তামিম, বিশ্বকাপ শব্দটাই মুছে ফেলুন মন থেকে!

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৯      

ফাহমিদ সৌরভ

ছবি-বিসিবি

সত্যিকারের একজন সেবক বলতে যা বোঝায় তামিম ইকবাল ঠিক সেটাই। দীর্ঘ এক যুগ ধরে দেশের ক্রিকেটের জন্য নিবেদিত প্রাণ এক যোদ্ধা। ম্যাচের পর ম্যাচ টাইগারদের স্টাম্প আগলে রাখার কাজটি করে চলেছেন তিনি। এই ম্যাচে না পারলে সেটা পুষিয়ে দিয়েছেন পরের ম্যাচে, এই সিরিজ খারাপ গেলে পরের সিরিজেই ফিরেছেন স্বরূপে। বাংলাদেশ খেলছে আর আপনি ঠিক ম্যাচের মাঝামাঝি সময় টিভির পর্দার হাজির। বাংলাদেশ দলকে ব্যাটিংয়ে দেখে আমরা প্রথমেই যা জানতে চাই তা হলো তামিম আউট হয়েছে, না এখনো আছে! তামিমকে উইকেটে দেখলেই মনে হয়, আজ বেশ ভালো খেলছে বাংলাদেশ। এটাই তামিম ইকবাল। তামিম মানেই স্বস্তি, তামিম মানেই আস্থা, তামিমের অপর নাম নির্ভরতা।

চলছে বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ দল এখন ইংল্যান্ডে। টাইগাররা ইতিমধ্যে চার ম্যাচ খেলে ফেলেছে। শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। বাকি তিন ম্যাচে জয় মাত্র একটিতে। ব্যাটে-বলে সবাই একসাথে জ্বলে ওঠায় বহুল প্রত্যাশিত জয়টি আসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। এরপর আবার কিছুটা ধারাবাহিকতার অভাব। পরের দুই ম্যাচ হেরে ছন্দপতন। তিন ম্যাচেই রান নেই তামিমের ব্যাটে। ছোট লেন্থের বলে তিন ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে ধরা পড়লেন টাইগার ওপেনার।

তিন ম্যাচে রান না পাওয়ায় মন ভালো নেই তামিম ইকবালের। শ্রীলংকার বিপক্ষে রানের দেখা পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকেন তিনি। একা একা অনুশীলনও করেছেন। নেটে অন্যদের চেয়ে সময়ও দিয়েছেন বেশি। প্র্যাকটিস বোলার, বল থ্রোয়ারদের দিয়ে টানা খাটো লেন্থের বলে অনুশীলন করেছেন তিনি। গত বিশ্বকাপেও ভালো ছন্দে ছিলেন না তামিম। এই কারণেই এবারের আসরে রান পেতে মরিয়া এই ব্যাটসম্যান। এই কারণেই এবার চাপটা বেশি তামিমের ওপর। আর তামিম রান পেলে টাইগারদের জয়ের সম্ভাবনা যে অনেক বেড়ে যায় সেটা তো তামিম নিজেও জানেন।

তিন ম্যাচে রান না পাওয়ায় এই মূহূর্তে তামিম যে বেশ চাপে আছেন সেটা তিনিও স্বীকার করেছেন। ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তামিমের গড় মাত্র ২২! ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে রান পাননি বলে তাকে ও তার পরিবারকে কম কথা শুনতে হয়নি। সেবার ৬ ম্যাচে ২৫.৬৬ গড়ে মাত্র ১৫৪ রান করেছিলেন তিনি। গত চারটা বছর বিশ্বকাপে রান না পাওয়ার ক্ষোভটা যেন ঝেড়েছেন তিনি। এই চারটা বছরে ৫৭ ইনিংসে ৭টি শতক ও ১৮ অর্ধশতকসহ ২৫১১ রান করেছেন তামিম ওপেনার হিসেবে রান ও গড়ের দিক থেকে তামিমের ওপর রয়েছেন কেবল রোহিত শর্মা।

তামিমের ক্যারিয়ারটাকে দুই ভাগে ভাগ করলে দেখা যাবে, অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে নিজেকে কতটা বদলিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালে অভিষেক হওয়ার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১২২টি ওয়ানডেতে তামিমের ছিল চারটি শতক। ২০১৩ থেকে এই পর্যন্ত ৭৪ ম্যাচে তামিম সেঞ্চুরি করেছেন ৭টি। এই সময়ে টেস্টে ৯টি সেঞ্চুরি করেছেন এই ওপেনার।

তামিম ভালো করেই জানেন, বিশ্বকাপে খারাপ করলে অতীতের রেকর্ড কেউই মনে রাখবে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব তাকে রানে ফিরতে হবে। এই বিশ্বকাপেও রান না করলে আবার সমালোচকদের টিপ্পনী শুনতে হবে তাকে। আর বিশ্বকাপ আসলেই যেন তামিমের ব্যাট আড়ষ্ট হয়ে আসে। স্বাভাবিক খেলাটাই ভুলে যান টাইগার ওপেনার।

তামিম ভক্তদের প্রত্যাশা, তিনি যেন অযথা নিজের ওপর চাপ না বাড়ান। তিনি রান পেলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে ভালো করবে এটা সবারই জানা তবে না পেলেও ক্ষতি খুব বেশি হবে কি?

ক্রিকেট বিশ্বে এমন অনেক বড় বড় ক্রিকেটার আছেন যারা বিশ্বকাপে রান পাননি। পাকিস্তানি কিংবদন্তি ইনজামাম উল হকের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের গড় যেখানে প্রায় ৪০, বিশ্বকাপে বিগম্যানের গড়টা মাত্র ২৩! চারবার রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরেছেন ইনজি। নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ওপেনার খ্যাত নাথাল অ্যাস্টলের বিশ্বকাপ গড়টা মাত্র ২০! পাঁচবার ডাক মেরেছেন তিনি। ইউনিস খান, ইয়ন মরগান, ইজাজ আহমেদ, অ্যান্ড্র ফ্লিনটফ, অ্যালেন বোর্ডার, শহীদ আফ্রিদিসহ এমন অনেক ক্রিকেটার আছেন তাদের বিশ্বকাপ পরিসংখ্যানটা ভালো নয়।

এবারের বিশ্বকাপে এখনও পাঁচটি ম্যাচ বাকি রয়েছে বাংলাদেশের। সেমিফাইনালে উঠতে হলে প্রায় সবগুলো ম্যাচেই জিততে হবে টাইগারদের। বাংলাদেশ দলে তামিম ইকবালের দায়িত্বটা এখন ম্যাচ ধরে খেলে ইনিংসটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হয়েছিলেন। উইকেটে আরো কিছুক্ষণ সময় থাকা উচিত তামিমের। এক্ষেত্রে রোহিত শর্মাকে অনুসরণ করতে পারেন তিনি। ইনিংসের শুরুটা খুবই ধীরগুতিতে করেন ভারতীয় ওপেনার। সেট হয়ে যাওয়ার পরই বড় শট খেলেন তিনি। আর তাছাড়া সৌম্য সরকার, সাকিবরা তো প্রায় প্রতি ম্যাচেই রান পাচ্ছেন। নিজেকে গুছিয়ে নিতে তাই খানিকটা সময় তো তামিম পাবেনই।

বিশ্বকাপ, বড় আসর, অতীত পরিসংখ্যান ভালো না, সেমিফাইনালে উঠতে হবে...এসব ভেবেই হয়তো চাপটা বেশি ফেলেছেন তামিম। এই মূহূর্তে 'বিশ্বকাপ' শব্দটাই টাইগার ওপেনারের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। বিশ্বকাপের মতো আসরে খেলছেন এটা মনে আনারই দরকার নাই। বিশ্বমঞ্চে রান না পেলে অমুকে অমুক বলবে, এসব ভাবার দরকারই নেই। নিজের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলে যাওয়া উচিত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এই ব্যাটসম্যানের।

রানে ফিরতে যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশের পরের ম্যাচ ১৭ জুন। এর মাঝে আরো খানিকটা সময় পাবেন তিনি। ভক্তরা আশা করছেন এর মধ্যেই নিজেকে ফিরে পাবেন দেশ সেরা এই ব্যাটসম্যান। আর তামিমের ব্যাটে রান আর বাংলাদেশের জয় বিষয়টা তো প্রায় সমার্থক। ধারাবাহিক হতে তামিমের দরকার মাত্র একটা বড় ইনিংস। কে জানে, পরের ম্যাচটাই তামিমময় হতে যাচ্ছে কিনা!