে কমপক্ষে ৫০ ম্যাচে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, জয় পরাজয়ের শতকরা হিসেবে অনেক বাঘা বাঘা অধিনায়ককে পেছনে ফেলেছেন তিনি। মাশরাফির পরে রয়েছেন ভারতের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কপিল দেব (৫৪ শতাংশ), শচীন টেন্ডুলকার (৩৫ শতাংশ), স্টিফেন ফ্লেমিং

ও অজুর্না রানাতুঙ্গা (৪৮), মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন (৫৪), ইমরান খানের (৫৩) মতো বিশ্বসেরা অধিনায়করা।

বাংলাদেশের জয়ের ম্যাচে বল হাতে রীতিমতো অপ্রতিরোধ মাশরাফি। ক্যারিয়ারের বোলিং গড়টা যেখানে প্রায় ৩২, বাংলাদেশের জয়ের ম্যাচে সেটা মাত্র ২৩! এই ৭৭ ম্যাচে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে ৯৭টি উইকেট নিয়েছেন ম্যাশ। আর তিনটি উইকেট নিতে পারলেই দেশের প্রথম অধিনায়ক ও বোলার হিসেবে করবেন উইকেটের সেঞ্চুরির অনন্য রেকর্ড। ওয়ানডেতে একশ'র বেশি উইকেট আছে কেবল তিন অধিনায়কের। ১০৯ ম্যাচে ১৫৮ উইকেট নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক

ওয়াসিম আকরাম, ৯৭ ম্যাচে ১৩৪ উইকেট নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক শন পোলক। পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান ১৩৯ ম্যাচে নেন ১৩১ উইকেট।

এবারের আসরে খুব সম্ভবত সেরা একাদশ নির্বাচন করার মধুর সমস্যায় পড়বেন মাশরাফি। দলের সবাই ভালো খেলছেন, কাকে রেখে কাকে খেলাবেন! শেষ চারে যেতে হলে নয়টি ম্যাচের মধ্যে অন্তত পাঁচটিতে জিততে হবে বাংলাদেশকে। এক্ষেত্রে আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলংকার বিপক্ষে যে কোনো মূল্যেই জিততে চাইবেন মাশরাফি। সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে যে কোনো একটি দলকে হারাতে চাইবেন তিনি।

অন্যদিকে সাকিব-মিরাজ-মাহমুদুল্লাহর স্পিন বিষে দক্ষিণ আফ্রিকা বা নিউজল্যান্ডের মধ্যে একটি দলকে টার্গেট করবেন মাশরাফি। ইংলিশ কন্ডিশন বলে মাশরাফির দায়িত্ব আরো বেড়ে যাবে। উইকেট থেকে সুইং ও অতিরিক্ত বাউন্স আদায় করতে হবে ম্যাশকে। সেই সঙ্গে বোলিং সঙ্গী হিসেবে মুস্তাফিজ-রুবেল-রাহী-সাকিবদের বুঝে শুনে ব্যবহারের চাপও থাকবে দেশ সেরা অধিনায়কের ঘাড়ে।

আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে এক ফ্রেমে  মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ। ছবি: ফাইল 

মাশরাফি যেমন বোলিংয়ে ঠিক তেমনি ব্যাটিয়ের ক্ষেত্রে বেশিরভাড় দায়িত্বটা এসে পড়বে তামিম ইকবালের ওপর। ইংলিশ কন্ডিশনে শুরুর আধা ঘণ্টা দারুণভাবে সুইং পাবেন পেসাররা। তামিমকে এই সময়টুকু পার করতে হবে। এটা সবারই জানা কথা, তামিম ভালো খেললে বাংলাদেশ জেতে। এক যুগের ক্যারিয়ারে ১৯৩টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এগারো শতকে করেছেন ছয় হাজার ৬৩৬ রান। গড় ৩৬। তামিম ভালো খেলেছেন এমন ৯৩ ম্যাচে জিতেছে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচগুলোতে তামিমের গড় ৫০! করেছেন আটটি শতক। এখান থেকেই বোঝা যায়, তামিম ভালো খেললেই বাংলাদেশ জেতে।

বাংলাদেশে ক্রিকেট দলে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন সাকিব আল হাসান। কী ব্যাটে আর কী বল হাতে, সাকিবের সমকক্ষ অলরাউন্ডার বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে বিরল। সাকিব যেভাবে সব রেকর্ড তার নিজের করে নিচ্ছেন তাতে শেষ পর্যন্ত তিনি কোথায় গিয়ে থামবেন সেটা বলা কঠিন।

গত কয়েকটা বছর ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে শীর্ষ অলরাউন্ডারের জায়গাটা তার দখলে। ২০০৬ সালে অভিষেকের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৯৮ ম্যাচে পাঁচ হাজার ৭১৭ রান সাকিব আল হাসানের। শতক ছয়টি। নিয়েছেন ২৪৯ উইকেট। বিশ্ব অলরাউন্ডারদের মধ্যে পাঁচ হাজার রান ও ২৪৯ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জনকারী পঞ্চম ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিস, শ্রীলংকার সনাৎ জয়াসুরিয়া, পাকিস্তানের আব্দুল রাজ্জাক ও শহীদ আফ্রিদি এই রেকর্ড করেন।

সাকিব খেলেছেন এমন ৯১ ম্যাচে জিতেছে বাংলাদেশ। ৫০ গড়ে সাকিব করেছেন তিন হাজার দুই রান। নিয়েছেন ১৩৬ উইকেট। সাধেই কি আর বলে, সাকিবের দিন মানেই বাংলাদেশের দিন। বলে রাখা ভালো, সাকিবের করা সাত সেঞ্চুরির ছয়টিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। এবারের বিশ্বকাপে সাকিব যদি নিজের নামের সুনাম ধরে রাখতে পারেন তাহলে শেষ চারের পথে ছুটবে লাল-সবুজের দল। মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপের 'মই' বলা হয়। এই দু'জনের কাঁধে ভর করেই নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলেন বাকি ব্যাটসম্যানরা। সবাই জানেন, অন্য সবাই ব্যর্থ হলে হাল ধরার জন্য দুই 'ভাইরা' আছেন।

মুশি ও রিয়াদ মিডল অর্ডারের বিশ্বস্ত দুটি স্তম্ভ। বাংলাদেশের পক্ষে যে কোনো উইকেট জুটিতে সবোর্চ্চ রানের তালিকায় প্রথম দুটি নাম সাকিব-মুশফিক (২৬৪৬), দ্বিতীয় জুটিটির সঙ্গেও রয়েছে মুশির নাম, মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ (১৯০৮)। এমনিতেই কী আর মুশিকে মিডল অর্ডারের খুঁটি বলা হয়। উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে মুশফিক কেবল বাংলাদেশ নন বিশ্বসেরাদের একজন। ওয়ানডেতে মাত্র পাঁচজন উইকেটরক্ষক পাঁচ হাজারের বেশি রান ও দুইশ'র বেশি ডিসমিসাল আছে। ওয়ানডেতে মুশির সংগ্রহ পাঁচ হাজার ৫৫৮ রান। উইকেটের পেছনে ডিসমিসাল সংখ্যা ২১১টি।

গত কয়েক বছরে ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সর্বশেষ পাঁচ বছরে বাংলাদেশ জিতেছে এমন ৪০ ম্যাচের ৩৩টিতেই ছিলেন এই ব্যাটিং অলরাউন্ডার। দুটি সেঞ্চুরির সঙ্গে রয়েছে নয়টি হাফসেঞ্চুরি। ব্যাটিং গড়টা রীতিমতো ঈর্ষনীয় ৫৬.৬৫! গত কয়েকটা বছর বাংলাদেশ যে স্বপ্নের মতো ক্রিকেট খেলছে তার পেছনে এই পঞ্চরত্নের অবদান সবচেয়ে বেশি। এবারের বিশ্বকাপেও লাল-সবুজের পতাকাটা এই পাঁচজনের কাঁধেই বর্তাবে। পঞ্চপাণ্ডব যদি নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেন আর দলের বাকিরা যদি নিজ নিজ জায়গায় সুনাম ধরে খেলতে পারেন তাহলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠতে খুব শক্ত হবে না বাংলাদেশের।

বিষয় : খেলা ক্রিকেট বাংলাদেশ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ-২০১৯ পঞ্চপান্ডব-পঞ্চপ্রদীপ