বিশ্বকাপ ক্রিকেট

ইংল্যান্ডের ভিনদেশি তারা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জহির উদ্দিন মিশু

বছর দশেক আগেও ইয়ন মরগানকে সবাই চিনত আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটার হিসেবে। আইরিশদের হয়ে সে সময় মাঠও মাতিয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালে ক্রিকেটের আঙিনায় পা দেওয়ার পর দেশটির হয়ে ২৩টি একদিনের ম্যাচেও অংশ নেন এই মরগান। কিন্তু চার বছরের ব্যবধানে সেই মরগানই কি-না হয়ে গেলেন ইংল্যান্ডের! তাও আবার ইতিহাসের একজন। কেবল মরগান একা নন, ইংলিশদের ১৫ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সাতজনই তো ভিনদেশি। আর সেই ভিনদেশিদের দিয়েই এবার বিশ্বকাপ নামক মহাকাব্য লিখে নিল স্বাগতিকরা।

ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর। জন্ম থেকে যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছে তারা। আগের তিন-তিনটি ফাইনাল খেলেও মেটেনি সেই স্বাদ; বরং ভাঙা হৃদয় নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে। এই যাত্রায় পুরনো ক্ষতে প্রলেপ মিলল বুঝি। অবশ্য লর্ডসের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে সাধ্যের মধ্যে আটকে দিয়েও ঠিকই মুখ থুবড়ে পড়েছিল ইংলিশদের ব্যাটিং লাইন। কিন্তু সেখান থেকে এভাবে দলকে টেনে নেবেন এক ভিনদেশি- বেন স্টোকস, কে জানত। তার ওপর এই অলরাউন্ডারের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে নিউজিল্যান্ড শব্দটা।

স্টোকসের বীরত্বপূর্ণ ইনিংস একটা সময় ইংল্যান্ডকে হারের কিনারা থেকে সরিয়ে আনে। শেষদিকের নাটকীয়তায় ম্যাচের ভাগ্য চলে যায় সুপার ওভারের হাতে। সেখানেও স্টোকস দ্যুতি। এরপর বল হাতে তরুণ জোফরা আর্চারের আলো ছড়ানো। অথচ এই আর্চারও ভিনদেশি। জন্মসূত্রে তিনি বার্বাডোজের মানুষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের যুব দলের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন। সেখান থেকে ইংল্যান্ডে উড়ে আসা। তারপর ইংলিশ কাউন্টি ক্লাব সাসেক্সের জার্সিতে বল হাতে দ্যুতি ছড়ানো। সেখান থেকেই বিশ্বের নাম্বার ওয়ান দলে নাম লেখান জোফরা। এসে বাজিমাত। শুরুর দিকে যদিও তাকে বিশ্বকাপ দলে নেওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। ইংল্যান্ড তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনায় রাখেনি এই আর্চারকে। তবে প্রি-টেস্ট হিসেবে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে নেওয়া হয়। সেখানে বল হাতে গতির ঝড় তোলেন আর্চার। তাতে খুলে যায় তার বিশ্বকাপ-দুয়ার। আর্চারও মান রেখেছেন, নিজের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক মেগা টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডকে উপহার দিয়েছেন কুড়ি উইকেট। আর শেষটা তো আরও রঙিন। সুপার ওভারে তার কাঁধে ভর রাখে পুরো ইংল্যান্ড। তাদের ভরসার প্রতিদান দিনেও ভুল করেননি আর্চার। স্নায়ুঠাসা লড়াইয়ে থামিয়ে দেন গাপটিল-নিশামদের।

ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জেতাতে এই তিন ভিনদেশি ছাড়াও ওপেনার জেসন রয়, স্পিনার আদিশ রশিদ- এই দু'জনের অবদানও অনেকখানি। যদি বলি বিশ্বকাপের ১২তম আসরে কোন দলের ওপেনিং জুটি নিয়মিত সচল ছিল। সিংহভাগের উত্তর আসবে ইংল্যান্ডের। আসাটা স্বাভাবিক, কেননা জনি বেয়ারস্টো ও জেসন রয় মিলে ইংল্যান্ডের একাধিক ম্যাচের চিত্রনাট্য বদলেছেন। যার মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার বংশোদ্ভূত রয় ছিলেন দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৫৩, সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৮৫ ছাড়াও চমৎকার কিছু ইনিংস ছিল তার। রয়ের শূন্যতাও হাড়ে হাড়ে টের পায় ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে চোট পাওয়ার পর যখন কয়েক ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়েছিলেন, তখন ইংল্যান্ডের সেমিতে যাওয়ার পথও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। আরেকজন- আদিল রশিদ, জন্মগতভাবে পাকিস্তানের হলেও বিশ্বকাপে এবার ইংল্যান্ডের ঘূর্ণি বলের সারথি ছিলেন।

ইংলিশ ক্রিকেটে এই বহুজাতিক তত্ত্ব বেশ পুরনো। তাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির গোড়ার দিকে নজর দিলে এমন অনেক উদাহরণই পাওয়া যাবে। কেননা ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করতে তারা উদারপন্থি নীতিকে আদর্শসূচক হিসেবে ধরেছিল। জাতি-ধর্ম-বর্ণকে তোয়াক্কা না করে ক্রিকেটকে সাজিয়েছে আপন রঙে। কেউ হয়তো ভিনদেশি বংশোদ্ভূত, কেউ অভিবাসী, কেউ বা এসেছেন পড়াশোনা করতে- তাদের মধ্যে যারা ক্রিকেট খেলতে পারতেন তারা সহজেই সুযোগ পেয়ে যেতেন। ভারতের কেএস রঞ্জিত সিংজি বা দুলীপ সিংজি, দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিল ডি'অলিভিয়েরা বা টনি গ্রেইগ, ইতালির টেড ডেক্সটার, জিম্বাবুয়ের গ্রায়েম হিক বা কেনিয়ার ডেরেক প্রিঙ্গল- তাদের সবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইংলিশদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। প্রায় ১৪২ বছরের ইতিহাসে ইংলিশ জাতীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে ক্রিকেট খেলতে নেমেছেন মোট ৭৩৭ ক্রিকেটার, তাদের মধ্যে কমবেশি ১০৭ জনই ভিনদেশি। যে ধারা এখনও চলমান।

বিষয় : বিশ্বকাপ ক্রিকেট ক্রিকেট ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ-২০১৯