বল লাগে তাও পড়ে না বেল

প্রকাশ: ১১ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সিয়াম আনোয়ার

'দশ দিনেই পাঁচবার! আমি তো গোটা জীবনেও এ ঘটনা পাঁচবার ঘটতে দেখলাম না।'

হতবাক ইমোজিতে টুইটারে জানানো প্রতিক্রিয়াটি শোয়েব আখতারের। ২৩ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাটানো পাকিস্তানের সাবেক এই ফাস্ট বোলার যারপরনাই বিস্মিত- স্টাম্পে বল লাগলেও বেলস কেন পড়ে না দেখে। এক-দু'বার হলে কাকতাল বলা যায়, কিন্তু দশ দিনের মধ্যে ১৩ খেলায় পাঁচবার কীভাবে সম্ভব? ২০১৯ বিশ্বকাপে বেলস দেখাচ্ছে এ কোন খেল!

স্টাম্পে বল লাগলেও বেলস না পড়ার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে রোববার ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে। জাসপ্রিত বুমরাহর বলে ব্যাটিং করছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। বল তার ব্যাটে লেগে মাটিতে পড়ে, এরপর আঘাত হানে স্টাম্পের নিচের অংশে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে স্টাম্পের ওপরে থাকা বেলসে কোনো নড়নচড়ন হয়নি। আর বোল্ড হওয়ার শর্ত হিসেবে উইকেট ভাঙা (অন্তত বেলস স্থানচ্যুত হওয়া) যেহেতু আবশ্যক, তা না হওয়ায় বোল্ড থেকে বেঁচে যান ওয়ার্নার। একই ধরনের ঘটনা ঘটে  বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচেও। বেন স্টোকসের বল সাইফউদ্দিনের ব্যাট-মাটি হয়ে গিয়ে আঘাত হানে স্টাম্পে, কিন্তু বেলস পড়েনি। অন্য তিনটি ঘটনা ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়া-উইন্ডিজ ম্যাচে মিচেল স্টার্ক-ক্রিস গেইল, নিউজিল্যান্ড-শ্রীলংকা ম্যাচে ট্রেন্ট বোল্ট-দিমুথ করুনারত্নে ও ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে আদিল রশিদ-কুইন্টন ডি ককের ক্ষেত্রে। এর কোনোটিতে বল মাটিতে পড়ে তারপর স্টাম্পে লেগেছে, আর কোনোটিতে স্টাম্পের একপাশ স্পর্শ করে পেছনে চলে গেছে; কেবল বেলস থেকে গেছে তার নিজের জায়গায়, ঠায়। বিশ্বকাপের প্রথম দশ দিনের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ শেষে অসি অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, 'বেলসগুলো একটু বেশি ভারী, স্থানচ্যুত হওয়ার জন্য বাড়তি জোরের দরকার।' কিন্তু ক্রিকেটের বৈশ্বিক কর্তৃপক্ষ আইসিসি বলছে ভিন্ন কথা। ভারী নয়, বরং আগে ব্যবহূত কাঠের তৈরি বেলসের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই জিং বেলসগুলো নাকি হালকাও হয়। অস্ট্রেলিয়ার মেকানিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ব্রন্টি একারম্যানের উদ্ভাবন এই জিং বেলস। সাধারণত কাঠ দিয়ে স্টাম্প ও বেলস তৈরি হলেও এই জিং বেলস বা জিং স্টাম্প তৈরি কম্পোজিট প্লাস্টিক দিয়ে। এতে এলইডি বা লাইট এমিটিং ডায়োড যুক্ত থাকে। লো ভোল্টেজের ব্যাটারি দিয়ে স্টাম্প ও বেলসের মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। এর ভেতরে থাকা একটি মাইক্রোপ্রসেসরের মাধ্যমে স্টাম্প-বেলসের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে কি-না নির্ণয় করা হয়। বিচ্ছিন্ন হলেই ১ মিলিসেকেন্ডের (সেকেন্ডের এক হাজার ভাগের এক ভাগ) মধ্যে এলইডি জ্বলে। তখন বোল্ড নিশ্চিত হয় ব্যাটসম্যানের।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জিং বেলসের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ২০১৩ সালে আইসিসির অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৪ টি-টোয়েন্টি এবং ২০১৫ বিশ্বকাপে এটি পুরো আসরজুড়ে ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ছাড়া এখনকার দিনের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ, ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টেও নিয়মিত এটি ব্যবহার হয়। কিন্তু ২০১৫ বিশ্বকাপে যে জিং বেলস ব্যবহারের পরও ৪৯ ম্যাচে মাত্র দু'বার বেলস না পড়ার ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে এবার কেন ১৩ ম্যাচের মধ্যেই পাঁচবার হয়ে গেল- এ নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন। মজার বিষয় হচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপে যে পাঁচ দুর্ভাগা বোলার বেলস স্থানচ্যুত না হওয়ায় উইকেট পাননি, দিনশেষে তারা কেউই হারেননি, দল জিতেছে। কিন্তু যে দিন এ ধরনের ঘটনা জয়-পরাজয় নির্ধারক হয়ে যাবে, সেদিন নিশ্চয়ই আইসিসিকে নতুন পরিকল্পনায় হাত দিতেই হবে।

শেষ পর্যন্ত না আবার গলির ক্রিকেটের মতো বেলসবিহীন স্টাম্পই না প্রচলন করতে হয়!

বিষয় : ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ-২০১৯