সমুদ্র দর্শন ও বাঙালি খাবার

প্রকাশ: ১১ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ব্রিস্টল থেকে

ব্রিস্টলের ওয়েস্টন সুপারমেয়ার সমুদ্রসৈকত-সংগৃহীত

পাশ দিয়েই চলে যাচ্ছিলেন, কী জানি কী ভেবে গাড়ি ঘুরিয়ে কাছে এসে বললেন- ভাই বাংলাদেশি? 'আমি বাবুল আহমেদ...' বাড়ানো হাতটি মেলানোর পরই যে কৌতূহল জাগে- কি সিলেটি? 'বুঝতে পেরেছেন তাহলে।' কিছুক্ষণ আগেই তামিম ইকবালের মিনি একটা সাক্ষাৎকার মোবাইলে রেকর্ড করেছি। তার আগে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সঙ্গে আড্ডা। দুটি এক্সক্লুসিভ নিউজ পাওয়ার আনন্দে ব্রিস্টলের ৯টার বিকেলও (এখানে সূর্য ডোবে ১০টায়) বেশ লাগছে। সঙ্গে থাকা চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের রিপোর্টার রিয়াসাদ আজিম ও তার ক্যামেরাপারসন শিপন এবং এনটিভির রিপোর্টার সুব্রত ববি। প্রত্যেকের ফোন ব্যস্ত ব্রিস্টলে থাকা বাকি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের এই বোঝাতে যে, তাদের করা দুটি নিউজের ফুটেজ এখনই কাউকে দেওয়া সম্ভব নয়। টেলিফোনে তাদের সেই কথা শুনেই বাবুল ভাইয়ের গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করা- ভাই বাংলাদেশি? ইংল্যান্ডের দুই সপ্তাহের বিশ্বকাপ জীবনে এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনে নেমেও বহুবার শুনেছি- ভাই বাংলাদেশি? পরিচিত হয়ে দু-এক বেলা তাদের সঙ্গে লাঞ্চ-ডিনারও সেরেছি। ব্রিস্টলে এসে স্টেডিয়ামের বাইরের গেটে হঠাৎ কোনো বাংলাদেশির এভাবে আবির্ভাবের কথা সত্যিই চিন্তা করিনি।

সারাদিন নিউজ কুড়ানোর ব্যস্ততায়  খেয়ালই হয়নি দুপুরে পেটে দানাপানি পড়েনি। ট্যাক্সি নিয়ে সামনে দাঁড়ানো বাবুল ভাইয়ের কাছে তাই আবদার, আমাদের কাছের কোনো রেস্টুরেন্টে নিয়ে চলেন। ট্যাক্সিতে উঠেই গল্প জুড়ে দেন তিনি। আঠারো বছর আগে এই দেশে এসেছেন। আগে রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন, এখন ট্যাক্সি চালিয়ে বেশ আছেন। এখানেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভরা সংসার তার। চোস্ত ইংরেজি বলতে পারলেও হৃদয়ে বাংলাদেশ। মাঝে মাঝেই খুব শিকড়ে টান পড়ে। সে কারণেই ৪০ পাউন্ডের টিকিট এক বন্ধুর কাছ থেকে ৯০ পাউন্ডে নিয়েছেন। খিদে পেটে এসব গল্প জমছিল না। কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডসের সামনে কয়েকবার দাঁড়িয়েও থামছিলেন না বাবুল। 'আচ্ছা, আপনারা তো আমার ছোট ভাইয়ের মতো, চলুন না আমাদের বাড়ি। একটু খাওয়াই আপনাদের।' সত্যি কথা বলতে কি, প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হওয়ার মতো অবস্থায় আমরা কেউই ছিলাম না। তাও আবার বাড়ি যখন ৪০ মাইল দূরে!

বুঝতে পেরে বাবুলের পরের প্রস্তাব- চলুন না সমুদ্র দেখিয়ে নিয়ে আসি। ওয়েস্টন বিচে সান সেট...। সম্মিলিত উত্তরের অপেক্ষায় গাড়ির সব যাত্রী তখন একে অন্যের দিকে ঘাড় ঘোরান। সবার চোখেই একই ইঙ্গিত, ইংল্যান্ডের সমুদ্র দর্শন করতেই হবে। আর কোনো কথা নয়, গাড়ির জিপিএসে 'ওয়েস্টন সুপারমেয়ার বিচ' লিখে বাবুল ভাইয়ের ছুট। মিটার অন করার আপত্তি তিনি শোনেননি। শহুরে ব্রিস্টল ছাড়িয়ে বাবুলের ট্যাক্সি যখন পাহাড় পাশ কাটিয়ে সুপারমেয়ারের দিকে, তখন চারপাশের শান্ত সবুজ ইংল্যান্ডকে আবিস্কার করার আনন্দ আমাদের সবার মধ্যে। রাস্তার ধার ঘেঁষে আঠারো শতকের পুরনো গির্জা আর একই নকশার মার্বেল পাথরের বাড়ি। রাত সাড়ে ১০টায় বাড়িগুলোর উঠানে গভীর রাতের নীরবতা। মোবাইলে তার কিছু দৃশ্য ধারণ করে ফেসবুকে দিতে দিতেই চোখের সামনে লালটিপের মতো ডুবন্ত সূর্য।

বিচের পাশে গাড়ি থামাতেই বরফের গা ঘেঁষে আসা তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া। গুনে গুনে প্রতিদিনই জ্যাকেটের নিচে তিনটি পরত থাকে। তবে সেটি হার মেনে যায় ওই ঠাণ্ডায়। কিন্তু চোখের সামনে বালুকাময় বিচ আর ডুবন্ত সূর্য থাকলে ওসব ঠাণ্ডাকে বুড়ো আঙুল দেখানোই যায়। সেলফি থেকে শুরু করে ডিএসএলআরের ক্লিক- মিনিট দশেক সেটা চলার পরই চোখে পড়ল অনেকটা দূরে দ্বীপের মতো কিছু। আলো জ্বলছে সেখানে। বাবুল ভাই জানালেন ওটা কার্ডিফ, আগে এখান থেকে প্রতিদিন ফেরি চলাচল করত। এখন বন্ধ হয়ে গেছে। মাছ ধরার নৌকাগুলো এখনও সেখানে যায়। ব্রিটেনে শখের বশে মিঠেপানির মাছ ধরে তা আবার ছেড়ে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই।

সেলটিক সাগরের ব্রিস্টল চ্যানেলের একটি কোনা এই ওয়েস্টন সুপারমেয়ার বিচ। চারপাশে হোটেল-মোটেলের ছড়াছড়ি, সেইসঙ্গে রেস্টুরেন্টের বাইরের বারান্দায় টেবিল ছাড়ানো। কাছের দুটি বড় শহর বলতে ওদিকে ব্রিস্টল আর এদিকে টনটন। পোলিশরা বেশি থাকে এই শহরে। ভেড়া আর মুরগির খামারের ব্যবসায়ীরাই বেশি এখানে। লন্ডনের মতো বাংলাদেশিপাড়া বানানোর মতো লোকের সংখ্যা এখানে কম। বাবুল ভাইয়ের দেওয়া তথ্য মতে, বড়জোর একশ' বাংলাদেশির বাস। মিলেমিশে বেশ আছেন তারা। রাজনীতি কিংবা নোয়াখালী, সিলেটি বিভেদ নেই এখানে। প্রমাণও দিয়েছিলেন তিনি। নাজমুল ভাইয়ের রেস্টুরেন্ট 'পানাস'-এ নিয়ে যান। কখন যে তিনি নাজমুল ভাইকে আমাদের কথা বলেছিলেন টের পাইনি গাড়ির মধ্যে 'মধু হই হই বিষ হাওয়াইলা...' গানটি চলতে থাকায়। টেবিলজুড়ে বাঙালি খাবার, তবে টেবিল ছাড়ার সময় শুধু ডালভাতের বাটিগুলোই শূন্য হয়ে যায়।

সমুদ্র দর্শনের সঙ্গে বাঙালি ভোজন, সকালে কার মুখ দেখে যে উঠেছিলাম!

বিষয় : ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ-২০১৯