এই বাংলাদেশই চাই

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নটিংহাম থেকে

বাস্তবে তিনি ছিলেন কি-না, সেই বিতর্ক তুললে রেগে যায় এখানকার মানুষ। তাদের শ্রদ্ধাভরা বিশ্বাস, নটিংহাম ক্যাসেলের দিকে তীর-ধনুক তাক করা এই ভাস্কর্যটির মতোই দেখতে ছিলেন রবিনহুড। শেরউড ফরেস্ট থেকে সঙ্গীদের নিয়ে নটিংহামের শেরিফদের বিরুদ্ধে এভাবেই লড়াই করতেন গরিবের বন্ধু রবিনহুড। টনটন থেকে গতকাল এই রবিনহুডের শহরেই পা রেখেছে টাইগাররা। আগামীকাল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এ শহরেই অস্ট্রেলিয়া-বধের মিশন নিয়ে নামবেন মাশরাফিরা। সে ম্যাচেই হয়তো ফের রবিনহুড হয়ে উঠবেন সাকিব, লিটল জন হয়ে উঠবেন লিটন দাস! বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের স্বপ্নযাত্রায় অসি-বধের জন্য দারুণভাবে প্রস্তুত পুরো দল। এর রসদ তো টনটন থেকেই সঙ্গে নিয়ে এসেছে টাইগাররা। একদিন আগেই (সোমবার) তো ইংল্যান্ডের এই ভেন্যুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭ উইকেটে হারিয়ে দীপ্ত পদক্ষেপে সেমিফাইনালের পথে খানিকটা এগিয়েছে তারা। যে ম্যাচে সাকিব-লিটনের (১৮৯* রান) বীরোচিত জুটিতে ৩২২ রান তাড়া করার ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। রবিনহুডের শহর নটিংহামেও এই বাংলাদেশকেই দেখতে চাইবেন সমর্থকরা।

সেমিফাইনালের যে স্বপ্ন নিয়ে ইংল্যান্ডে গেছে টাইগাররা, সেই স্বপ্নের চৌহদ্দিতে পৌঁছানো না পর্যন্ত উদযাপনের বাহুল্যকে নিজেদের গণ্ডির ভেতরে আসতে দিতে চায় না মাশরাফি বিন মুর্তজার দল। যে কারণে ক্যারিবীয়দের নাস্তানাবুদ করার পরও ড্রেসিংরুমে খুব বেশি আনন্দ-উল্লাস হয়নি। টিম হোটেলে ফিরেও একসঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করা হয়নি। বরং রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে হয়েছিল তাদের। গতকাল সকাল ১১টার দিকে টিম বাসে চড়ে টনটন থেকে নটিংহাম আসা। টনটনের মেঘ মাথায় এখানে এসেও বৃষ্টিতে পড়া। আজও এই শহরে কিছুটা বৃষ্টি হবে। আবহাওয়া বুলেটিন এই গ্যারান্টি দিতে পারছে না যে, আজ অনুশীলন করতে পারবে কি-না টাইগাররা। তবে এটুকু নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে যে, কালকের ম্যাচটি অন্তত মাঠে গড়াবে। এটা জেনে অন্তত স্বস্তি পেয়েছেন মাশরাফিরা। কেননা পয়েন্ট তালিকার এখন যে অবস্থা, তাতে করে হাতে থাকা চারটি ম্যাচেই দুই পয়েন্টের জন্য নামতে চায় তারা। বৃষ্টির কারণে পয়েন্ট ভাগাভাগি করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছে, এরপর ফিঞ্চ-ওয়ার্নারের অস্ট্রেলিয়াকেও এখন বুড়ো আঙুল দেখাতে প্রস্তুত টাইগাররা।

ভয় আর জড়তা কাটিয়ে মানসিকভাবে একটা প্রচণ্ড শক্তির জায়গায় এখন অবস্থান করছে গোটা দল। সবার মধ্যে মনের জোরটা বেড়ে গেছে। অন্তত সাকিব আল হাসান সেটাই মনে করছেন, 'বিশ্বকাপ নিয়ে প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে আলাদা একটা প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। আমি নিজেও সেটা নিয়েছি। তবে প্রস্তুতির এই জায়গাটা যতটা না কৌশলগত, তার চেয়েও বেশি বোধহয় মানসিক। আমাদের এই দলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এই যে, এখন আর ড্রেসিংরুমে কোনো আতঙ্ক ছড়ায় না। দু-একটা উইকেট পড়ে গেলেই সবাই ঘাবড়ে যায় না। এখানে আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে এসেছি সেটা পূরণ করতে হলে দলের এই পরিবেশটাই দরকার।' সাকিবের বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও তারা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন। 'সেমিফাইনালে যেতে হলে আমাদের সামনে সমীকরণটা বেশ পরিস্কার। হাতে থাকা সব ম্যাচ জিততে হবে। যদি সেটা নাও হয়, তার পরও যেন চেষ্টাটা থাকে।' এখানকার কাগজগুলোতে ইংল্যান্ড আর ভারতের ম্যাচ না থাকলে বিশ্বকাপ ক্রিকেট বড়জোর ডাবল কলাম। অন্য দলগুলো নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই তাদের। তবে গেইল-রাসেলদের যেভাবে হারিয়েছে টাইগাররা, আর সাকিব যেভাবে প্রতি ম্যাচেই পারফর্ম করছেন এবং আসরের সর্বোচ্চ স্কোরার হয়েছেন, তার পর কিছু ট্যাবলয়েডে তার ছবি বড় করে ছাপতেই হয়েছে। এখানকার মানুষও একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, টাইগাররা সেমিফাইনাল খেলতেও পারে।

পয়েন্ট টেবিলের দিকে তাকালেও সে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাঁচ ম্যাচ থেকে পাঁচ পয়েন্ট সংগ্রহ করা বাংলাদেশ পয়েন্ট তালিকার পঞ্চম স্থানে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে পাওয়া গেছে চার পয়েন্ট। আর শ্রীলংকার বিপক্ষে পরিত্যক্ত ম্যাচ থেকে যোগ হয়েছে এক পয়েন্ট। শেষ চারে ঢুকে যেতে হলে জয়ের ধারাটায় থেকে পয়েন্ট টেবিলটাকে সমৃদ্ধ করে যেতে হবে টাইগারদের। বাকি চার ম্যাচের তিনটিতে জিততে হবে কম করে হলেও। তবে ভাগ্যের ছোঁয়া পেলে সমীকরণের মারপ্যাঁচে আর দুই ম্যাচ জিতেও সেমির সীমানায় গিয়ে দাঁড়াতে পারলেও পারতে পারেন মাশরাফিরা। এ সবই আসলে সম্ভাবনা, হতেও পারে, নাও হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পয়েন্টের রেসের অর্ধেক পথও পাড়ি দেয়নি। সেমির লালফিতায় বুক ঠেকাতে হলে বেশি বেশি পয়েন্ট চাই। পয়েন্ট যোগের এই রেসটা যে সহজ নয়, খেলোয়াড়রাও ভালো করেই জানেন। এর কারণও রয়েছে- এখনও অস্ট্রেলিয়া, ভারত আর পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে মোকাবেলা করতে হবে বাংলাদেশকে। চার ম্যাচের অন্য প্রতিপক্ষ আফগানিস্তানের কাছ থেকে না হয় পূর্ণ দুই পয়েন্ট পাওয়া গেল; কিন্তু অন্য প্রতিপক্ষরাও তো সেমিফাইনালে যাওয়ার রেস করছে। বাংলাদেশের মতো তাদের কাছেও তো প্রতিটি পয়েন্ট মহামূল্যবান। সাহসী সাকিবদের কাছে এর কোনো কিছুই অজানা নয়। তারা যে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই যেতে চান সেমির ঠিকানায়।